গ্যাব্রিয়েল জবাব দেয়নি। চোয়াল শক্ত করে বসে ছিল, বিরক্ত হলে যেমনটা করে। চুপচাপ ম্যাক্সের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকি আমরা।
ম্যাক্স ওর রিসিপশনিস্ট তানিয়েকে নিয়ে এসেছিল। ওদের মধ্যে কিছু একটা চলছে। ম্যাক্সের ভাব দেখে মনে হচ্ছিল যেন রাজরাণীকে সাথে করে নিয়ে এসেছে। একটু পর পর নানা ছুতোয় তার হাতে হাত রাখছিল, চুমু খাচ্ছিলো। আমার দিক থেকে কিন্তু চোখ ফেরায়নি এক মুহূর্তের জন্যেও। কি ভাবছিল? ওকে তানিয়ার সাথে দেখলে হিংসায় জ্বলবো আমি? ওর কথা ভাবলেই ঘেন্না লাগে আমার।
তানিয়াও বুঝতে পারে কোন একটা সমস্যা আছে। ম্যাক্সকে কয়েকবার আমার দিকে তাকাতে দেখে ফেলে সে। সাবধান করে দিতে হবে মেয়েটাকে। সামনে কি অপেক্ষা করছে সেটা জানলে হয়তো ভুলটা করবে না। কিন্তু এখনই কিছু বলবো না। আগে আমার নিজের সমস্যার সমাধান হোক।
ডিনারের এক পর্যায়ে ম্যাক্স বলে যে বাথরুমে যাবে সে। এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে আমিও একই অজুহাত দেখিয়ে উঠে যাই।
বাথরুমের কাছে গিয়ে ওর হাত চেপে ধরি শক্ত করে।
“তোমাকে থামাতে হবে এসব! বুঝেছছ? থামাতে হবে!”
শয়তানি হাসি ফোটে ম্যাক্সের চেহারায়। “কি থামাবো?”
“আমার ওপর নজর রাখছো তুমি, ম্যাক্স। আমি জানি!”
“আবোলতাবোল কি বলছো এসব, অ্যালিসিয়া?”
“মিথ্যে বলবে না,” স্বাভাবিক স্বরে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল আমার। “আমি দেখেছি তোমাকে, ঠিক আছে? ছবিও তুলেছি। আমার কাছে তোমার ছবি আছে!”
হাসে ম্যাক্স। “তোমার মাথার স্কু আসলেও ঢিলা হয়ে গেছে।”
আর সহ্য হয় না। জোরে থাপ্পড় দেই ওর গালে।
একটা শব্দ শুনে ঘুরে তাকিয়ে দেখি তানিয়া দাঁড়িয়ে আছে ওখানে। চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল থাপ্পড়টা তার গালেই পড়েছে।
একবার ম্যাক্স আরেকবার আমার দিকে তাকিয়ে কিছু না বলেই রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে যায় সে।
চোখ গরম করে আমার দিকে তাকায় ম্যাক্স। তানিয়াকে অনুসরণ করার আগে নিচুগলায় বলে, “তোমার পেছনে সময় নষ্ট করতে আমার বয়েই গেছে। একবারও তোমাদের বাসার ওদিকে যাইনি। আর নজর রাখবোই বা কেন? সরো, যেতে দাও আমাকে।”
তার কণ্ঠে এমন কিছু একটা ছিল যে বুঝতে পারি সে সত্যিটাই বলছে। না চাইতেও বিশ্বাস করতে হয় কথাটা।
কিন্তু লোকটা যদি ম্যাক্স না হয়, তাহলে কে?
.
