বাবরের মনে লোকটার পরিচয়ের ব্যাপারে সামান্যই সন্দেহ রয়েছে- সাইবানি খান। স্বয়ং। উজবেক দলপতির কি অভিপ্রায়? অবশেষে নিঃসঙ্গ অশ্বারোহী তার হাত উঁচু করে। লোহার দরোজার ভিতর থেকে আরো যোদ্ধারা এসে তার পেছনে জড়ো হতে সে ঘোড়ার পাজরে খোঁচা দিয়ে কর্কশ কণ্ঠে তার লোকদের চিৎকার করে কিছু একটা বলে, যা বাবরের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে একটা অস্পষ্ট গুঞ্জনে পরিণত হলেও সে সেটা ঠিকই শুনতে পায়, উত্তর-পশ্চিম দিকে হারিয়ে যায়। আরো কয়েক মিনিট পরে, সব অশ্বারোহী যোদ্ধার দল বিদায় নিতে লোহার গরাদ ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে।
নিজের অস্থিরতা দমন করে, বাবর তার মূল বাহিনীর কাছে ফিরে এসে তার লোকদের আরো একবার চুপ করে নিরবে দাঁড়িয়ে থাকবার আদেশ দেয়। তারা যদি এখনই শহর আক্রমণ করতে যায় তাহলে কোলাহলের শব্দ শুনে সাইবানি খান। হয়তো ফিরেও আসতে পারে। ওয়াজির খান চুপ করে দাঁড়িয়ে না থেকে নিজের ঘোড়ার পেটি শক্ত করে বাঁধে এবং নিজের আয়ুধের ধার পরখ করে দেখে তরবারি, খঞ্জর আর রণকুঠার। বাবর তার বিজ্ঞ পরামর্শদাতার স্থিরতা আর বিচক্ষণতার প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করে নিজেও তাকে অনুসরণ করে। তার পিঠে চামড়ার তূণ ঝুলছে, এবং সদ্যই কামারশালা থেকে তৈরি হয়ে আসা লম্বা তীরের তীক্ষ্ণ সূচাল ডগায় হাত বুলাতে সে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর হয়ে উঠে। সে তার বাঁকানো ধনুক আলতো করে খাপ থেকে ধরে বের করে তেল দিয়ে পাকা করে তোলা গুণের স্থিতিস্থাপকতা পরীক্ষা করে দেখে। সন্তুষ্টির সাথে নাক দিয়ে ঘোঁত করে অব্যক্ত শব্দ করে। সে বের হবার আগে যেমন শক্ত করে বেঁধেছিলো এখনও ঠিক তেমনই আছে।
অবশেষে আক্রমণের চুড়ান্ত সময় উপস্থিত হয়। দূর্গের ছাদে সবকিছু আবার আগের মতো নিরব হয়ে এসেছে এবং সাইবানি খান তার দলবল নিয়ে এতক্ষণে নিশ্চয়ই শ্রবণ সীমার বাইরে চলে গিয়েছে।
“যাত্রা শুরু হোক!” উত্তেজনায় অধীর কণ্ঠে বাবর চিৎকার করে উঠে। নিজের ঘোড়র উপরে লাফিয়ে উঠে বসে সে গাছের আড়াল থেকে বের হয়ে আসে এবং তার লোকদের আক্রমণের ছকে বিন্যস্ত হতে দেয়। ওয়াজির খানের নেতৃত্বে তার দেহরক্ষী বাহিনী বিলম্ব না করে তার পেছনে এসে অবস্থান নেয়। তাদের পরেই থাকে আরোহন সহায়ক মই বহনকারী জোড়া ঘোড়সওয়ারের দল। তারপরে থাকে অশ্বারোহী বাহিনীর বাকি অংশ আর ইব্রাহিম সারুর তীরন্দাজ দল থাকে একেবারে শেষে।
বাবর ঘোড়ার পেটে গোড়ালী দিয়ে গুতো দিতে সেটা লাফিয়ে উঠে সামনে এগিয়ে যায়। ক্রমশ হাল্কা হয়ে আসা কুয়াশার মাঝে তারা তৃণভূমির বুক চিরে দক্ষিণে এগিয়ে যায়। সবুজাভ-নীল তোরণদ্বারের দিকে এগিয়ে যাবার সময়ে শহর রক্ষাকারী দেয়াল তাদের ডান দিকে থাকে। তারা দেয়ালের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর দূরবর্তী পাড় ধরে এগোতে থাকে এবং এবার আর অগভীর অংশ দিয়ে নদী পার হবার দরকার নেই। কারণ কাঠের তক্তার তৈরি একটা চওড়া মজবুত সেতু– সদ্য নির্মিত, কোনো সন্দেহ নেই উজবেকদের কীর্তি- সবুজাভ-নীল তোরণদ্বার থেকে তিনশ গজ দূরে উজানে দেখা যায়।
