“দেখো, ডায়োমেডেস যদি এ ব্যাপারে কিছু জানতে পারে, তাহলে…তাহলে আমার চাকরিই চলে যাবে। এটা তো বুঝতে পারছে তুমি, নাকি?” ওর কণ্ঠে করুণা প্রার্থনার ছাপ স্পষ্ট।
কিন্তু আমার সহানুভূতির বিন্দু পরিমাণও ক্রিস্টিয়ানের জন্যে বরাদ্দ নয়। ওর কাছ থেকে কখনোই ভালো ব্যবহার পাইনি। “প্রফেসরের কথা বাদ দাও। একবার যদি মেডিক্যাল কাউন্সিলের কাছে খবরটা যায়, তাহলে কি হবে বলো দেখি? তোমার লাইসেন্স কেড়ে নিবে।”
“সেটা তোমার ওপর নির্ভর করছে। তুমি যদি না বলো, তাহলে তো কেউ জানবে না। থিও, আমার ক্যারিয়ারের ব্যাপার এটা, বোঝার চেষ্টা করো। প্লিজ।”
“সেটা আগে চিন্তা করা উচিৎ ছিল, তাই না?”
“থিও, প্লিজ-”
আমার কাছে এরকম অনুনয় করতে নিশ্চয়ই ভালো লাগছে না ক্রিস্টিয়ানের। সত্যি বলতে আমিও যে কোনপ্রকার আত্মতৃপ্তিতে ভুগছি, এমনটা নয়। বরং বিরক্তি লাগছে। ডায়োমেডেসকে কিছু জানানোর ইচ্ছে আপাতত আমার নেই। ওকে ঝুলিয়ে রাখাটাই আমার জন্যে সুবিধাজনক। তাহলে হাতের মুঠোয় থাকবে।
“কাউকে কিছু বলবো না। আপাতত।”
“ধন্যবাদ, থিও। মন থেকে বলছি কথাটা। তোমার কাছে সদা ঋণী থাকবো।”
“বাদ দাও এসব। তবে আমাকে অনেক কিছুই নিশ্চয়ই বলার আছে তোমার?”
“কি জানতে চাও?
“অ্যালিসিয়ার ব্যাপারে।”
“অ্যালিসিয়ার ব্যাপারে কি?”
“সবকিছু।”
.
৪.৩
কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো ক্রিস্টিয়ান, আবারো চপস্টিকগুলো নাড়াচাড়া করছে। কয়েক সেকেন্ড ভাবনা চিন্তার পর কথা বলা শুরু করলো।
“আসলে খুব বেশি কিছু বলার নেই। তুমি ঠিক কি জানতে চাচ্ছো, সেটা বুঝতে পারছি না। কোথা থেকে শুরু করবো?”
“একদম প্রথম থেকেই। বেশ কয়েক বছর ধরেই তো ওকে দেখে আসছো তুমি?”
“না, মানে হ্যাঁ। কিন্তু তুমি যতটা ভাবছো, ওরকম দেখা সাক্ষাৎ হতো না আমাদের। ওর বাবা মারা যাবার পর দুই কি তিনবার এসেছিল আমার কাছে।”
“শেষবার কবে যায়?”
“হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ আগে।”
“তখন তার মানসিক অবস্থা কেমন মনে হয়েছিল তোমার?”
“ওহ…” চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো ক্রিস্টিয়ান, আপাতত বিপদ কেটে গেছে বুঝতে পারছে। “খুবই খারাপ। সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতো, উল্টোপাল্টা জিনিস কল্পনা করতো। এরকমটা আগেও হয়েছিল। এর সমস্যা তার বহুদিনের। এই ভালো তো এই খারাপ। বর্ডারলাইন রোগিরা যেমন হয় আর কি।”
“এসব টেকনিকাল টার্ম কপচানোর কোন দরকার নেই। যেটুকু জিজ্ঞেস করছি সেটুকু ঠিকঠাক উত্তর দাও, ব্যস।”
আবারো আহত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো ক্রিস্টিয়ান। তবে তর্ক করলো না। “কি জানতে চাচ্ছো?” ক্লান্ত কণ্ঠে বলল।
“অ্যালিসিয়া বলেছিল যে কেউ তার ওপরে লক্ষ্য রাখছিল, তাই তো?”
