দুর্ভেদ্য স্থানের অন্য যোদ্ধারা তাকে অনুসরণ করতে চেষ্টা করে। কিন্তু হাতাহাতি লড়াইয়ের হাত থেকে তারা পালিয়ে যেতে চাইলে বাবর আর তার লোকেরা তাদের নির্দ্বিধায় হত্যা করে। তার তীরন্দাজেরা আরো দু’জনকে তোরণ রক্ষকের কক্ষে দৌড়ে যাবার সময়ে ভূপাতিত করে। অবশ্য তাদের মধ্যে একজন তারপরেও টলমল পায়ে কোনোমতে গড়িয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে সক্ষম হয়।
“সুলতান, আমাদের দেখে ব্যাটাদের পাখা গজিয়েছে!”
বাবর ঘুরে তাকিয়ে এক হাতে খঞ্জর অন্য হাতে রক্তাক্ত তরবারি হাতে হাঁফাতে হাঁফাতে কিন্তু গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়ানো ওয়াজির খানকে দেখতে পায়। “এখনও না। তোরণ আর দেয়ালের এই অংশ পাহারা দেবার জন্য প্রহরী নিয়োগ করেন। আপনি নিজে এখানের দায়িত্বে থাকবেন। ইত্যবসরে আমি বাকিদের নিয়ে তোরণ রক্ষকের কক্ষে প্রবেশ করে তোরণদ্বার খুলে আমাদের বাকি লোকদের ভেতরে প্রবেশের ব্যবস্থা করা যায় কিনা দেখি।”
ওয়াজির খানকে বকুনি খাওয়া বালকের মতো অপ্রতিভ দেখায়। কিন্তু বাবর ক্রমেই দুর্বল হয়ে উঠা তার সবচেয়ে বিজ্ঞ অমাত্যকে শহরের রাস্তায় হাতাহাতি লড়াইয়ের মধ্যে ফেলতে চায় না, যেখানে একজন লোকের দ্রুত দৌড়াবার ক্ষমতা অনেক সময় জীবন মৃত্যুর মধ্যে ভেদ রেখা টেনে দিতে পারে।
মাথার উপরে ঢাল ধরে এবং কুঁজো হয়ে বাবর পঞ্চাশ গজ দূরে অবস্থিত তোরণ রক্ষকের কক্ষের দিকে দৌড়ে যায়। সে ভেতরে এক হাত প্রায় কাটা পড়া সেই উজবেক যোদ্ধাকে পড়ে থাকতে দেখে। দেয়ালে হেলান দিয়ে সে দ্রুত শ্বাস নেয়। তার হাতের ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ছিটকে এসে পাথরের মেঝে লাল করে দিয়েছে। যন্ত্রণায় সে শাপশাপান্ত করছে। নিচের তোরণদ্বারের দিকে নেমে যাওয়া সিঁড়ি থেকে দুদ্দাড় ভেসে আসা পায়ের আওয়াজ বলে দেয় বাকী রক্ষীদের কোথায় পাওয়া যাবে। সে আর তার লোকেরা সন্তর্পনে পায়ের শব্দ অনুসরণ করে। আশঙ্কা করে সিঁড়ি থেকে বের হওয়া মাত্র হামলার মুখে পড়তে হতে পারে, কিন্তু সেরকম কিছুই ঘটে না।
“তালাটা ভেঙে দরজাটা খুলে দাও।” বাবর চেঁচিয়ে উঠে বলে।
রণকুঠার হাতে তার দুই দেহরক্ষী আদেশ পালন করতে দৌড়ে যায়। তাদের কুঠার তোরণের তালার উপরে সজোরে নেমে আসতে ধাতুর সাথে ধাতুর সংঘর্ষের কর্কশ শব্দ উঠে এবং কিছুক্ষণ পরে একটা শেষ ঘাইয়ের সাথে তারা তাদের কাজ সমাপ্ত করে। শীঘ্রই প্রাচীন, লোহার-কীলক দিয়ে সজ্জিত দরজা দোল খেয়ে খুলে যায় বাবরের অবিশিষ্ট যোদ্ধার দলকে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দিতে। যাদের ভিতরে মাঙ্গলিঘ তীরন্দাজের দলও রয়েছে।
