আমার জবাবের অপেক্ষা না করেই ভেতরে ঢুকে পড়লো সে। ঘর অন্ধকার দেখে জানালার পর্দাগুলো সরিয়ে দিল বিনা অনুমতিতে। তাকে থামাতে যাবো এসময় বাইরে তাকিয়ে দেখি লোকটা চলে গেছে।
আমি আসলে ঠিক জানি না যে কেন বার্বিকে তার ব্যাপারে বলেছি। মহিলাকে একদমই পছন্দ কই না আমি, ভরসা করা তো দুরের কথা। আসলে ওই সময়টা বাসায় যে-ই থাকতো, তাকেই বলতাম কথাগুলো। ওয়াইন পেটে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই কাঁদতে শুরু করি। বিস্ফোরিত নয়নে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকে বার্বি। আমার সব বলা শেষ হলে হাত থেকে ওয়াইনের গ্লাসটা নামিয়ে রাখে টেবিলে। “আরো কড়া কিছু দরকার।” কেবিনেট থেকে হুইস্কি বের করে দুটো মগে ঢেলে একটা আমার দিকে এগিয়ে দেয়।
“এই নাও, এটা এখন দরকার তোমার।”
আসলেও দরকার ছিল। মাথাটা একটু শান্ত হয় অবশেষে। এবারে আমার শোনার পালা। একটানা কথা বলতে থাকে বার্বি। বারবার বলছিল যে আমাকে ভয় দেখানোর কোন উদ্দেশ্য নেই তার, কিন্তু তার কথাগুলো ভয়ংকরই শোনাচ্ছিল। “এরকমটা টিভিতে হাজারবার দেখেছি আমি। কিছু করার আগে রেকি করে নিচ্ছে হারামিটা।”
“আপনার কি মনে হয়? লোকটা চোর?”
কাঁধ নাচায় বার্বি। “ধর্ষকও হতে পারে। তাতে কিছু আসে যায়? ভালো উদ্দেশ্যে যে আসেনি, এটা নিশিচত।”
হেসে ফেলি তখন। আসলে এটা ভেবে স্বস্তি পাচ্ছিলাম যে কেউ একজন আমার কথা বিশ্বাস করেছে-হোক সেটা বার্বি। তাকে আমার ফোনে ভোলা ছবিটা দেখাই।
“আমাকে মেসেজ করে দাও। বাসায় গিয়ে চশমা পরে ভালো করে দেখবো। এখানে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে না। তোমার জামাইকে বলেছে এ ব্যাপারে?”
“না,” মিথ্যে বলি।
একটু অবাক হয় বার্বি। “কেন?”
“আসলে…আমি ভয় পাচ্ছি যে গ্যাব্রিয়েল হয়তো আমাকে ভুল বুঝবে। ভাববে পুরোটাই আমার কল্পনা।”
“তোমার কি মনে হয়, আসলেও কল্পনা করছো?”
“না।”
সন্তুষ্টি ফুটলো বার্বির চেহারায়। “গ্যাব্রিয়েল যদি তোমার কথা আমলে না নেয় তাহলে আমি যাবো তোমার সাথে পুলিশের কাছে। এমনভাবে কথা বলবো যে বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে ওরা।”
“ধন্যবাদ। কিন্তু সেটার আপাতত কোন প্রয়োজন নেই।”
“কে বলল প্রয়োজন নেই? এগুলো হেলাফেলার বিষয় নয়। আজকে গ্যাব্রিয়েল ফিরলে অবশ্য কথা বলবে তার সাথে, ডার্লিং। আমাকে কথা দাও।”
আমি মাথা নাড়ি। কিন্তু ততক্ষণে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম যে গ্যাব্রিয়েলকে এ বিষয়ে আর একটা কথাও বলবো না। লোকটা যে আসলেও আমাকে অনুসরণ করছে বা আমার ওপরে নজর রাখছে এর শক্ত কোন প্রমাণ নেই। বার্বি ঠিকই বলেছে, ছবিটা একদমই স্পষ্ট না।
পুরোটাই আমার কল্পনা-গ্যাব্রিয়েলের যখন এটাই ধারণা, তাকে কিছু না বলাই ভালো। উল্টো আরো বিরক্ত হবে তখন। সেটা চাই না আমি।
মাথা থেকে ঝেরে ফেলবো ব্যাপারটা।
.
