দেয়ালের কাছে যারা আহত হয়েছিলো তারা বেশিদূর পালাতে পারেনি। প্রতিরোধের মাত্রা অনেক অল্প- প্রায় নেই বললেই চলে। উজবেকরা নিশ্চয়ই তাদের আগে আগে পালিয়ে যাচ্ছে। রেজিস্তান চত্বরে পৌঁছে বাবর সেখানে সাময়িক যাত্রা বিরতির ঘোষণা করে। উজবেকরা সম্ভবত ভেবেছে যে, সে আসলেই অনেক বড় বাহিনী নিয়ে আক্রমণ করেছে। কিংবা পুরো বিষয়টাই একটা ফাঁদ। সামনেই কোথাও তারা তাদের জন্য ওঁত পেতে আছে। বাবর তার সেনাপতিদের সাথে একটা সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বসে এবং তারপরে সৈন্যদের সাবধানে শহরের উত্তর, পূর্ব আর পশ্চিমে পাঠায়। আসলেই ব্যাপারটা কি সেটা দেখতে।
ভোরের সূর্য এতক্ষণে মধ্য সকালের আলোয় সমাসীন এবং নির্মেঘ উজ্জ্বল আকাশের নিচে আরো বেশি বেশি লোক এসে চত্বরে হাজির হয়। সবাই খাবার নিয়ে এসেছে- রুটি, শুকনো ফল, এমনকি সুরা ভর্তি মশক- যা বাবরের লোকদের নেবার জন্য জোরাজুরি করছে। তার চারপাশে উত্তেজিত সব কণ্ঠস্বরের একটা কোলাহল ধীরে ধীরে দানা বেঁধে উঠে। চরম বিশৃঙ্খলা- উজবেকরা যদি শক্তি সঞ্চয় করে পাল্টা আক্রমণ করে তাহলে কি হবে? বাবরের লোকেরা এই হট্টগোলের ভিতরে কোনো প্রতিরোধই তৈরি করতে পারবে না।
বাবর তার দেহরক্ষীদের আদেশ দেয় শহরের জনগণকে একটু দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্য। দেহরক্ষীর দল বর্শা দিয়ে একটা বেষ্টনী তৈরি করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চারপাশে চাপ দিতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে সাফল্যের সাথে বিশৃঙ্খল জনতাকে ঠেলে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয় এবং চত্বরে প্রবেশ আর বর্হিগমনের গলি ভীড়মুক্ত করে। এই বেশ হয়েছে। “আমি চাই আশেপাশের এইসব ভবনগুলো ভালো করে তল্লাশি করা হোক আর চত্বরের চারপাশের প্রতিটা কৌশলগত স্থানে প্রহরী নিয়োগ করা হোক।” বাবর আদেশ দেয়। উজবেক তীরন্দাজের দল হয়তো এতোক্ষণে চত্বরের আশেপাশের সব প্রাসাদ, মসজিদ আর মাদ্রাসার মিনার আর নীল টালি শোভিত গম্বুজের সুবিধাজনক স্থানে অবস্থান নিয়ে সুযোগের অপেক্ষা করছে।
“সুলতান…” ঘামে ভেজা চওড়া মুখের এক তরুণ সৈন্য বাবরের কনুইয়ের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলো। তার কণ্ঠস্বর শুনে মনে হয় সে এতোক্ষণ জোরে দৌড়ে এসেছে। “কি হয়েছে?”
