“ওয়াজির খান, উজবেকরা টোপ গিলেছে এবং বাইসানগারকে ধাওয়া করতে শুরু করেছে এটা দেখামাত্র আমরা পূর্ব দিক থেকে শহরের দেয়াল আক্রমণ করবো। আমরা শহরে প্রবেশ করার পরে, আমি আদেশ দিচ্ছি উজবেক দেখামাত্র খুন করবে- তাদের কোনো ধরণের দয়া দেখাবে না। কারণ তারা আমাদের লোকদের। প্রতিও কোনো ধরণের করুণা দেখায়নি কিন্তু সমরকন্দের অধিবাসী আর তাদের সম্পত্তির হেফাজত করবে। তারা আমার প্রজা।”
“হ্যাঁ, সুলতান।” তার সেনাপতিরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। সবাই আপন আপন ভাবনায় বিভোর। সম্ভবত ভাবছে আগামীকালের সূর্যোদয় দেখবার জন্য কি সে। বেঁচে থাকবে। যুদ্ধক্ষেত্রে সাইবানি খান কখনও পরাজিত হয়নি। কিন্তু অস্ত্রের ধারের সাথে এবার বুদ্ধির ক্ষিপ্রতাও বিবেচ্য শক্তি এবং ভাবনাটা বাবরকে নতুন সাহসে বলীয়ান করে তোলে।
***
বাইসানগার আর তার লোকেরা আধঘণ্টা আগে রওয়ানা দিয়েছে। একটা পোক্ত আপেল গাছের গুঁড়িতে, যার শাখাপ্রশাখা আপেলে ভর্তি। পাকা আপেলের গন্ধ বাবরকে খানিকক্ষণের জন্য হলেও ইয়াদগারের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে পিঠ ঠেকিয়ে বসে। সকালের কুয়াশায় গাছপালা, ঝোপঝাড় সবকিছু অস্পষ্ট দেখায়। দেয়াল বেয়ে উঠার জন্য মই তৈরি করা শেষ এবং তিনজন লোক পাশাপাশি উঠতে পারে এমন চওড়া করে সেগুলো বানানো হয়েছে। দুটো ঘোড়ার মাঝে ঝুলিয়ে মইগুলো আক্রমণ স্থলে নিয়ে যাওয়া হবে। ওয়াজির খান নিরবে নামাজ আদায় করেন। সেজদার সময়ে তার কপাল ভক্তি ভরে মাটি স্পর্শ করে।
বাবর ভাবে, তারও কি নামাজ পরা উচিত। নামাজ না পড়ে সে কয়েক মুহূর্ত নিরবে বসে চিন্তা করে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই যুদ্ধের চিন্তা তাকে আচ্ছন্ন করে। তার গুপ্তদূতেরা এসে খবর দিয়েছে শহর রক্ষাকারী দেয়ালের বাইরে বড়সড় ধরণের কোনো উজবেক ছাউনি আশেপাশে কোথাও নেই। যার মানে সম্ভবত সাইবানি খানের বাহিনীর একটা অংশ ইতিমধ্যে আশেপাশে লুটতরাজ শুরু করেছে। সমরকন্দের এখন যখন পতন হয়েছে- লোভের মাত্রা আশেপাশের গ্রামাঞ্চল আর লোকালয়ে তার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ডাকাতি করাতেই অনেকে বেশি আগ্রহ দেখাবে। কপাল ভালো হলে, সাইবানি খানের দেহের উপরাংশে সংবদ্ধ উদ্ধত মস্তিষ্কে এটা ঢুকবে না যে তাকে কেউ আক্রমণ করার দুঃসাহস দেখাতে পারে। আর এ কারণেই সে পরিতৃপ্ত মনে তাদের যেতে দিয়েছে।
সহসা, বাবরের মনে হয় সে কোনো শব্দ শুনতে পেয়েছে এবং তার কল্পনার জাল নিমেষে ছিঁড়ে যায়। গাছপাকা আপেলে অর্ধেক পিছলে সে উঠে দাঁড়াবার ফাঁকে সে গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে চেষ্টা করে। দূরে নদীর উপরে জমে থাকা কুয়াশার উপর দিয়ে সে সমরকন্দের পরিচিত দেয়াল দেখতে পায় এবং এখানে সেখানে প্রাকারবেষ্টিত ছাদে আলোর ক্ষুদ্র রশ্মি চোখে পড়ে।
তারপরে, চোখ কান খাড়া করতে, সে আবার শব্দটা শুনতে পায়: ঢাকের মন্দ্র ছন্দোবদ্ধ আওয়াজ, খানিক পরে আরও ঢাকের শব্দ শোনা যায়। সহসা ছাদে মানুষের চলাচল বেড়ে যায়। সে যেমনটা চেয়েছিলো, বাইসানগার আর তার লোকেরা নিশ্চয়ই বৃত্তাকার পথে পশ্চিমে যাবার সময়ে প্রতিপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এখন প্রশ্ন হলো সাইবানি খান কি টোপটা গিলবে?
“আপনাদের লোকদের ঘোড়া নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলেন, কিন্তু আমি আদেশ না দেয়া পর্যন্ত কেউ যেনো তার জায়গা থেকে না নড়ে।” বাবর নিচু স্বরে তার সেনাপতিদের সাথে কথা বলে, যারা এসে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে তার মতোই ঢাকের বাদ্যি শুনছে।
আনতাবাড়ি বোল শীঘ্রই একটা মন্দ্র ভয়ঙ্কর ছন্দে পরিণত হয়। বাবর ভাবে সে যে ঢাকের আওয়াজ শুনছে সেটা মাহমুদের চামড়া দিয়ে তৈরি ঢাকের আওয়াজ নিশ্চয়ই না। একেকটা মুহূর্ত অতিক্রম করার সাথে সাথে অনিশ্চয়তা সবার উপরে একটা চাপ সৃষ্টি করে। কুয়াশার আড়ালে আত্মগোপন করে বাবর সামনে এগিয়ে যায়, আরেকটু ভালো করে চারপাশটা দেখার জন্য এবং দেয়ালের কাছেই জন্মানো ছোট গাছের একটা ঝাড়ের পাশে সে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। তার নতুন সুবিধাজনক অবস্থান থেকে লোহার দরোজা আর তার পরে শেখজাদা তোরণদ্বারের যতোটুকু সে দেখতে পায়- বাইসানগার আর তার লোকেরা, যাদের ভিতরে বাবুরীও রয়েছে, যার। কাছ দিয়ে অতিক্রম করেছে– বুঝতে পারে সেগুলো এখনও বন্ধ রয়েছে। কিন্তু তারপরে, বাবরের যখন মনে হতে শুরু করেছে এই উত্তেজনা সে আর সহ্য করতে পারছে না। লোহার দরোজার উত্তোলন আর অধঃকরণের উপযোগী লোহার গরাদ উপরে উঠতে শুরু করে। গরাদ অশ্বারোহী বের হয়ে আসতে পারে এমন উচ্চতায় উঠতেই, পাশাপাশি দুজন করে অশ্বারোহী বাহিনীর একটা স্রোত দুলকিচালে বের হয়ে এসে বল্পিতবেগে উত্তর-পশ্চিম দিকে ধাওয়া করে। অশ্বারোহীরা বের হয়ে। আসা শেষই হতে চায় না- চারশো হবে কম করে হলেও। সে ভেবে উত্তেজিত হয়ে উঠে। অবশেষে শেষ যোদ্ধাটাও ভেতর থেকে বের হয়ে এসে ছায়ামূর্তির মতো কুয়াশার ভেতরে হারিয়ে যেতে একটা সাময়িক স্তব্ধতা এসে ভর করে। বাবর আশা করেছিলো, লোহার দরোজার গরাদ এবার নেমে আসবে কিন্তু এক নিঃসঙ্গ অশ্বারোহী মন্থর বেগে ভেতর থেকে বের হয়ে আসে। দরোজা থেকে কয়েক কদম এগিয়ে এসে সে লাগাম টেনে ধরে মাথা ঘুরিয়ে ডানে বামে তাকিয়ে দেখে। শিকারের আগে বাতাসে নাক উঁচিয়ে শিকারী কুকুর যেমন করে, অবিকল সেই ভঙ্গিতে সে বাতাসে শ্বাস নেয়। মুহূর্তের জন্য তার মনে হয় নিঃসঙ্গ অশ্বারোহী নিচু জমি আর তৃণভূমির উপর দিয়ে কুয়াশার চাদর ভেদ করে সরাসরি বাবরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। যদিও সে জানে সেটা অসম্ভব।
