গ্যাব্রিয়েল বারবার জিজ্ঞেস করে যে কেমন আছি আমি। আসলে জানতে চায় পাগলামিটা মাথা থেকে দূর হয়েছে কিনা। ও যে আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আমার অভিনয় ঠিকঠাক হচ্ছে না বোধহয়, আরো ভালো করে চেষ্টা করতে হবে। সারাদিন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার অভিনয় করি। কিন্তু আসলে কিছুই আঁকানো হয় না, মনোযোগ ছাড়া এ ধরণের কাজ অসম্ভব। এই কথাগুলো লেখার সময়েও আমি নিশ্চিত করে বলতে পারবো না যে জীবনে আর কখনো ঠিকঠাক ছবি আঁকতে পারবো কি না। অন্তত এই ঝামেলা শেষ হবার আগে তো পারবোই না।
বাইরে না যাবার ব্যাপারে এতদিন নানারকম অজুহাত দেখিয়েছি। কিন্তু গ্যাব্রিয়েল বলেছে যে আজ রাতে বের হতেই হবে, ম্যাক্স দাওয়াত দিয়েছে আমাদের।
এরকম সময়ে ম্যাক্সের সাথে দেখা হবে ভাবতেই গা ঘিনঘিন করছে। গ্যাব্রিয়েলের সাথে অনেকক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করেছি, কিন্তু লাভ হয়নি। বরং ও বলে যে গেলেই নাকি লাভ হবে আমার! মন থেকেই কথাটা বলেছে সে, তাই আমিও আর না করতে পারিনি।
আজ রাতে কি হবে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে খুব। কারণ একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে শুরু করার পরই সব পরিস্কার হয়ে যায়। একদম খাপে খাপে মিলে গেছে। এতদিন কেন ব্যাপারটা বুঝিনি, সেটাই রহস্য।
বাইরে থেকে যে লোকটা আমার ওপর নজর রাখে, সে জিন-ফিলিক্স নয়। ওকে খুব ভালো করেই চিনি আমি, এতটা নিচে সে কখনোই নামবে না। কিন্তু আমাকে ইচ্ছে করে জ্বালাতন করার মত আর কে বাদ থাকে? যার উদ্দেশ্যে আমাকে এভাবে শাস্তি দেয়া?
ম্যাক্স।
এছাড়া অন্য কেউ হতেই পারে না। আমাকে পাগল বানানোর যুদ্ধে নেমেছে সে।
খুব ভয় লাগছে, কিন্তু মনে সাহস জড়ো করতে হবে। আজকে রাতেই কাজটা করবো আমি।
ওর মুখোমুখি হবো।
.
২৪ অগাস্ট
এতদিন পর গতরাতে বাসা থেকে বের হয়ে একটু অদ্ভুতই লাগছিল।
মনে হচ্ছিলো যেন অ্যাকুরিয়াম থেকে সাগরে এসে পড়েছি। মাথার ওপরে বিশাল খোলা আকাশটাও অচেনা ঠেকছিল। পুরোটা সময় গ্যাব্রিয়েলকে শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম।
আমাদের পছন্দের রেস্তোরাঁ অগাস্তো’সে গিয়েও ভালো লাগছিল না। বারবার মনে হচ্ছিল কি যেন একটা নেই। আর গন্ধটাও অন্যরকম ঠেকছিল, কোন কিছু পোড়ার গন্ধ। গ্যাব্রিয়েলকে জিজ্ঞেস করলে বলে যে সে কোন গন্ধ পাচ্ছে না। গোটাটাই আমার কল্পনা।
“সব ঠিকঠাকই আছে,” বলে ও। “শান্ত হও।”
“আমি তো শান্তই আছি। দেখে কি মনে হচ্ছে তোমার?”
