মাথা ঝাঁকিয়ে না করে দিলাম। “কোন ওষুধ খাবো না আমি।”
“বেশ। যদি ওষুধ না-ই খান, তাহলে কিন্তু এর পরিণাম নিয়ে ভাবতে হবে আপনাকে।”
“কি পরিণাম? আপনি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”
“আমার সাথে এর কোন লেনদেন নেই। আমি আপনার স্বামীর ব্যাপারে কথা বলছি। গতবার আপনার ওরকম পরিস্থিতি দেখে গ্যাব্রিয়েলের কেমন লেগেছিল?”
কল্পনায় গ্যাব্রিয়েলকে নিচতলার লিভিংরুমে দেখতে পেলাম। কুকুরটা তার পাশে বসেই ঘেউঘেউ করে চলেছে। “জানিনা আমি, ওকেই জিজ্ঞেস করছেন না কেন?”
“আপনি কি এটাই চান, আবারো সেই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাক সে? আপনার কি মনে হয় না তার সহ্যের একটা সীমা আছে?”
“কী বলছেন এসব? গ্যাব্রিয়েল আমাকে ছেড়ে চলে যাবে? আপনার এটাই ধারণা?”
কথাটা ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে আমার। ওকে হারাতে হবে, এটা চিন্তাই করতে পারি না। গ্যাব্রিয়েলকে নিজের কাছে রাখার জন্যে যে কোন কিছু করতে রাজি আমি। তাই রাজি হয়ে যাই ডঃ ওয়েস্টের কথায়। বলি যে যদি যে অশরীরি কেউ আমার মাথার ভেতরে কথা বলার চেষ্টা করে, তাহলে তাকে অবশ্যই জানাবো। ওষুধগুলোও খাবো নিয়মিত।
সন্তুষ্টি ফোটে ডঃ ওয়েস্টের চেহারায়। বলেন যে নিচতলায় গিয়ে গ্যাব্রিয়েলের সাথে দেখা করতে পারি আমরা। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মনে হচ্ছিল তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেই। দিলেই ভালো হতো।
বাসায় ফেরার পথে খুব খুশি দেখায় গ্যাব্রিয়েলকে। বারবার হাসিমুখে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। “তোমার মতো সাহসী মেয়ে খুব কমই দেখেছি আমি। সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখো।”
মাথা নাড়লেও ওর কথার জবাবে কিছু বলিনি ইচ্ছে করেই। কারণ ডঃ ওয়েস্টের কাছে যাওয়াটা সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু নয়।
একাই সবকিছু সামলাতে হবে আমাকে।
আসলে কাউকে বলাটাই ভুল হয়েছিল। কালকে বার্বিকে মেসেজ করে বলবো ব্যাপারটা ভুলে যেতে। জানি যে আমার মেসেজ পেয়ে বিরক্ত হবেন তিনি। তার নাটক শুরুতেই থামিয়ে দিচ্ছি আমি। কিন্তু কিছুদিন পরেই ভুলে যাবেন। আমিও ভাব ধরবো যে সব ঠিকঠাক চলছে। কেউ এক মুহূর্তের জন্যেও কিছু বুঝতে পারবে না।
একটা ফার্মেসি থেকে আমার ওষুধগুলো কিনে ফেলে গ্যাব্রিয়েল। বাসায় ফিরেই সরাসরি রান্নাঘরে গিয়ে গ্লাসে পানি ঢেলে আনে। হলুদ ওষুধগুলো আমার হাতে দিয়ে বলে, “খেয়ে ফেলো।”
“আমি বাচ্চা নই। এভাবে হাতে তুলে দেয়ার কিছু নেই।”
“আমি জানি তুমি বাচ্চা নও, কিন্তু এগুলো যে আসলেও খাচ্ছো, সেটা নিশ্চিত করতে চাইছিলাম।”
“খাবো আমি।”
“এখনই খাও।”
গ্যাব্রিয়েলের সামনে ওষুধগুলো মুখে দিয়ে অল্প একটু পানি খাই।
“গুড গার্ল।” আমার গালে চুমু খেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় ও।
সাথে সাথে ওষুধগুলো মুখ থেকে বের করে সিঙ্কে ফেলে দেই। আমি আর কোন ওষুধ খাবো না। গতবার ডঃ ওয়েস্টের দেয়া ওষুধগুলো খেয়ে প্রায় পাগলই হয়ে গিয়েছিলাম। এবারে সেই ঝুঁকি নিব না।
নিজের ওপরে নিয়ন্ত্রন রাখতে হবে আমাকে।
সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে।
.
