“আহহা…তোমার ন্যায়পরায়ণতার জন্যে বেচারার প্রাণটা খোয়াতে হলো।”
যেন কষ্ট পেয়েছে এমন ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকালো ক্রিস্টিয়ান। “থিও, আমি জানি যে তুমি মন থেকে রোগিদের ভালো চাও। সেজন্যেই একজন সাইকোথেরাপিস্ট হিসেবে সফল তুমি। কিন্তু অ্যালিসিয়া বেরেনসনের পেছনে আসলেও সময় নষ্ট করছে। অন্তদৃষ্টি বলতে কখনোই কিছু ছিল না ওর। সবসময় নিজেকে আর ঐসব আঁকাআঁকি নিয়ে ভাবতো। ও তোমার সহমর্মিতার যোগ্য নয়। তোমার বিপদের সময় কিন্তু ওর কাছ থেকে সহমর্মিতা পাবে না। একটা আস্ত গাড়ল সে।”
ক্রিস্টিয়ানের বলা কথাগুলোয় ঘৃণার ছাপ স্পষ্ট। মানসিকভাবে অসুস্থ কারো জন্যে বিন্দুমাত্র সহানুভূতির কোন বালাই নেই ওর মধ্যে। এক মুহূর্তের জন্যে তো মনে হলো অ্যালিসিয়া না, ক্রিস্টিয়ান নিজেই বর্ডারলাইন।
উঠে দাঁড়ালাম। “অ্যালিসিয়ার সাথে দেখা করবো আমি। কিছু প্রশ্নের জবাব দরকার।”
“অ্যালিসিয়ার কাছ থেকে?” অবাক মনে হলো ক্রিস্টিয়ানকে। “কিভাবে পাবে জবাবগুলো, শুনি?”
“সরাসরি প্রশ্ন করবো ওকে।”
বেরিয়ে এলাম রুমটা থেকে।
.
৪.৪
ডায়োমেডেস তার অফিসরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়া অবধি অপেক্ষা করলাম। স্টেফানি ট্রাস্টের লোকদের সাথে আলোচনায় ব্যস্ত। নার্স স্টেশনে এসে দেখি ভার মুখ করে বসে আছে ইউরি।
“অ্যালিসিয়ার সাথে দেখা করতে হবে আমাকে।”
“তাই?” অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো হেড নার্স। “কিন্তু আমি তো শুনেছি ওর জন্যে থেরাপি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।”
“ঠিকই শুনেছো। আমি ওর সাথে আলাদাভাবে কিছু ব্যাপার নিয়ে আলাপ করতে চাই।”
“আচ্ছা।” ইউরির কণ্ঠে সন্দেহ। “থেরাপি রুমে তো ইন্দিরা তার রোগিদের সাথে কথা বলবে আজকে।” একমুহূর্ত কী যেন ভাবলো সে। “তবে আর্ট রুমটা খালি আছে, ওখানে দেখা করবে? তবে যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে কিন্তু।”
জানি কেন কথাটা বলল ও। কেউ দেখে ফেলার আগেই যত দ্রুত সম্ভব অ্যালেসিয়ার সাথে কথা শেষ করতে হবে। কেউ যদি স্টেফানিকে বলে দেয় তাহলে সমস্যায় পড়ে যাবো। ইউরি আমার পক্ষে আছে দেখে কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠলো মনটা; আসলেও ভালো মানুষ সে। শুরুতে তাকে ভুল বুঝেছিলাম ভেবে একটু অপরাধবোধই হচ্ছে এখন।
***
কথা রাখলো ইউরি। দশ মিনিট পর নিজেকে অ্যালিসিয়ার মুখোমুখি আবিষ্কার করলাম। আর্ট রুমের টেবিলগুলোর একটায় বসেছি আমরা।
অ্যালিসিয়াকে দেখে মনে হচ্ছে যেন ছবি আঁকার জন্যে পোজ দিচ্ছে। চোখের দৃষ্টি বরাবরের মতনই নির্মোহ।
“ডায়েরিটা আমাকে পড়তে দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ,” পকেট থেকে ওটা বের করে টেবিলে রাখলাম। “ভরসা থেকেই নিশ্চয়ই দিয়েছেন।”