গ্যাব্রিয়েল জবাব দেয়নি। চোয়াল শক্ত করে বসে ছিল, বিরক্ত হলে যেমনটা করে। চুপচাপ ম্যাক্সের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকি আমরা।
ম্যাক্স ওর রিসিপশনিস্ট তানিয়েকে নিয়ে এসেছিল। ওদের মধ্যে কিছু একটা চলছে। ম্যাক্সের ভাব দেখে মনে হচ্ছিল যেন রাজরাণীকে সাথে করে নিয়ে এসেছে। একটু পর পর নানা ছুতোয় তার হাতে হাত রাখছিল, চুমু খাচ্ছিলো। আমার দিক থেকে কিন্তু চোখ ফেরায়নি এক মুহূর্তের জন্যেও। কি ভাবছিল? ওকে তানিয়ার সাথে দেখলে হিংসায় জ্বলবো আমি? ওর কথা ভাবলেই ঘেন্না লাগে আমার।
তানিয়াও বুঝতে পারে কোন একটা সমস্যা আছে। ম্যাক্সকে কয়েকবার আমার দিকে তাকাতে দেখে ফেলে সে। সাবধান করে দিতে হবে মেয়েটাকে। সামনে কি অপেক্ষা করছে সেটা জানলে হয়তো ভুলটা করবে না। কিন্তু এখনই কিছু বলবো না। আগে আমার নিজের সমস্যার সমাধান হোক।
ডিনারের এক পর্যায়ে ম্যাক্স বলে যে বাথরুমে যাবে সে। এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে আমিও একই অজুহাত দেখিয়ে উঠে যাই।
বাথরুমের কাছে গিয়ে ওর হাত চেপে ধরি শক্ত করে।
“তোমাকে থামাতে হবে এসব! বুঝেছছ? থামাতে হবে!”
শয়তানি হাসি ফোটে ম্যাক্সের চেহারায়। “কি থামাবো?”
“আমার ওপর নজর রাখছো তুমি, ম্যাক্স। আমি জানি!”
“আবোলতাবোল কি বলছো এসব, অ্যালিসিয়া?”
“মিথ্যে বলবে না,” স্বাভাবিক স্বরে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল আমার। “আমি দেখেছি তোমাকে, ঠিক আছে? ছবিও তুলেছি। আমার কাছে তোমার ছবি আছে!”
হাসে ম্যাক্স। “তোমার মাথার স্কু আসলেও ঢিলা হয়ে গেছে।”
আর সহ্য হয় না। জোরে থাপ্পড় দেই ওর গালে।
একটা শব্দ শুনে ঘুরে তাকিয়ে দেখি তানিয়া দাঁড়িয়ে আছে ওখানে। চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল থাপ্পড়টা তার গালেই পড়েছে।
একবার ম্যাক্স আরেকবার আমার দিকে তাকিয়ে কিছু না বলেই রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে যায় সে।
চোখ গরম করে আমার দিকে তাকায় ম্যাক্স। তানিয়াকে অনুসরণ করার আগে নিচুগলায় বলে, “তোমার পেছনে সময় নষ্ট করতে আমার বয়েই গেছে। একবারও তোমাদের বাসার ওদিকে যাইনি। আর নজর রাখবোই বা কেন? সরো, যেতে দাও আমাকে।”
তার কণ্ঠে এমন কিছু একটা ছিল যে বুঝতে পারি সে সত্যিটাই বলছে। না চাইতেও বিশ্বাস করতে হয় কথাটা।
কিন্তু লোকটা যদি ম্যাক্স না হয়, তাহলে কে?
.
২৫ অগাস্ট
বাইরে থেকে একটা শব্দ কানে এসেছে কেবলই। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি কেউ একজন ছায়ায় নাড়াচাড়া করছে।
লোকটা এসেছে। বাইরে সুযোগের অপেক্ষা করছে এখন।
গ্যাব্রিয়েলকে ফোন দিয়েছিলাম, কিন্তু ও ধরেনি। পুলিশকে ফোন দিব? কি করবো বুঝতে পারছি না। হাত এত কাঁপছে যে লিখতেও
নিচতলা থেকে এখন ক্রমাগত শব্দ শুনতে পাচ্ছি। জানালা খোলার চেষ্টা করেছে কিছুক্ষণ। এখন দরজা ধাক্কাচ্ছে। ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে
