আমাকে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। পালাতে হবে যে করেই হোক।
ঈশ্বর! তার হাঁটার শব্দ এখন একদম স্পষ্ট
ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
বাসার ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
তৃতীয় পর্ব
স্বাভাবিকতার সাথে অস্বাভাবিকতার মিশ্রনের স্বভাব মানুষের সহজাত; আর সেজন্যেই ডায়েরি লেখার অভ্যাসটা বিপদজনক মনে হয় আমার কাছে। একজনের পক্ষে সবকিছুই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বর্ণনা করাটা খুব সহজ সেখানে।
–জাঁ পল সাত্রে
সচরাচর আমার মধ্যে সতোর দেখা পাবেন না, কিন্তু মাঝেমধ্যে নিজের অজান্তেই সত্যটা বলে ফেলি।
–উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, দ্য উইন্টার’স টেইল
অ্যালিসিয়ার বেরেনসনের ডায়েরি
৮ অগাস্ট
খুব অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটেছে আজকে।
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কফি বানাচ্ছিলাম। পানি গরম হবার ফাঁকে জানালা দিয়ে বাইরে দেখছি, এসময় একটা জিনিসের ওপর নজর আটকে যায়। না, জিনিস না, মানুষ। একটা লোক মূর্তির মত দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের বাসার উল্টোদিকের রাস্তায়, পার্কের প্রবেশমুখে। গাছের আড়ালে থাকায় তার চেহারা ঠিকমতো দেখতে পারিনি, কিন্তু বেশ লম্বা-চওড়া। মাথায় ক্যাপ আর চোখে সানগ্লাসও ছিল।
লোকটা আমাকে দেখতে পাচ্ছিল কি না সেটা বলতে পারবো না, কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল, সে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। একটু অদ্ভুত লাগে ব্যাপারটা, সাধারণত ওখানটায় দাঁড়িয়ে বাসের জন্যে অপেক্ষা করে সবাই, কিন্তু লোকটা বাসের জন্যে দাঁড়ায়নি। আমাদের বাসার ওপরে লক্ষ্য রাখছিল সে।
কিছুক্ষণ পর টের পাই, এক জায়গাতেই বেশ অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি, তাই জানালার পাশ থেকে সরে কফি নিয়ে স্টুডিওতে চলে যাই। কিন্তু সেখানে কাজে মন বসে না। বারবার লোকটার কথা ভাবছিলাম। তাই ঠিক করি বিশ মিনিট পর রান্নাঘরে গিয়ে দেখবো সে তখনও দাঁড়িয়ে আছে কি না। যদি থাকতো তাহলে কি করতাম? ভুল তো কিছু করছিল না। এই এলাকায় চোরের উৎপাত নেই সত্যি, কিন্তু সবকিছুরই তো একটা প্রথমবার আছে। যদি চুরির জন্যে রেকি করতে আসে, তখন? আবার এমনটাও হতে পারে, এই রাস্তার শেষ মাথায় নতুন বাড়িটা কিনবে, সেজন্যে দেখতে এসেছিল।
কিন্তু রান্নাঘরে ফিরে গিয়ে তাকে আর দেখিনি। কেউ ছিল না রাস্তার অন্য পাশে।
আর জানা হবে না কি উদ্দেশ্যে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সে। অদ্ভুত।
.
১০ অগাস্ট
গতকাল জিন-ফিলিক্সের সাথে নাটক দেখতে গিয়েছিলাম। গ্যাব্রিয়েল অবশ্য মানা করেছিল, কিন্তু আমি শুনিনি। সত্যি বলতে আমার নিজেরও যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু পরে ভাবি, জিন-ফিলিক্সের কথা অনুযায়ী ‘শেষবার যদি একসাথে ঘুরতে বের হই, তাহলে খুব একটা ক্ষতি হবে না। এরপরে নিশ্চয়ই আর কিছু বলার থাকবে না তার?
