***
সেই রাতে কোক সরাইতে, বাবর তার খিদমতগারকে কাগজ আর কলম নিয়ে আসার জন্য আদেশ দেয়। খিদমতগার যখন জানতে চায় মুনশিকেও ডেকে আনবে কিনা। সে মাথা নেড়ে নিষেধ করে। সে কিছু একটা সিদ্ধান্তে পৌঁচেছে। সে এখন উনিশ বছরের পূর্ণ বয়স্ক এক পুরুষ, এবং চাঞ্চল্যকর ঈর্ষণীয় সাফল্য সে অর্জন করেছে। আজ থেকে সে রোজনামচা লিখবে। যেখানে সে তার হৃদয়ের কথাই কেবল লিপিবদ্ধ করবে। সে কেবল জানবে রোজনামচায় কি লেখা আছে। দোয়াতদানিতে কলমের নিব ডুবিয়ে নিয়ে এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে সে লিখতে শুরু করে; প্রথমে লেখনীর গতি মন্থর থাকে কিন্তু ধীরে ধীরে আবেগের উৎসমুখে বাঁধ খুলে যেতে লেখার গতি বৃদ্ধি পায়:
যুগ যুগ ধরে সমরকন্দ তৈমূরের বংশধরেরা শাসন করে এসেছে। তারপরে উজবেকরা- আমাদের সভ্য দুনিয়ার বাইরে মানবতার প্রান্তে বসবাসকারী এক বহিরাগত শত্রু- এটা দখল করে একে বিধ্বস্ত করে। এখন আল্লাহতা’লার কৃপায় আমাদের হাতছাড়া হওয়া এই শহরটা আবার আমাদের হাতে ফিরে এসেছে। সমৃদ্ধ সমরকন্দ আবার আমার হয়েছে।
একটা গভীর শ্বাস নিয়ে সে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে দেয় এবং লেখনী নামিয়ে রাখে। সেদিন বিছানায় গিয়ে শোয়ার প্রায় সাথে সাথে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।
২.৫ অপমানের তিক্ততা
১১. অপমানের তিক্ততা
তুষারপাতের প্রথম ঝাপটা সমরকন্দের ডিম্বাকৃতি গম্বুজ, সুদৃশ্য মিনার আর চিনামাটির টালিশোভিত তোরণের জটিল অবয়ব কেউ রূপার তবক দিয়ে ঢেকে দিয়েছে বলে মনে হতে থাকে। ফলের বাগানের পুত্রহীন ডালপালার ভিতর দিয়ে শনশন শব্দে বয়ে চলা শীতল বাতাস আর হুড়মুড় করে ভেঙে পড়া তুষারের স্তূপ। বাবরের কাছে শহরটাকে ঘোমটার আড়ালে নববধূর মত মনে হয়- যার সৌন্দর্য চোখের আড়াল হলেও পুরোপুরি ঢাকা পড়েনি।
তার প্রিয় বাদামী রঙের আজদাহাটা ফেস-ফোঁস করে নিঃশ্বাসের সাথে কুয়াশার মেঘ নির্গত করে এবং বুকের কাছে পা তুলে নরম তুষারের ভিতর থেকে খুর বের আনে। মাথায় নেকড়ের চামড়ার নরম টুপি। চামড়ার পরত দেয়া আলখাল্লা গায়ে শক্ত করে আটকে আর পায়ে মেষের চামড়ার বুট পরিহিত অবস্থায় বাবর শহর রক্ষাকারী দেয়ালের বাইরের দিকের অবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে ফিরে আসছে। দেহরক্ষী বাহিনী খুব কাছ থেকে তাকে অনুসরণ করছে। গত দুসপ্তাহ ধরে ওয়াজির খান জ্বরে ভুগছে। এই প্রথম সে তার সাথে নেই, অবশ্য বাবুরী সাথে রয়েছে। শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে একটা উজ্জ্বল সবুজ কাপড়ের ফালি দিয়ে তার মুখটা ঢাকা।
গলবস্ত্র দিয়ে মাথা ঢাকা থাকা সত্ত্বেও বাতাসের প্রবাহের মাঝে তারা পরস্পরের কথা শুনতে পারবে। কিন্তু ঠাণ্ডার কারণে তাদের কথাই বলতে ইচ্ছা করে না। বাবরের অবশ হয়ে থাকা ঠোঁটের কারণে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে হলে তাকে যথেষ্ট কসরত করতে হবে। কিন্তু সবুজাভ-নীল তোরণদ্বারের ছাদের নিচে ঝুলে থাকা সুতীক্ষ বরফের শলাকার দিকে এগিয়ে যেতে, শীতের কথা সে বেমালুম ভুলে যায়। সাফল্যের উল্লাস, কড়া মাদকের উষ্ণ ধারার ন্যায় তার ভেতরটা চাঙ্গা করে তুলে।
