অ্যালিসিয়াকে ডায়েরিটা ফিরিয়ে দিলাম। জিনিসটা নিয়ে কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে আমার দিকে তাকালো সে।
“আমি আপনার পক্ষে,” কিছুক্ষণ পর বললাম। “সেটা তো নিশ্চয়ই জানেন, তাই না?”
উত্তর দিল না অ্যালিসিয়া।
মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ ধরে নিলাম।
.
৪.৫
ক্যাথি ইদানীং আর সাবধানতার ধার ধারে না। আসলে এমনটাই হবার ছিল। ভেবেছে এতদিনেও যখন তার পরকীয়া সম্পর্কে আমি কিছু বুঝতে পারিনি, আর পারবোও না।
বাড়ি ফিরে দেখি বাইরে যাওয়ার জন্যে রেডি হচ্ছে ও।
“একটু হাঁটতে বের হবো,” জুতো পায়ে গলিয়ে বলল। “বেশি দেরি করবো না।”
“আমিও ব্যায়ামের কথা ভাবছিলাম। আসবো নাকি তোমার সাথে?”
“নাহ্, হাঁটতে হাঁটতে সংলাপগুলো প্র্যাকটিস করতে হবে।”
“তুমি চাইলে আমি সাহায্য করতে পারি।”
“থাক, তোমার কষ্ট করতে হবে না। আর আমি একা প্র্যাকটিস করলেই মনে রাখতে সুবিধে হবে। দ্বিতীয় পর্বের সংলাপগুলো একটু জটিল। পুরো পার্কে হাঁটি আর আপনমনে কথা বলি। সবাই এমনভাবে তাকায় যেন পাগল হয়ে গেছি।”
এমনভাবে কথাগুলো বলল ক্যাথি যে আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে বিশ্বাস করেই ফেলতো। একবারের জন্যেও চোখ অন্যদিকে সরায়নি। একদম পাক্কা অভিনেত্রী যাকে বলে?
তবে আমিও কম যাই না। মুখে একটা উষ্ণ হাসি ফুটিয়ে বললাম, “সাবধানে হেঁটো।”
ও ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পর আমিও বের হয়ে আসলাম। নির্দিষ্ট একটা দূরত্ব বজায় রেখে অনুসরণ করছি। কিন্তু একবারের জন্যেও পেছনে ফিরে তাকালোনা ক্যাথি। বললাম না, এখন আর সাবধানতার ধার ধারে না।
পাঁচ মিনিট হাঁটার পর পার্কের প্রবেশপথের কাছে পৌঁছুল সে। এ সময় ছায়া থেকে একজন বেরিয়ে এসে এগিয়ে গেল তার দিকে। তবে উল্টোদিকে ঘুরে থাকায় চেহারাটা দেখতে পেলাম না। মাথার চুল কালো, শক্তপোক্ত শরীর, আমার থেকে বেশ খানিকটা লম্বা।
ক্যাথি লাফিয়ে পড়লো লোকটার ওপরে। শক্ত করে একে অপরকে কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে রাখলো দু’জনে। কিছুক্ষণ পরেই এক হয়ে গেল তাদের ঠোঁট। যেমন অনেকদিনের ক্ষুধার্ত, এমনভাবে একজন আরেকজনকে আদর করছে তারা। যা চলছে আমার সামনে, তার বর্ণনা কিভাবে দেব জানি না। ক্যাথির দেহে পরপুরুষের স্পর্শ-ব্যাপারটা অদ্ভুত বলাটা কি ঠিক হবে? আসলে আমার ভেতরের অনুভূতিগুলো ঠিকঠাক কাজ করছিল না সে মুহূর্তে। আড়ালে যাবারও প্রয়োজনবোধ করেনি তারা। এখন কাপড়ের ওপর দিয়েই ক্যাথির স্তনগুলো নিয়ে খেলছে লোকটা।
বুঝতে পারছি, আমার লুকিয়ে পড়া উচিৎ। ক্যাথি যদি একবার পিছে ফেরে, তাহলেই ধরা পড়ে যাবো। তবুও নড়তে পারছিলাম না। কি এক জাদুবলে আমাকে সেখানেই আটকে ফেলেছিল দৃশ্যটা।
