“সে কেমন আছে?”
আগুনের কাছে দাঁড়ানো হাকিম তামার পাত্রে তৈরি একটা মিশ্রণ নাড়ছে। “সুলতান, তার অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। তার জ্বর প্রশমিত করতে আমি দ্রাক্ষারস, লতাগুল্ম আর দারুচিনি দিয়ে তৈরি একটা এলিক্সির আগুনে উত্তপ্ত করছি।” লোকটার কণ্ঠস্বর বিষণ্ণ এবং মুখের অভিব্যক্তিতে চিন্তার ছাপ- গতকালের সাক্ষাতের ভক্তিপূর্ণ আন্তরিকতা থেকে একেবারেই আলাদা।
ওয়াজির খান মারা যেতে পারে প্রথমবারের মতো এই সম্ভাবনার কথা তার মাঝে। উদয় হতে পেটের ভেতরে অস্বস্তির একটা গিঁট দানা বাঁধে। “তাকে আপনার বাঁচাতেই হবে।”
“সুলতান, আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করবো। কিন্তু প্রাণ দেয়া বা নেয়ার অধিকার কেবল সৃষ্টিকর্তার এক্তিয়ারে। আমি কেবল এটুকুই বলতে পারি শীঘ্রই যদি তার অবস্থার উন্নতি না হয়, তবে সে আমার সামর্থের বাইরে চলে যাবে…” হাকিম ঘুরে দাঁড়িয়ে পাত্রের মিশ্রণ আরো জোরে নাড়তে আরম্ভ করে।
বাবর ওয়াজির খানের কাছে যায় এবং আলতোভাবে তার হাত মুখের উপর থেকে সরিয়ে দেয় যা ঘামে ভিজে চপচপ করছে। ওয়াজির খান নড়ে উঠে এবং এক মুহূর্তের জন্য তার একটা চোখ খুলে তাকায়। “সুলতান…” তার চিরাচরিত মন্দ্র কণ্ঠস্বর এখন ক্ষীণ কষ্টসাধ্য কর্কশ আর্তনাদ।
“কথা বলার দরকার নেই। নিজেকে অনুগ্রহ করে কাহিল করবেন না।” বাবর সতর্কতার সাথে ওয়াজির খানের কাধ চেপে ধরে। তার কাঁপুনি থামাতে চেষ্টা করে। অসুস্থ বন্ধুর শরীরে নিজের শক্তির কিছুটা প্রবাহিত করতে চায়। ওয়াজির খানের পরণের মোটা আলখাল্লা ভেদ করে সে তার দেহের অস্বাভাবিক উষ্ণতা অনুভব করতে পারে।
একটা মাটির পেয়ালা নিয়ে হাকিম এগিয়ে আসে।
“আমাকে দিন।” বাবর পেয়ালাটা তার হাত থেকে নেয় এবং এক হাতে ওয়াজির খানের মাথাটা তুলে ধরে অন্য হাতে পেয়ালাটা তার ঠোঁটের কাছে ধরে। ওয়াজির খানের চেষ্টা সত্ত্বেও পেয়ালার বেশিরভাগ উষ্ণ লাল তরল তার চিবুকের খোঁচা খোঁচা। দাড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। নিজের অনাড়িপনাকে সে অভিসম্পাত করে। বাবর আবার চেষ্টা করে, তার মনে পড়ে কিভাবে একটা স্যাঁতসেতে গুহার অভ্যন্তরে জ্বরের সময়ে ওয়াজির খান একবার তার শুশ্রূষা করেছিলো। কাপড়ের ফালি পানিতে ভিজিয়ে ভক্তিভরে আর ধৈর্যসহকারে তার শুষ্ক মুখ পানির ফোঁটায় সিক্ত করে তুলেছিলো। সে ওয়াজির খানের মাথাটা আরেকটু উঁচু করে এবার কাজ হয়। হাকিমের তৈরি করা আরকের কিছুটা গলধঃকরণ করতে পারে ওয়াজির খান, তারপরে আরেকটু। পুরোটা শেষ হতে বাবর ওয়াজির খানের মাথা বালিশে নামিয়ে রাখে।
“সুলতান, তার অবস্থার উন্নতি হতেই আমি আপনাকে জানাবো।”
“আমি এখানেই থাকছি।” ওয়াজির খানের কোনো নিকটাত্মীয় নেই যে তার যত্ন নেবে। তার স্ত্রী আর একমাত্র পুত্রসন্তান বহুবছর আগে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে এবং প্রায় দশ বছর আগে সন্তান জন্মদান করার সময়ে তার একমাত্র কন্যা মারা গিয়েছে। বাবর কয়েকটা জরির কারুকাজ করা তাকিয়া নিয়ে ওয়াজির খানের বিছানার পাশের দেয়ালে সেগুলো স্তূপ করে সেখানে আধশোয়া হয়। পৃথিবীর বুকে যদি ওয়াজির খানের অবস্থানের সময় শেষ হয়ে আসে, তবে অন্তিম মুহূর্তে সে তার পাশে থাকতে চায়।
রাত ক্রমশ গম্ভীর হয়। বাবর চুপচাপ তাকিয়ে থাকে এবং হাকিম ওয়াজির খানের চারপাশে পায়চারি করার ফাঁকে নাড়ি পরীক্ষা করতে, চোখের পাতা খুলে চোখের মণিতে উঁকি দিতে বা বুকে হাত রেখে জ্বরের মাত্রা পরিমাপ করতে বিছানার পাশে আসলে সে তাকে সাহায্য করে। যন্ত্রণায় ঝটফট আর কাঁপতে থাকলেও মাঝে মাঝে ওয়াজির খান কিছুটা শান্তভাবে শুয়ে থাকে। আবার কখনও প্রলাপ বকে। তার বেশিরভাগ কথাই বোঝা যায় না কিন্তু বিড়বিড় করে বলতে থাকা দুর্বোধ্য শব্দের ভিতরে বাবরের কানে কিছু আটকায়..
“কবুতর…কবুতর যাদের পালকে চুনির মতো লাল রক্ত লেগে রয়েছে…সুলতান দেখেন কিভাবে সেগুলো আছড়ে পড়ছে…”
আকশি দূর্গের ছাদ থেকে বাবরের আব্বাজান আর তার প্রিয় চবুতরা যেদিন বিস্মরণের অতলে ধ্বসে পড়েছিলো ওয়াজির খান বোধহয় সেদিনের কথা বলতে চাইছে। আজ এতদিন পরেও বাবর সেদিন গিরিখাতের কিনার, যার অতলে তার আব্বাজানের দেহ অষ্টবক্র হয়ে পড়ে ছিলো, থেকে তাকে সরিয়ে আনা ওয়াজির খানের হাতের শক্ত পাঞ্জার স্পর্শ আজও অনুভব করতে পারে… ওয়াজির খানের কাছে তার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। তার আব্বাজানের অকাল মৃত্যুর পর থেকে লোকটা তাকে পিতার মতোই আগলে রেখেছে, কিন্তু তাকে বাঁচাবার জন্য সে কিছুই করতে পারছে না।
ওয়াজির খান আবার একটু শান্ত হতে বাবরের চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসে। ওয়াজির খানের ভালোমন্দ কিছু একটা হয়ে গেলে তার কি হবে?
***
“সুলতান…সুলতান… উঠুন!”
বাবর চমকে উঠে বসে। পুরো ঘরটা প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন। কেবল হাকিমের ডান হাতে উঁচু করে ধরা একটা তেলের প্রদীপের দপদপ করতে থাকা শিখা যতটুকু আলোকিত করতে পারে।
চোখ পিটপিট করে বাবর কোনোমতে উঠে দাঁড়ায়। বিছানার দিকে তার তাকাতে সাহস হয় না। কারণ জানেই তাকালে সে কি দেখতে পাবে। সে তার বদলে হাকিমের চোখের দিকে তাকায়। “কি হয়েছে?”