অগাস্ট ১৭
ডায়েরিটা এখন লুকিয়ে রাখি আমি। গেস্টরুমে একটা পাটাতন আলগা করা যায়। সেখানেই রেখে দেই, সহজে আর কারো চোখে পড়বে না তাহলে। কেন? আসলে এখানে খোলাখুলি অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা করেছি। বলা যায় না, গ্যাব্রিয়েল যদি ডায়েরিটা দেখে তাহলে পড়া শুরু করে দিতেও পারে। তখন জেনে যাবে আমি ওষুধ না খেয়ে ফেলে দেই। খুব কষ্ট পাবে বেচারা, এরকমটা হতে দিতে পারি না আমি।
ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে এই ডায়েরিটায় মনের কথা লিখতে পেরেছি, নতুবা মাথা আসলেও বিগড়ে যেত। কেউ নেই আমার সাথে কথা বলার মতো।
কাকে ভরসা করবো?
.
২১ অগাস্ট
গত তিন দিনে একবারের জন্যেও বাইরে যাইনি। গ্যাব্রিয়েল বাসায় ফিরলে ভাব ধরি যে বিকেলে হাঁটতে বের হয়েছি। কিন্তু সেটা মিথ্যে।
আসলে বাইরে যাবার কথা মনে হলেই ভয় লাগে। যে কোন কিছু ঘটে যেতে পারে। অন্তত বাসার ভেতরে আমি নিরাপদ। জানালার পাশে বসে। চুপচাপ বাইরে নজর রাখতে পারবো। রাস্তা দিয়ে যারা হেঁটে যায় তাদের সবাইকেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খেয়াল করি। অবশ্য আমার দৃষ্টি বারবার একজনকেই খুঁজে ফেরে।
আচ্ছা, সে যদি সানগ্লাস আর ক্যাপ খুলে আসে তাহলে চিনবো কি করে? তার চেহারা কেমন এটা তো জানি না। তখন সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেও বুঝতে পারবো না।
এটা একটা চিন্তার বিষয়।
.
২২ অগাস্ট
এখন পর্যন্ত দেখিনি তাকে। কিন্তু ধৈৰ্য্যহারা হওয়া চলবে না। আজ হোক আর কাল, ফিরে সে আসবেই। সেজন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে আমাকে। উপযুক্ত পদক্ষেপও নিতে হবে।
আজ সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরই গ্যাব্রিয়েলের বন্দুকটার কথা মনে হয়। গেস্ট রুম থেকে সরিয়ে হাতের কাছে কোথাও এনে রাখবো ওটা। জানালার পাশের কেবিনেটে রাখলেই সবচেয়ে সুবিধে হবে।
আমি জানি কথাগুলো কেমন শোনাচ্ছে। আশা করি পরিস্থিতি এতটাও খারাপ হবে না। লোকটা না এলেই ভালো।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবসময় মনে হয় সে আসবেই।
সে কোথায় এখন? আসছে না কেন? আমাকে অপ্রস্তুত অবস্থায় চমকে দিতে চায়? কিন্তু আমি সবসময় তৈরিই থাকবো। জানালার পাশ থেকে সতর্ক নজর রাখবো বাইরে। অপেক্ষা করবো তার আগমনের
.
২৩ অগাস্ট
এখন তো আমার মনে হচ্ছে গ্যাব্রিয়েল আর ডঃ ওয়েস্টের কথাই ঠিক। পুরোটাই কি কল্পনা ছিল?