হাসলাম তার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু আমার হাসির প্রেক্ষিতে অ্যালিসিয়ার চেহারায় কোন অনুভূতি খেলা করলো না। আমাকে ডায়েরিটা পড়তে দিয়ে পস্তাচ্ছে না তো সে? হয়তো তার সম্পর্কে স্পর্শকাতর অনেক কিছু এখন আমার জানা দেখে লজ্জা পাচ্ছে।
“ডায়েরিটা হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেছে,” নোটবুকের খালি পাতাগুলো উল্টে কিছুক্ষণ পর বললাম। “আমাদের থেরাপি সেশনগুলোর মতনই…অসমাপ্ত।”
অ্যালিসিয়া কোন কথা বলল না। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কেবল। আমি নিজেও জানি না যে তার কাছ থেকে আসলে কি আশা করছিলাম। ডায়েরিটা পেয়ে ভেবেছিলাম এবারে হয়তো সে কোন পরিস্কার ইঙ্গিত দিবে, কিন্তু তেমনটা হচ্ছে না।
“জানেন, আমি ভেবেছিলাম এই ডায়েরিটার মাধ্যমে আমার সাথে পরোক্ষভাবে যোগাযোগ করার পর এবারে হয়তো আরেক ধাপ এগিয়ে…কথা বলতে রাজি হবেন আপনি।”
কোন প্রতিক্রিয়া নেই।
“আমার ধারণা আমাকে ডায়েরিটা দিয়েছিলেন কথা বলার জন্যেই। এক অর্থে কিন্তু মুখ না খুলেও কথা বলেছেন, এই পাতাগুলোর মাধ্যমে। এখন আপনার সম্পর্কে অনেক কিছু জানি আমি। কতটা একাকী ছিলেন, কতটা ভয় পেয়েছিলেন শেষ দিকে, কি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন-এগুলো আসলেও দরকারী তথ্য। যেমন ডঃ ওয়েস্টের সাথে আপনার সাক্ষাতের ব্যাপারটাই ধরুন না কেন।”
ভেবেছিলাম ক্রিস্টিয়ানের নামটা বলার পর হয়তো কোন প্রতিক্রিয়া দেখতে পাবো, কিন্তু অমন কিছুই হলো না। পাথরের মত মুখ করে রেখেছে। অ্যালিসিয়া। একবারের জন্যে পলকও ফেলছে না।
“গ্রোভে ভর্তি হবার আগে থেকেই যে ক্রিস্টিয়ান ওয়েস্টকে চিনতেন আপনি, এটা জানতাম না আমি। বেশ কয়েক বছর ধরে তার কাছে চিকিৎসা নিয়েছেন। গ্রোভে তাকে প্রথমবার দেখেই চিনে ফেলেছিলেন নিশ্চয়ই? বিষয়টা আপনার জন্যে পীড়াদায়ক ছিল, তাই না?”
প্রশ্নোচ্ছলে কথাটা বললেও তার পক্ষ থেকে কোন জবাব পেলাম না। ক্রিস্টিয়ানের কথা শুনেও কোন ভাবান্তর হলো না তার মধ্যে। অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে-যেন বিরক্ত হচ্ছে আমার বকবকানি শুনে। এখন আর কোন কিছু আশা করছে না আমার কাছ থেকে। ওর কাছে হয়তো ব্যর্থ মনে। হচ্ছে আমাকে।
কিন্তু আমি তো এখনও হাল ছাড়িনি।
“এখানে ভিন্ন কোন ব্যাপার আছে। ডায়েরিটা পড়ে শেষ করার পরেও অনেকগুলো প্রশ্নের জবাব পাইনি, সেগুলোর উত্তর আমাকেই খুঁজে বের করতে হবে। কিছু বিষয় আমার বোধগম্য হচ্ছে না, ঠিক মিলছে না তথ্যগুলো। আপনি যখন নিজে থেকে আমাকে ডায়েরি পড়তে দিয়েছেন, তাই এসকল ব্যাপারে আরো খোঁজখবর নেয়াটা আমার দায়িত্ব বলে মনে হচ্ছে। আশা করি কথাগুলো আপনাকে বোঝাতে পেরেছি।”