“সাইবানি খানের সাথে যোগ দেবার আশায় উজবেকদের একটা বিশাল সংখ্যা শেখজাদা তোরণ দিয়ে উত্তর দিকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। তারা বের হবার চেষ্টা করলেই আমাদের তীরন্দাজ বাহিনী তাদের লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়ে মারছে। অবশ্য, স্থানীয় লোকজন লোহার দরোজার প্রহরীর কক্ষে কিছু উজবেককে আটকাতে সক্ষম হয়েছে।”
‘চমৎকার। আমরা আমাদের শত্রুর শেষ নিশানাও এই শহর থেকে বিতাড়িত করবো এবং সাইবানি খান ফিরে আসবার আগেই শহর রক্ষাকারী দেয়াল পাহারা দেবার বন্দোবস্ত করো।” বাবর তার ঘোড়া নিয়ে আসতে বলে এবং দেহরক্ষীর দল নিয়ে লোহা দরোজার দিকে এগিয়ে যায়। তৈমূরের মসজিদের চমৎকার নীল গম্বুজ আলোয় ঝকঝক করে। কিন্তু তার পেছনেই সে কুণ্ডলী আকারে ধোয়া উঠতে দেখে এবং বাবর চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পায়। লোহা দরোজার দিকে এগিয়ে যেতে সে প্রহরীর কক্ষের ছাদ ভেদ করে বের হয়ে আসা আগুনের শিখা দেখতে পায় এবং চিৎকার করছে ভেতরে আটকে পড়া উজবেক রক্ষীর দল। আরো কাছে যেতে, সে দেখে বেপরোয়া এক উজবেক জানালা গলে বাইরে বের হয়ে আসতে চেষ্টা করলে সমরকন্দের কিছু লোক তাকে আবার জোর করে ভেতরে ঠেলে দিয়ে জানালার খড়খড়ি বন্ধ করে দিয়ে সেটা বাইরে থেকে তক্তা দিয়ে বন্ধ করে দেয়। আরেক উজবেক, কাপড়ে আগুন নিয়ে ছাদ থেকে নিচে লাফিয়ে পড়তে উপস্থিত জনতা সাথে সাথে তাকে ঘিরে ধরে উন্মত্তের মতো তার দেহ ছুরি চাকু দিয়ে কোপাতে থাকে বেচারার মৃত্যু নিশ্চিত করতে। শীঘ্রই উল্লসিত জনতা তার কাটা মাথাটা একটা স্মারকের মতো প্রদর্শন করতে থাকে।
বাবর সেখানে এসে পৌঁছাতে, উপস্থিত জনতার একজন তার মুখ ধোয়ায় কালো হয়ে গেছে তার দিকে দৌড়ে আসে এবং বাবরের দেহরক্ষী দলের একজনের হাতে ফারগানার রাজকীয় প্রতীক দেখে চিনতে পেরে, হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। “সুলতান আমরা শয়তানগুলোকে আটকে তাদের এখন পোড়াচ্ছি। আমাদের যেমন কষ্ট দিয়েছে তারা এখন তার প্রতিদান পাচ্ছে। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, কেউ বিনা কষ্টে মরবে না।” বাহবার জন্য বাবরের দিকে তাকিয়ে থাকা লোকটার চোখে কেবল রক্ত লোলুপতা খেলা করতে থাকে। কিন্তু মানুষের মাংস পোড়ার মিষ্টি গন্ধে বাবরের গা গুলিয়ে উঠলে কোনো কথা না বলে সে হাত নেড়ে তাকে যেতে বলে। প্রজ্জ্বলিত প্রহরী কক্ষের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নয়ে। ইতিমধ্যে ভিতরে বন্দি উজবেকদের যন্ত্রণাক্লিষ্ট চিৎকারের মাত্রা কমে এসেছে। সে রেজিস্তান চতুরের দিকে ধীরে ধীরে ফিরে চলে। সমরকন্দ বোধহয় সে আবার ফিরে পেলো, কিন্তু যতো দ্রুত আর অনায়াসে শহরটার পতন হলো সেটা তার কেনো যেনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
সামনে থেকে ঘোড়ার ধাবমান খুরের শব্দ ভেসে আসে এবং একটা পরিচিত মুখ সে দেখতে পায়। বাইসানগার এবং তার সহযোদ্ধাদের ভিতরে সে বাবুরীকেও দেখতে পায়।
“সমরকন্দের সুলতান মির্জা বাবরের জয় হোক!” বাইসানগার গলার সর্বশক্তি দিয়ে জয়ধ্বনি দেয় এবং বাকি লোকেরা তার সাথে গলা মেলায়। বাবর হাত উঁচু করে তাদের অভিবাদনের জবাব দেয় এবং ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যায়। সব কিছু তার কাছে কেমন স্বপ্নের মতো মনে হয়। তার উৎফুল্ল হবার কথা, কিন্তু কেমন একটা অদ্ভুত বিচ্ছিন্নতা তার মাঝে ভর করে। সহসা, ভাববার জন্য সময় আর নির্জনতা তার পরম কাম্য বলে মনে হয়।