নাটক শুরু হবার বেশ আগেই দেখা করি আমরা, একসাথে কোথাও ড্রিঙ্ক করা যাবে তাহলে-জিন-ফিলিক্সের বুদ্ধি। সূর্য ততক্ষণে ডুবতে বসেছে, মনে হচ্ছিল কেউ লাল আবীর মিশিয়ে দিয়েছে নদীর পানিতে। ন্যাশনাল থিয়েটারের বাইরে দাঁড়িয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল সে। আমিই আগে দেখি তাকে, মানুষের ভিড়ে মুখ বাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দৃশ্যটা দেখে ওর সাথে সম্পর্ক শেষ করে দেয়ার ব্যাপারে তখনও যেটুকু সন্দেহ ছিল আমার ভেতরে, তা-ও দুর হয়ে যায়। এখন বুঝতে পারি, জিন-ফিলিক্সকে কেমন যেন ভয় পাই আমি, পুরোপুরি বলে বোঝানো যাবে না ব্যাপারটা। ঘুরে পালানোর কথা চিন্তভাবনা করছি, এসময় আমাকে দেখে ফেলে জিন ফিলিক্স। অগত্যা তার দিকে হাঁটতে শুরু করি। মুখে জোর করে একটা হাসি ফোঁটাই, সে-ও তাই করে।
“তুমি আসাতে আমি সত্যিই অনেক খুশি হয়েছে,” বলে জিন-ফিলিক্স। “ভাবছিলাম শেষ মুহূর্তে হয়তো মত পাল্টে ফেলতে পারো। চলো কোথাও বসে ড্রিঙ্ক করা যাক, নাকি?”
ন্যাশনাল থিয়েটারের পাশেই আন্ডারস্টাডি পাবে চলে যাই আমরা। ওখানে কাটানো সময়টুকু অস্বস্তিকর ছিল বললেও কম হয়ে যাবে। হাবিজাবি নিয়ে আলাপ করি দু’জনে, আসলে জিন-ফিলিক্স বলছিল আর আমি শুনছিলাম। খালি পেটে পাবে যাওয়ায় দুই পেগ ড্রিঙ্কেই মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করে আমার; এজন্যেই বোধহয় আমাকে পাবে নিয়ে গিয়েছিল জিন-ফিলিক্স। ভেবেছিল মদ খেয়ে মাতাল হলে তার সাথে আরো প্রাণবন্তভাবে আলাপ করবো। তার প্রতিটা কথা শুরু হচ্ছিল-তোমার কি মনে আছে যখন আমরা বা একসাথে ওখানে গিয়ে আমরা’-এই কথাগুলো দিয়ে। যেন এভাবে অতীতের ঘনিষ্ঠতার কথা বললেই আমি আমার ভুলটা বুঝতে পারবো। কিন্তু ও একটা ব্যাপার বুঝতে পারছিল না, সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি আমি। সেটা আর বদলাবে না।
তবে দিনশেষে মনে হয়েছে বের হওয়ার সিদ্ধান্তটা নিয়ে ভালোই করেছিলাম। জিন-ফিলিক্সের সাথে দেখা হয়েছে এজন্যে বলছি না কথাটা, আসলে নাটকটা খুবই পছন্দ হয়েছে আমার। অ্যালসেস্টিসের কথা আগে শুনিনি আমি। এই প্রথম কোন ট্র্যাজেডিতে দেখলাম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের টানাপোড়েন মোটামুটি বাস্তবভাবে দেখানো হয়েছে (পাতাললোক থেকে অ্যালসেস্টিসের ফিরে আসার ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেরে ফেললে)। সেজন্যেই আরো বেশি ভালো লেগেছে। নাটকটা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়েছে। একটা লোক মৃত্যুদণ্ড পেলে তার স্ত্রী, অ্যালসেস্টিস, তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। অ্যালসেস্টিসের নামভূমিকায় যে অভিনেত্রী অভিনয় করেছে, তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন গ্রিক পুরাণ থেকে উঠে আসা কোন দেবী। বারবার মনে হচ্ছিল, তার একটা ছবি আঁকবো আমি। জিন-ফিলিক্সকে কথাটা প্রায় বলেও ফেলেছিলাম, কিন্তু শেষ মুহূর্তে থামাই নিজেকে। তাকে আর আমার জীবনের কোন ব্যাপারে জড়াবো না। নাটকের শেষ দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। ঠিক কোন বিষয়টা আমাকে নাড়া দিয়েছে তা নিয়ে আরো ভাবতে হবে। জিন-ফিলিক্স অবশ্য একটার পর একটা মন্তব্য করেই যাচ্ছিল, কিন্তু কোনটাই আমার মতের সাথে মিলছিল না। তাই এক পর্যায়ে তার কথা শোনা বাদ দিয়ে দেই।
