ডেস্কের ড্রয়ারে ডায়েরিটা রেখে উঠে দাঁড়ালাম। পরক্ষণেই মত পাল্টে ওটা বের করে কোটের পকেটে ঢুকিয়ে রাখলাম, নিজের কাছে রাখাটাই নিরাপদ।
আমার অফিস থেকে বেরিয়ে নিচতলায় চলে এলাম। গন্তব্য করিডোরের শেষ মাথার রুমটা।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। একটা ছোট ফলকে নাম খোদাই করা সেখানে।
ডঃ সি. ওয়েস্ট।
নক করার তোয়াক্কা না করেই দরজা খুলে ভেতরে পা রাখলাম।
.
৪.২
ডেস্কে বসে চপস্টিকস দিয়ে আয়েশ করে সুশি খাচ্ছিল ক্রিস্টিয়ান। দ্রু কুঁচকে তাকালো আমার দিকে।
“তোমাকে কি কেউ নক করা শেখায়নি?”
“জরুরি কথা আছে।”
“খাচ্ছি এখন, পরে বোলো।”
“খুব বেশিক্ষণ সময় নষ্ট করবো না। একটা প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন আমার। তুমি কি কখনো অ্যালিসিয়া বেরেনসনের চিকিৎসা করেছিলে?”
মুখের সুশিটা গিলে অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো ক্রিস্টিয়ান। “মানে? তুমি তো জানোই যে আমিই এখানে ওর চিকিৎসা দলের প্রধান।”
“এখানকার কথা বলছি না। গ্রোভে ভর্তি হবার আগে কখনো ওর চিকিৎসা করেছিলে?”
খুব ভালো করে লক্ষ্য করি ক্রিস্টিয়ানকে। চেহারার অভিব্যক্তির পরিবর্তন দেখেই যা বোঝার বুঝে গেলাম। ডঃ ওয়েস্টকে পেয়ে গেছি। পরো লাল হয়ে গেছে বেচারার চেহারা। চপস্টিকগুলো নামিয়ে রাখলো।
“কী বলছো এসব?”
অ্যালিসিয়ার ডায়েরিটা পকেট থেকে বের করে ওকে দেখালাম।
“গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস হাতে এসেছে আমার। অ্যালিসিয়ার ডায়েরি। হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস আগে এখানে লেখা শুরু করেছিল সে। পুরোটা পড়া শেষ করলাম একটু আগে।”
শঙ্কা ফুটলো ক্রিস্টিয়ানের চেহারায়। “কোথায় পেলে এটা?”
“অ্যালিসিয়া নিজেই দিয়েছে।”
“এর সাথে আমার কি সম্পর্ক?”
“তোমার কথা এখানে লিখেছে সে।”
“আমার কথা?”
“গ্রোভে ভর্তি হবার আগেও ওর সাথে দেখা হয়েছে তোমার। এটা তো জানতাম না।”
“আমি…আমি বুঝতে পারছি না তোমার কথা। নিশ্চয়ই কোন ভুল হচ্ছে।”
“মনে হয় না। প্রাইভেট প্র্যাকটিসের অংশ হিসেবে তুমি বেশ কয়েকবারই ওর চিকিৎসা করেছে। তা সত্ত্বেও বিচার চলাকালীন সময়ে আদালতে কিছু বলোনি। অথচ তোমার কথাগুলো আদালতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচ্য হতো। অ্যালিসিয়াকে যে আগে থেকেই চিনতে, সেটা এখানে কাজ শুরু করার সময় স্বীকারও করোনি। কিন্তু তোমাকে চিনতে নিশ্চয়ই কষ্ট হয়নি অ্যালিসিয়ার। সে যে কথা বলে না, এটা তোমার সৌভাগ্য।”
স্বাভাবিক স্বরে কথাগুলো বললেও ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড রেগে গিয়েছি। এখন বুঝতে পারছি যে অ্যালিসিয়ার ব্যাপারটা নিয়ে ক্রিস্টিয়ান কেন এভাবে আমার পেছনে লেগেছে। সে চুপ থাকলেই ওর জন্যে ভালো।
“এতটা স্বার্থপর হয় কিভাবে মানুষ?”
আতঙ্কিত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো ক্রিস্টিয়ান। “ধুর, বিড়বিড় করে বলল একবার। “ধুর। থিও, শোনো-তুমি যা ভাবছো আসলে ব্যাপারটা ওরকম না।”
“তাহলে কী রকম?”
“ডায়েরিতে আর কি লেখা?”
“আর কি লেখা থাকার কথা?”
জবাব দিলনা ক্রিস্টিয়ান। “আমি কি একবার পড়তে পারি?” হাত সামনে বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো।
মাথা ঝাঁকিয়ে না করে দিলাম। “সেটা ঠিক হবে না।”
হাতের চপস্টিকগুলো আনমনে নাড়াচাড়া করছে ক্রিস্টিয়ান। “আসলে কাজটা করা উচিৎ হয়নি আমার। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার খারাপ কোন উদ্দেশ্য ছিল না।”
“বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কিছু নেই। তুমি যদি সাধুই হতে তাহলে বিচার চলাকালীন সময়ে কিছু বলোনি কেন?”
“কারণ, আমি তো অ্যালিসিয়ার চিকিৎসা করেছি গোপনে। গ্যাব্রিয়েলের অনুরোধে। ইউনিভার্সিটির বন্ধু আমরা। ওর বিয়েতেও গিয়েছিলাম। এরপর অবশ্য যোগাযোগ কমে যায়। একদিন হঠাই ফোন দিয়ে বলে ওর স্ত্রীকে দেখাবার জন্যে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট খুঁজছে। বাবার মৃত্যুর পর একদম ভেঙে পড়েছে সে।”
“আর তুমি নিজেই চিকিৎসা করার জন্যে লাফিয়ে উঠলে।”
“না, একদমই না। বরং উল্টোটা ঘটেছিল। আমি আমার এক সহকর্মীর কথা বলেছিলাম গ্যাব্রিয়েলকে। কিন্তু ও বারবার বলে, আমাকেই দেখতে হবে অ্যালিসিয়াকে। আসলে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানোর কোন ইচ্ছে ছিল না অ্যালিসিয়ার, তাই গ্যাব্রিয়েল ভাবে, পরিচিত কেউ হলে সে অতটা আপত্তি করবে না। আমার ইচ্ছে ছিল না আসলেই।”
“তা তো বুঝতেই পারছি।”
আহত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় ক্রিস্টিয়ান। “এভাবে ব্যঙ্গ করার মতন কিন্তু কিছু হয়নি।”
“কোথায় তোমার সাথে দেখা করতে অ্যালিসিয়া?”
“আমার গার্লফ্রেন্ডের বাসায়। কিন্তু তোমাকে যেমনটা বললাম,” দ্রুত যোগ করলো সে, “পুরোটাই অনানুষ্ঠানিক, বলা যায় গল্প গুজবের ফাঁকে ওর সমস্যাগুলোর কথা শুনেছিলাম। তাও অল্প কয়েকবার।”
“আচ্ছা। সেই ‘অনানুষ্ঠানিক’ গল্প গুজবের জন্যে ফি নিয়েছিলে?”
চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল ক্রিস্টিয়ান। “ইয়ে মানে, গ্যাব্রিয়েলের জোরাজুরির কারণে-”
“নগদেই নিয়েছিলে নিশ্চয়ই?”
“থিও–”
“নগদ নিয়েছিলে কি না সেটা বলো।”
“হ্যাঁ, কিন্তু
“কাগজে কলমে এই লেনদেনের তো কোন অস্তিত্ব নেই?”
কোন জবাব দিল না ক্রিস্টিয়ান। অর্থাৎ আমার ধারণাই ঠিক। সেজন্যেই অ্যালিসিয়ার বিচার চলাকালীন সময়ে কিছু বলেনি সে। এরকম ‘ব্যক্তিগতভাবে আর কতজনকে ‘অনানুষ্ঠানিক চিকিৎসা দেয় সে কে জানে।