আলমগীর হাতে নিয়ে বাবর চারপাশে তাকায়। বড্ড বেশিই যেনো নির্জন চারপাশটা। উজবেক শেয়ালের দল কোথায় লুকিয়ে আছে? বাবর সতর্কতার তাবিজ খুলে রেখে চওড়া গলিপথ ধরে ফারগানার নামে জয়ধ্বনি দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে শুরু করে।
নিস্তব্ধতার মাঝে বাবরের চিৎকারের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তীরের কোনো ঝাঁক আর তাদের দিকে ধেয়ে আসে না বা উজবেক অবজ্ঞার কোনো চিৎকারও শোনা যায় না। তারপরে বাবরকে চমকে দিয়ে বন্ধ দরোজা, জানালার পাল্লা খিড়কি একে একে খুলতে শুরু করে। সে দৌড়ে আড়াল খোঁজে এবং পুনরায় তার তীর ধনুকের দিকে হাত বাড়ায়। কিন্তু দেখা যায় উঁকি দেয়া মাথাগুলো কোনো উজবেক যোদ্ধার না। তারা সবাই সমরকন্দের সাধারণ মানুষ বণিক, দোকানদার, সরাইখানার মালিক- যারা বাবর আর তার লোকদের চিনতে পেরে তাদের স্বাধীন করায় তার জন্য দোয়া করছে। শীঘ্রই তারা পিলপিল করে বাইরের গলিতে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। খুশিতে সবার প্রায় পাগল হবার দশা।
“জলদি! এই দিকে!” একটা অপরিচিত লোক চিৎকার করে বলে। “আমি এক উজবেক বদমাশকে এদিকে পালাতে দেখেছি।” সে একটা সংকীর্ণ গলির দিকে ইশারা করে দেখায়। যেখানে পড়ে থাকা রক্তের ফোঁটা ইতিমধ্যে ধূলোয় জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। ব্যাপারটা দেখার জন্য বাবর তার লোকদের কিছু বলার আগেই, দু’জন সাধারণ নাগরিক। তাদের একজনকে দেখে মনে হয় কসাই হবে। অন্যজন গাট্টাগোট্টা দেখতে তারের মতো পাকানো শরীর যার নাকের পাশে জরুল রয়েছে- গলির ভিতরে দৌড়ে প্রবেশ করে। কিছুক্ষণের ভিতরে তারা এক তরুণ উজবেকের পা ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসে। ফলে বেচারার মাথা রাস্তায় বলের মত লাফাতে থাকে। তার বুক ভেদ করে একটা মাঙ্গলিঘ তীরের মাথা বের হয়ে আছে এবং বাতাসের জন্য হাঁসফাঁস করার ফাঁকে সে করুণা ভিক্ষা করে। বাবর কিছু বলার আগেই কসাইর মতো দেখতে লোকটা একটা চাকু বের করে ছেলেটার কণ্ঠনালী থেকে কান পর্যন্ত কেটে ফাঁক করে দেয়। তাজা রক্ত ছিটকে তার পায়ের নাগরা ভিজিয়ে দিতে তার চেহারা খুশিতে বাকবাক করতে থাকে। চারপাশে সবাই হাতের কাছে যে যা পাচ্ছে তাই নিয়ে নিজেদের যুদ্ধের জন্য সজ্জিত করে- পাথরের টুকরো, কামারের হাতুড়ি, খড় তোলার কাঁটা লাগানো দণ্ড…বাবর আর তার সৈন্যদের সাথে তারা দৌড়াতে শুরু করলে তাদের জ্বলজ্বল করতে থাকা চোখের দৃষ্টি দেখে বাবরের বুনো কুকুরের কথা মনে পড়ে। গলি থেকে গলিতে তারা উজবেকদের খুঁজতে থাকে এবং তাদের ঘৃণার তীব্রতা এতো বেশি, তারা এতো অপমান সহ্য করেছে যে, মৃত কোনো উজবেককে দেখতে পেলে তাকেও নির্বিচারে চাকু দিয়ে কোপাতে থাকে।