শুন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় ক্রিস্টিয়ান। “লক্ষ্য রাখছিল মানে?”
“কেউ নজর রাখতে অ্যালিসিয়াদের বাড়িতে। তোমাকে তো এ ব্যাপারে বলেছিল বোধহয়?”
অদ্ভুত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আমাকে অবাক করে দিয়ে হেসে উঠলো ক্রিস্টিয়ান।
“হাসির কি আছে এখানে?”
“তুমি কি আসলেও কথাটা বিশ্বাস করেছো? কেউ সবসময় নজর রাখতো ওর ওপরে?”
“কেন, তোমার বিশ্বাস হয়নি?”
“পুরোটাই ওর উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা। আমি তো ভেবেছিলাম এটা বুঝতে পেরেছো তুমি।”
মাথা নাড়লাম জবাবে। “ডায়েরিতে এমনভাবে বর্ণনা দেয়া যে বিশ্বাস না করে পারিনি।”
“ব্যাপারটা যে কল্পনা সেটা তো আর অ্যালিসিয়া জানতো না। সুতরাং বর্ণনা বাস্তবই হবে। ওর সম্পর্কে যদি আগে থেকে না জানতাম তাহলে আমিও বিশ্বাস করতাম। আসলে ও মানসিক সমস্যায় ভুগছিল।”
“বারবার কথাটা বলছো। ডায়েরি পড়ে কিন্তু আমার সেরকমটা মনে হয়নি। এখানে সে যা লেখেছে এরকমটা কিন্তু অহরহ ঘটে চলেছে।”
“আরে তোমাকে তো বললামই, ওর বাবা মারা যাবার পরেও এমনটা হয়েছিল। তখন ওয়েস্ট গ্রিনে থাকতো গ্যাব্রিয়েল আর অ্যালিসিয়া। ওখানকার বাসাটা ছেড়ে দেয় শেষ পর্যন্ত। বলতো যে, এক বয়স্ক লোক নাকি নজর রাখতে ওর ওপরে। বেশ হৈচৈও করে এটা নিয়ে। শেষমেষ দেখা যায় বেচারা অন্ধ। আগে থেকেই নানারকম সমস্যায় ভুগছিল ও। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়। এরপর আর পুরোপুরি সুস্থ হয়নি।”
“অ্যালিসিয়া তার বাবার ব্যাপারে তোমার সাথে কখনো আলাপ করেছিল?”
কাঁধ ঝাঁকালো ক্রিস্টিয়ান। “নাহ, খুব বেশি কিছু কখনো বলেনি। কথায় কথায় তার প্রসঙ্গ উঠলে বলতো, দুজনের সম্পর্ক স্বাভাবিকই ছিল। মানে ওর মা আত্মহত্যা করার পর যতটা স্বাভাবিক হওয়া সম্ভব আর কি। আসলে আমার কাছে যে একটু হলেও মুখ খুলেছিল অ্যালিসিয়া, এটাই অনেক। রোগি হিসেবে সুবিধের ছিল না। তুমিও নিশ্চয়ই এখন ব্যাপারটা বুঝতে পারছো।”
কোন মন্তব্য করলাম না এ ব্যাপারে। “বাবা মারা যাবার পর আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল সে?”
আবারো কাঁধ ঝাঁকালো ক্রিস্টিয়ান। “চাইলে সেটাকে আত্মহত্যার চেষ্টা বলতে পারো তুমি। কিন্তু আমি বলবো না।”
“তুমি কি বলবে শুনি?”
“বড়জোর আত্মঘাতী আচরন বলতে পারো, কিন্তু আত্মহত্যা করারটা কখনোই ওর মূল উদ্দেশ্য ছিল না। নিজেকে কষ্ট দেয়াটা ওর মত আত্মকেন্দ্রিক কারো পক্ষে সহজ কাজ নয়। মানে সে কতটা মানসিক কষ্টে আছে এটা বোঝানোর জন্যে ওষুধ খাবার নাটকটা করেছিল। গ্যাব্রিয়েলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছিল আর কি। ছেলেটার কথা ভাবলে খারাপই লাগে আমার। যদি অ্যালিসিয়ার বলা কথাগুলো গোপন রাখতে বাধ্য না হতাম, তাহলে ওকে হয়তো বলেই বসতাম যে সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে আসতে।”
