“আমি চাই তুমি কারো সাথে এ ব্যাপারে কথা বলো।”
“কার সাথে কথা বলবো? পুলিশ?”
“না,” আবারো রাগ ভর করে গ্যাব্রিয়েলের কণ্ঠে। “পুলিশ না।”
আমি আসলে বুঝেছিলাম যে ও কি বলতে চাচ্ছে। কিন্তু সেটা ওর মুখ থেকেই শুনতে চাচ্ছিলাম। “তাহলে কার সাথে?”
“ডাক্তার।”
“আমি কোন ডাক্তার দেখাবো না, গ্যাব্রিয়েল-”
“আমার জন্যে কাজটা করো, জান। আমি তো তোমাকে বোঝার চেষ্টা করছি, তুমিও একটু-”
“না, তুমি বোঝার চেষ্টা করছো না!”
এতটা অসহায় দেখাচ্ছিল ওকে। বারবার মনে হচ্ছিল ওকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেই। “সব ঠিক হয়ে যাবে, জান,” শেষমেষ নিজেকে সামলাতে না পেরে বলেই ফেলি। ওকে এভাবে দেখা সম্ভব না আমার পক্ষে। “দেখো, সব ঠিক হয়ে যাবে।
অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো গ্যাব্রিয়েল। “ডঃ ওয়েস্টের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করবো। সম্ভব হলে আজকেই,” বলে চোখে দ্বিধা নিয়ে আমার দিকে তাকালো ও। “ঠিক আছে?”
ইচ্ছে করছিল গ্যাব্রিয়েলের সামনে বাড়িয়ে দেয়া হাতটা চাপড় দিয়ে সরিয়ে দেই; ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি, চেঁচিয়ে বলি, “তোমার ধারণা আমি পাগল হয়ে গেছি! আমি পাগল না! আমি পাগল না!”
কিন্তু সেরকম কিছু করিনি। বরং মাথা নেড়ে গ্যাব্রিয়েলের হাতটা ধরি।
“ঠিক আছে, ডার্লিং,” বলি আমি। “তুমি যা চাও সেটাই হবে।”
.
১৬ অগাস্ট
অনিচ্ছাসত্ত্বেও ডঃ ওয়েস্টের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম আজকে।
তার সবকিছুই অপছন্দ আমার। ছোট বাড়িটা থেকে শুরু করে সবসময় লিভিং রুমে ঘুরঘুর করা কুকুরটাকেও বিরক্ত লাগে। এক মুহূর্তের জন্যেও ঘেউঘেউ থামায়না হতচ্ছাড়া। ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে কুকুরটাকে চুপ করতে বলি। ভেবেছিলাম ডঃ ওয়েস্ট নিজেই বোধহয় কিছু একটা করবেন, কিন্তু তিনি এমন একটা ভাব ধরেন যেন শুনতেই পাচ্ছেন না। হয়তো আসলেও শুনতে পাচ্ছিলেন না। অন্তত আমার বলা কথাগুলো তার কানে যাচ্ছিল না, এটা নিশ্চিত। তাকে সব খুলে বলি আমি, কিন্তু জবাবে মুখে একটা হাসি ঝুলিয়ে বসে থাকেন। তার দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছিল একটা রঙিন গিরগিটির দিকে তাকিয়ে আছেন। উনি গ্যাব্রিয়েলের বন্ধু, কিন্তু এরকম একটা লোকের সাথে কিভাবে ওর বন্ধুত্ব হলো কে জানে। গ্যাব্রিয়েল যেখানে সবসময় কোমল আচরণ করে, সেখানে ডঃ ওয়েস্টের হাবভাব একদম শীতল। একজন ডাক্তারের ব্যাপারে এ ধরণের কথা বলা উচিৎ হচ্ছে না, জানি। কিন্তু তার মধ্যে দয়ামায়ার কোন বালাই নেই।
লোকটার ব্যাপারে আমার সব কিছু বলা শেষ হলে লম্বা একটা সময় কিছু বললেন না তিনি। তার এই অভ্যাসটাও আমাকে বিরক্ত করে। কথা বলার আগে অনেকক্ষণ ধরে ভাবেন, যেন ইচ্ছে করে অপেক্ষা করাচ্ছে আমাকে। শব্দ বলতে কেবল নিচতলা থেকে কুকুরটার ঘেউঘেউ কানে আসছে। আওয়াজটা শুনতে শুনতে এক ধরণের ঘোরের মধ্যে চলে যাই। ডঃ ওয়েস্ট যখন আচমকা কথা বলে ওঠেন, তখন আসলেও চমকে যাই।
“আমাদের মধ্যে আগেও এ বিষয়ে কথা হয়েছে, তাই না অ্যালিসিয়া?”