এক সময় চুমুর পর্ব শেষ হলো তাদের। হাত ধরাধরি করে পার্কে ঢুকে পড়লো। রোবটের মত পিছু নিলাম আমি, এখনও বেশ খানিকটা দূরেই আছি। উচ্চতার কথা বাদ দিলে লোকটার দেহাবয়ব আমার মতনই, একবার তো মনে হলো নিজেকেই দেখছি পার্কে ক্যাথির সাথে হেঁটে বেড়াতে।
গাছপালায় ঘেরা একটা নির্জন জায়গায় লোকটাকে নিয়ে গেল ক্যাথি। দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল দুজনে।
পেটের ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠলো আমার। বেশ খানিকক্ষণ ধরেই ভারি নিশ্বাস পড়ছে। মাথার ভেতরে ক্রমাগত একটা কণ্ঠ শুনেই যাচ্ছি-চলে যাও এখান থেকে, চলে যাও, চলে যাও। কিন্তু গেলাম না আমি। বরং ওদের অনুসরণ করে ভেতরে ঢুকে গেলাম।
খুব সাবধানে এগোচ্ছি, যাতে কোন শব্দ না হয়। তবুও পায়ের নিচে বেশ কয়েকটা শুকনো ডাল মটমট করে ভাঙলো। ওদেরকে কোথাও চোখে পড়লো না, আসলে এদিকে গাছপালা এত ঘন হয়ে জনেছে যে দুই হাত দূরের জিনিসও দেখা দায়।
তাই যেখানে ছিলাম সেখানেই থেমে কান পাতলাম। প্রথমে একটা খচখচ শব্দ কানে এলো। ভাবলাম বাতাসে পাতা নড়ার শব্দও হতে পারে, কিন্তু পরক্ষণেই ভুলটা ভেঙে গেল। আরেকটা খুব পরিচিত শব্দ কানে এসেছে।
ক্যাথির শিকার। কখন এরকম শব্দ করে ও সেটা খুব ভালো করেই জানা আছে আমার।
আরেকটু সামনে এগোনোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শুকনো ডাল আর পাতার কারণে সুবিধে করতে পারলাম না। নিজেকে মাকড়সার জালে আটকা পড়া শিকারের মতন মনে হচ্ছে। আধো আলো আধধা অন্ধকারে, স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধের মধ্যে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। ক্যাথির গোঙানি ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। লোকটা নিশ্চয়ই এখন চড়ে বসেছে ওর ওপরে। ঝোঁপের আড়ালে লীলাখেলায় মত্ত দুই মানব-মানবী।
ঘেন্নায় রীতিমতো কাঁপছি এখন আমি। হঠাৎ করেই উদয় হয়ে আমার জীবনটাকে তছনছ করে দিয়েছে লোকটা। আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। জীবন এতটা নিষ্ঠুর হয় কী করে? আমি তো কখনো কোন পাপ করিনি। অন্য কারো স্ত্রীর দিকে চোখ তুলেও তাকাইনি। একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে এরকম অসুস্থ কাজ করা সম্ভব? আসলে সে মানুষই না, আস্ত জানোয়ার। কেন? কেন এসব হচ্ছে। আমার সাথে। কাউকে নিজের চাইতে বেশি ভালোবাসাটাই কি তাহলে ভুল ছিল? নাকি ফাঁক ছিল আমার ভালোবাসায়?
এই লোকটা কি ক্যাথিকে ভালোবাসে? সন্দেহ আছে সে ব্যাপারে। অন্তত আমার মত করে ভালোবাসে না। শুধু ওর দেহটাকে ভালোবাসে। আসলে আমি যেভাবে ক্যাথিকে ভালোবাসি, সেটা অন্য কারো কাছ থেকে পাবে না সে। ওর জন্যে আমি জান দিতেও রাজি, জান নিতেও রাজি।