বাবর তার তার বাহিনী খুরে বজ্রের বোল তুলে সেটা পেরিয়ে আসে এবং সোজা তোরণ রের দিকে ধেয়ে যায়। দূর্গের ছাদ থেকে আতঙ্কিত চিৎকার শুরু হতে, মাঙ্গলিং তীরন্দাজ বাহিনী ঢেউয়ের পরে ঢেউ তীরের ঝাপটা শূন্যে ভাসিয়ে দেয়। কয়েক মিনিটের ভিতরে সবুজাভ-নীল তোরণদ্বারের দুপাশের সবচেয়ে নিচু স্থানে আরোহন মই স্থাপন করা হয়। ঘোড়া থেকে নামার ফাঁকে সে উপরের দিকে তাকিয়ে সেখানে একজনকেও প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত দেখতে না পেয়ে সে বিস্মিত হয়।
মই বেয়ে উপরে উঠতে কয়েক মিনিটের বেশি সময় লাগে না এবং শেষ কয়েক ফিট তারা পাথরের উপরে হাত দিয়ে বেয়েই উঠে যায়। তার যোদ্ধারা তার পাশে ভিড় করলে নড়াচড়ার জায়গা থাকে না। তরবারি কোষমুক্ত করা তো আরো পরের কথা। কিন্তু উজবেক রক্ষীবাহিনীর মাঙ্গলিঘ তীরন্দাজদের নিক্ষিপ্ত তীরে শজারুর মত আকৃতি নিয়ে পড়ে থাকা মৃত যযাদ্ধাদের ছাড়া অবশিষ্টাংশের কোনো চিহ্ন কোথাও দেখা যায় না।
তারপরে, একশ গজ দূরে একটা শক্তিশালী ঘাঁটি থেকে নিক্ষিপ্ত তীরের ঝাপটা বুঝিয়ে দেয় উজবেক রক্ষীবাহিনীর সব সদস্যই পালিয়ে যায়নি। কালো পালকযুক্ত একটা তীর বাবরের গম্বুজাকৃতি শিরস্ত্রাণে আঘাত করে দিকভ্রষ্ট হয়। আরেকটা তীর তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক দেহরক্ষীর উরুর গভীরে কামড় বসায়। তৃতীয় আরেকটা তীর মই বেয়ে উঠে এসে প্রাকারের উপর দিয়ে ছাদে ধড়ফড় করে নামতে ব্যস্ত সৈনিকের গালে বিদ্ধ হয়। তার মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়তে শুরু করতে, তার হাত মই থেকে ছুটে যায় এবং তার ঠিক নিচে মই বেয়ে উঠে আসা অপর এক সৈন্যকে সাথে নিয়ে নিচের পাথুরে ভূমির দিকে মরণ পতন যাত্রা করে। তীরের পরের ঝাপটা থেকে বাঁচতে বাবর ঢাল উঁচু করে নিজের লোকদেরও তাই। করতে বলে দুর্ভেদ্য অবস্থানটার দিকে ধেয়ে যায়। আরো দুটো তীর ঢালে এসে আছড়ে পড়ে। কিন্তু পুরু চামড়া আর কাঠের কাঠামো দক্ষতার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করে। অবশ্য বাবরের পেছনের এক সৈন্য গলায় তীরবিদ্ধ হয়ে ভূমি শয্যা নেয়। বাবর তারপরেই দুর্ভেদ্য অবস্থানটায় পৌঁছে যায়। সেখানে প্রবেশ করার জন্য কোনো দরোজা নেই। সে প্রথম যাকে সামনে পায় তাকে কোনো বাছবিচার ছাড়া কোপ বসিয়ে দেয়। বেচারা ধনুক ছেড়ে তখনও তলোয়ার বের করতে পারেনি। অন্যজনের আঙ্গুল তরবারির বাট আকড়ে ধরেছে। কিন্তু বাবর তার কব্জি লক্ষ্য করে তরবারি চালাতে, হাত দেহ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। লোকটা ঘুরে দাঁড়িয়ে অপর দিকের দরজা দিয়ে দৌড়ে পালায় এবং দেয়ালের পাশ দিয়ে পঞ্চাশ গজ দূরে অবস্থিত সবুজাভ-নীল তোরণদ্বারের তোরণ রক্ষীর কক্ষের দিকে ছুটে যায়।