তোরণদ্বারের নিচে দিয়ে বাবর তার লোকদের নিয়ে দুলকিচালে ভেতরে প্রবেশ করে পশ্চিম দিকে অবস্থিত নগরদূর্গের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে একটাই দুশ্চিন্তা তাকে ত করে। সমরকন্দ দখল করার পরে যে তিন মাস অতিক্রম করেছে। সেই পুরোটা সময় যা তাকে অনবরত খুঁচিয়ে আসছে। বর্তমানে শীতের কড়াল থাবা আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার বরাভয় দিচ্ছে কিন্তু বরফ গলতে শুরু করণে কি হবে? সাইবানি খান যদিও সাথে সাথে শহর অবরোধ না করে, উত্তরে নিজের দূর্গে ফিরে গিয়ে শীতকাল শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন বলে ঠিক করেছেন। আর বাবর খুব ভালো করেই জানে নিজের সীমিত সম্পদ দিয়ে সাইবানি খানের কাছ থেকে সমরকন্দ হয়তো দখল করা যায়, কিন্তু সেটা রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। শহর দখল করার প্রায় সাথে সাথে বাবর তার লোকদের এর নিরাপত্তা জোরদার করতে নিয়োগ করে। অতিরিক্ত পর্যবেক্ষণ গম্বুজ নির্মাণ করতে বলে এবং শহর রক্ষাকারী দেয়ালের উচ্চতা কয়েক স্থানে বৃদ্ধি করার আদেশ দেয়। তুষারপাতের কারণে কাজ বন্ধ হবার আগে পর্যন্ত তার লোকেরা সাধ্যমত কাজ করেছে।
কোক সরাইয়ের আঙ্গিনায় ঘোড়া নিয়ে প্রবেশ করে বাবর ভাবে, নানীজান, আম্মিজান আর খানজাদার বিলাসবহুল মহলে তাদের সাথে দেখা করতে যাবে কিনা। যেখানে বিজয় অর্জনের অব্যবহিত পরে সমরকন্দে আসা অব্দি তারা অবস্থান করছেন। সে ওয়াজির খানকে দেখতে যাবে বলে ঠিক করে। তার শারীরিক অবস্থার নিশ্চয়ই এতক্ষণে উন্নতি হয়েছে… ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে গা গরম করার অভিপ্রায়ে দুহাতে নিজের শরীরের দু’পাশে চাপড় দিতে দিতে পাথরের তৈরি নিচু কামরার দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে ওয়াজির খান অবস্থান করছে। বাবরের তাকে। এখন বড় প্রয়োজন, আর সে তার আরোগ্য কামনায় অস্থির হয়ে উঠেছে।
পায়ের জুতো থেকে বরফ ঝাড়তে ঝাড়তে এবং মাথা থেকে নেকড়ের চামড়ার তৈরি টুপি খুলে- নেকড়ের লম্বা লোম বরফে শলাকার ন্যায় আকৃতি নিয়েছে সে। ভেতরে প্রবেশ করে। ওয়াজির খানের কক্ষের নিচু দরোজার নীচ দিয়ে ঝুঁকে প্রবেশ করে সে তার বৃদ্ধ বান্ধবকে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে। একটা হাত মুখের উপরে রাখা, যেনো ঘুমিয়ে রয়েছে। কাছে আসতে সে আঁতকে উঠে দেখে হাকিমের পরামর্শে ছাগলের চামড়ার তৈরি কম্বলের কয়েক পরত দিয়ে ঢেকে দিয়ে বিছানার পাশে একটা ঝুড়িতে জ্বলন্ত কয়লা রাখার পরেও ওয়াজির খান থরথর করে কাঁপছে। গতকালও তার কাঁপুনি এতো প্রবল ছিলো না।