শূন্যদৃষ্টিতে তার দিকে তাকাই আমি। ধরতে পারছি না কি বলতে চাচ্ছেন। “হয়েছে কি?”
“হ্যাঁ, হয়েছে,” মাথা নাড়েন ডঃ ওয়েস্ট।
“আপনি বোধহয় ভাবছেন যে পুরোটাই আমার কল্পনা। কিন্তু বিশ্বাস করুন, বানিয়ে বলছি না।”
“গতবারও এটাই বলেছিলেন। মনে আছে কি হয়েছিল?”
জবাব দেইনি। আসলে তাকে সেই সন্তুষ্টিটুকু দিতে চাচ্ছিলাম না। চোখ পাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকি, ছোট বাচ্চাদের মতন।
ডঃ ওয়েস্ট অবশ্য আমার জবাবের অপেক্ষা করলেন না। বাবার মৃত্যুর পর কি ঘটেছিল সে বিষয়ে কথা বলেই গেলেন। সবসময় একটা আতঙ্কের ভেতরে থাকতাম তখন, মনে হতো কেউ আমাকে দেখছে সর্বক্ষণ, নজর রাখছে। “আমরা আগেও এ বিষয়ে কথা বলেছি, বুঝলেন তো?”
“কিন্তু এবারে পরিস্থিতি ভিন্ন। গতবার শুধু ওরকমটা মনেই হয়েছিল আমার, কাউকে দেখিনি। এবারে আসলেও একজনকে দেখেছি।”
“কাকে দেখেছেন?”
“ইতোমধ্যে বলেছি আপনাকে। একটা লোককে।”
“তার বর্ণনা দিন তো?”
“সেটা পারবো না,” দ্বিধান্বিত স্বরে বলি।
“কেন পারবেন না?”
“আসলে তাকে ঠিকমতো দেখতে পারিনি কোনবারই। বলেছিল তো আপনাকে-দূর থেকে লক্ষ্য রাখে সে।”
“আচ্ছা।”
“তাছাড়া ইচ্ছে করেই একটা কাপ আর সানগ্লাস পরে আসে, যাতে চেহারাটা দেখতে না পাই।”
“অনেকেই কিন্তু এই আবহাওয়ায় সানগ্লাস চোখে দিয়ে বাইরে বের হয়। মাথায় ক্যাপও পড়ে। তারা সবাই কি কারো ওপর নজর রাখে?”
মেজাজ গরম হতে শুরু করে আমার। “আমি জানি আপনি কি চাইছেন।”
“কি?”
“আপনি আমার মুখ থেকেই শুনতে চাচ্ছেন যে ভুলভাল দেখছি আমি। বাবা মারা যাবার পর মাথা বিগড়ে যেতে শুরু করেছিল, সেরমটাই হচ্ছে আবারো-এটাই তো বলাতে চাচ্ছেন আমাকে দিয়ে, নাকি?”
“আপনার কি ধারণা? সেরকম কিছু কি হচ্ছে আপনার সাথে?”
“না। তখন মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলাম আমি। কিন্তু এবারে একদম ঠিক আছি। কোন সমস্যা নেই। একটা লোক আমাদের বাসার ওপর নজর রাখছে প্রতিনিয়ত, এটা নিশ্চয়ই আপনার কাছে সমস্যা মনে হচ্ছে না!।”
মাথা নাড়লেন ডঃ ওয়েস্ট কিন্তু তৎক্ষণাৎ কিছু বললেন না। নোটবুকে কী যেন টুকে নিলেন।
“আপনাকে আবারো কিছু ওষুধ খেতে হবে। সাবধানতাবশতই কাজটা করছি আমি। এবারে পরিস্থিতি আগের মত খারাপ হতে দেয়া চলবে না, বুঝেছেন?”