২৫ অগাস্ট
বাইরে থেকে একটা শব্দ কানে এসেছে কেবলই। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি কেউ একজন ছায়ায় নাড়াচাড়া করছে।
লোকটা এসেছে। বাইরে সুযোগের অপেক্ষা করছে এখন।
গ্যাব্রিয়েলকে ফোন দিয়েছিলাম, কিন্তু ও ধরেনি। পুলিশকে ফোন দিব? কি করবো বুঝতে পারছি না। হাত এত কাঁপছে যে লিখতেও
নিচতলা থেকে এখন ক্রমাগত শব্দ শুনতে পাচ্ছি। জানালা খোলার চেষ্টা করেছে কিছুক্ষণ। এখন দরজা ধাক্কাচ্ছে। ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে
আমাকে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। পালাতে হবে যে করেই হোক।
ঈশ্বর! তার হাঁটার শব্দ এখন একদম স্পষ্ট
ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
বাসার ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
৪.০১ অ্যালিসিয়ার ডায়েরিটা বন্ধ করে
চতুর্থ পর্ব
অনেকেই ভাবেন যে থেরাপির মাধ্যমে অতীতের ভুল শোধরানো হয়, এটা বেশ বড়সড় ভুল। বরং বলা যায় যে একজন সাইকোথেরাপিস্ট তার রোগিকে নিজের অতীত সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন, মুখোমুখি হতে শেখান।
–অ্যালিস মিলার
৪.১
অ্যালিসিয়ার ডায়েরিটা বন্ধ করে ডেস্কের ওপরে নামিয়ে রাখলাম।
একদম স্থির হয়ে চুপচাপ বসে রইলাম সেখানে, জানালায় বৃষ্টির ছাট এসে লাগছে। আলতো শব্দটা মনকে শান্ত করার জন্যে আদর্শ। এতক্ষণ যা পড়লাম তা বোঝার চেষ্টা করছি। অ্যালিসিয়া বেরেনসনকে চেনার অনেকটাই বাকি ছিল এতদিন। তার মনের বদ্ধ দুয়ারের অপর পাশে কী আছে তা খানিকটা হলেও জানতে পেরেছি অবশেষে। আর তথ্যগুলো যে আমাকে চমকে দিয়েছে, সেটা বলাই বাহুল্য।
অনেক প্রশ্ন জড়ো হয়েছে মনে। অ্যালিসিয়া সন্দেহ করতো যে কেউ তার ওপর নজর রাখছে। লোকটার পরিচয় কি বের করতে পেরেছিল সে? কাউকে বলেছিল? এটা জানতে হবে আমাকে। যতদূর বুঝেছি গ্যাব্রিয়েল, বার্বি হেলমান আর ডঃ ওয়েস্টের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করেছিল সে। আর কেউ কি জানে? আরেকটা প্রশ্ন খোঁচাচ্ছে আমাকে। ডায়েরিটা এরকম হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল কেন? এর পরের ঘটনাগুলো কি অন্য কোথাও লেখা হয়েছে? অন্য কোন ডায়েরি, যেটা সে দেয়নি আমাকে? তাছাড়া আমাকে অ্যালিসিয়ার নিজের ব্যক্তিগত ডায়েরি পড়তে দেয়ার কারণটাও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। এর অর্থ কি আমাকে বিশ্বাস করে সে? নাকি অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে?
এই ডঃ ওয়েস্টকেও খুঁজে বের করতে হবে যে করেই হোক। গোটা ব্যাপারটার একজন গুরুত্বপূর্ণ স্বাক্ষী তিনি, হত্যাকাণ্ডের আগের দিনগুলোয় অ্যালিসিয়ার মানসিক অবস্থা কেমন ছিল সে সম্পর্কেও তথ্য আছে তার কাছে। তা সত্ত্বেও অ্যালিসিয়ার বিচার চলাকালীন সময়ে তিনি এগিয়ে আসেননি। কেন? তার কথা কোথাও কেউ উল্লেখও করেনি। ডায়েরিতে নামটা না দেখলে তার অস্তিত্বের কথা জানতামই না। কতটা জানেন তিনি? কেন কিছু বলেননি?
ডঃ ওয়েস্ট।
আমি যার কথা ভাবছি সে হতেই পারে না। তাদের নাম মিলে যাওয়াটা একান্তই কাকতালীয়। তবে নিশ্চিত হতে হবে আমাকে।