রাত ৪টা।
আজকের রাতটা ভালো যাচ্ছে না।
দশটার দিকে বাড়ি ফিরে গ্যাব্রিয়েল। সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে তাই। আমিও ঘুমোনোর চেষ্টা করি, কিন্তু ঘুম আসেনা। চোখে।
দুই ঘন্টা আগে হঠাই খুট করে একটা শব্দ শুনতে পাই। বাইরের বাগান থেকে আসছিল শব্দটা। দ্রুত জানালার পাশে গিয়ে বাইরে তাকাই-কাউকে দেখি না। কিন্তু মনে হতে থাকে যে কেউ একজন খেয়াল করছে আমাকে। গাছের আড়ালে লুকিয়ে আছে।
দৌড়ে বেডরুমে ফিরে এসে গ্যাব্রিয়েলকে ডেকে তুলি।
“লোকটা বাইরে,” বলি আমি, “বাগানের ওখানে শব্দ শুনেছি।”
গ্যাব্রিয়েল প্রথমে ঘুমের ঘোরে বুঝতে পারেনা যে কি বলছি আমি। যখন বোঝে তখন বিরক্তি ফোটে চোখেমুখে। “এত রাতে কি শুরু করেছে। আর তিন ঘন্টা পর বের হতে হবে আমাকে। এসব চোর-পুলিশ খেলতে পারবো না।”
“চোর পুলিশ খেলা না, আমার কথা বিশ্বাস করো, প্লিজ। একবার এসে দেখো।”
অগত্যা আমার সাথে আসে ও।
কিন্তু বাইরে কেউই ছিল না তখন, ঠিক যেমনটা ভয় পাচ্ছিলাম।
গ্যাব্রিয়েলকে বলি একবার বাইরে গিয়ে দেখতে, কিন্তু মানা করে দেয়। হনহন করে ওপর তলায় উঠে যায় বিরক্তভঙ্গিতে। আমি ওর রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করি কিন্তু লাভ হয় না। গেস্টরুমে গিয়ে শুয়ে পড়ে।
আমি আর বিছানায় যাইনি। তখন থেকে এখানেই বসে আছি। কান পেতে রেখেছি শব্দের অপেক্ষায়, কিছুক্ষণ পরপর জানালা দিয়ে তাকাচ্ছি বাইরে। কিন্তু লোকটার কোন হদিস নেই এখন অবধি।
আলো ফুটতে আর মাত্র কয়েক ঘন্টা।
.
১৫ অগাস্ট
ফটোশ্যুটের জন্যে তৈরি হয়ে নিচে নেমে আসে গ্যাব্রিয়েল। আমাকে জানালার পাশে বসে থাকতে দেখে যখন বুঝতে পারে যে সারারাত ওখানেই ছিলাম, চেহারার অভিব্যক্তি পাল্টে যায়।
“চুপ করে বসো অ্যালিসিয়া। কথা আছে তোমার সাথে।”
“হ্যাঁ, কথা তো আছেই। আমার কথা একবিন্দুও বিশ্বাস করোনি তুমি।”
“কিন্তু তুমি যে আসলেও বিশ্বাস করছো ব্যাপারটা সেটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই আমার।”
“এরকম হেঁয়ালি করে কথা বলছো কেন? আমি বিশ্বাস করছি মানে? আমি কি পাগল যে অবাস্তব কিছু বিশ্বাস করবো? যা দেখেছি সেটাই বলেছি তোমাকে।”
“তোমাকে কিন্তু একবারের জন্যেও পাগল বলিনি আমি।”
“তাহলে কি বলছো এসব?”
আমি ভেবেছিলাম দু’জনের বোধহয় তখনই ঝগড়া লেগে যাবে, কিন্তু গ্যাব্রিয়েলের কথাগুলো শুনে একদম থমকে যাই। ফিসফিস করে বলে:
