বিষয়টা নিয়ে ভাবতে ভাবতে একসময় গ্যাব্রিয়েলকে ফোন করে বসি। খুব বড় একটা ভুল ছিল সেটা। জানতাম যে ও ব্যস্ত থাকবে, এসময় যদি আমি হুট করে ফোন দিয়ে বলি কেউ আমাদের বাসার ওপরে নজর রাখছে, তাহলে রাগ হবারই কথা।
তাছাড়া লোকটা যে আসলেও আমাদের বাসার ওপরে নজর রাখছে, সে বিষয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিতও নই।
আবার এমনটাও হতে পারে যে তার লক্ষ্য আসলে আমি।
.
অগাস্ট ১৩
আবার এসেছিল সে।
গ্যাব্রিয়েল সকালে বের হয়ে যাবার পরেই তাকে বাথরুমের জানালা থেকে দেখি আমি। গোসল করছিলাম তখন। আজকে আগের দিনগুলোর তুলনায় কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল লোকটা, বাসস্ট্যান্ডের পাশে।
কি ভাবছিল? এভাবে বোকা বানাবে আমাকে?
দ্রুত কাপড় পরে রান্নাঘরে চলে যাই ভালো করে দেখার জন্যে। কিন্তু ততক্ষণে উধাও হয়ে যায় সে।
ঠিক করি গ্যাব্রিয়েল বাসায় ফেরার পর বলবো কথাটা। ভেবেছিলাম আবারো হয়তো ব্যাপারটা উড়িয়ে দিবে ও, কিন্তু আজকে মনোযোগ দিয়ে শোনে সবকিছু। চেহারায় দুশ্চিন্তা ভর করে।
“জিন-ফিলিক্স না তো?” কোন রাখঢাক ছাড়াই বলে গ্যাব্রিয়েল।
“না! ওর কথা ভাবছো কেন?”
চেষ্টা করছিলাম কণ্ঠে বিস্ময় ফুটিয়ে তুলতে, কিন্তু আমি নিজেও আসলে বিষয়টা নিয়ে ভেবেছি। জিন-ফিলিক্স আর অচেনা লোকটার শারীরিক গঠন একরকম। হতেও পারে যে গ্যাব্রিয়েল ঠিক সন্দেহই করছে। কিন্তু আমার মন সেটা মানতে চাইছিল না। আমাকে তো এভাবে ভয় দেখানোর কথা নয় তার। তাই না?
“জিন-ফিলিক্সের নম্বর কোথায়?” গ্যাব্রিয়েল বলে। “আমি এখনই ফোন করবো ওকে।”
“না, ডার্লিং, প্লিজ। এরকম কিছু কোরো না। আমি নিশ্চিত লোকটা জিন-ফিলিক্স না।”
“আসলেই?”
“হ্যাঁ। তাছাড়া ওরকম কিছু তো হয়নি। আমি বোধহয় একটু বাড়াবাড়িই করছি। থাক, বাদ দাও।”
“কতক্ষণ ছিল লোকটা এখানে?”
“খুব বেশিক্ষণ না। এই ধরো এক ঘন্টা, এর পরেই উধাও হয়ে যায়।”
“উধাও হয়ে যায় মানে?”
“মানে গায়েব হয়ে যায়।”
“ওহ। আচ্ছা জান, রাগ কোরো না। একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
“কি?” ওর প্রশ্নের ধরণটা ভালো লাগলো না আমার।
“পুরো ব্যাপারটা তোমার কল্পনা নয় তো?”
“না,” দৃঢ় কণ্ঠে বলি। “বিশ্বাস করো আমার কথা।”
“বিশ্বাস তো করছিই।”
কিন্তু ওর কথা শুনে বুঝতে পারি যে আমাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করছিল না তখন। বিশ্বাস করার ভান করছিল। সত্যি বলতে, প্রচণ্ড রাগ লাগে তখন। এত রাগ যে…আজকে এখানেই লেখা থামাতে হবে। নতুবা এমন কিছু লিখে ফেলবো যেটা নিয়ে পরে পস্তাতে হতে পারে।
.
১৪ অগাস্ট
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই জানালার কাছে চলে যাই। মনে মনে আশা করছিলাম লোকটাকে হয়তো দেখতে পাবো, তাহলে গ্যাব্রিয়েলকেও ডেকে দেখানো যাবে। কিন্তু তার কোন চিহ্নই ছিল না বাইরে। নিজেকে আরো বেশি আহাম্মক মনে হয় তখন।
বিকেলে সিদ্ধান্ত নেই গরমের মধ্যেও হাঁটতে বের হবো। আসলে বাড়ি থেকে কিছুক্ষণের জন্যে পালাতে চাইছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে পার্লামেন্ট হিলের কাছে চলে যাই, চারপাশে অনেকেই রোদ পোহাচ্ছিল। একটা খালি বেঞ্চ দেখতে পেয়ে বসে পড়ি। লন্ডনের অনেকটা দেখা যায় ওখান থেকে।
কিন্তু গোটা সময় মনে হচ্ছিল যে কেউ আমার ওপরে নজর রাখছে। বারবার পিছু ফিরে তাকালেও সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়েনি। কিন্তু কেউ একজন ছিল সেখানে, বুঝতে পারছিলাম সেটা।
বাসায় ফেরার পথে পুকুর পাড় দিয়ে হাঁটছি এসময় হঠাই মুখ তুলে তাকাই। সাথে সাথে থমকে যাই সেখানেই। পুকুরের অন্যপাশ থেকে আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল লোকটা। চেহারা ভালো করে বোঝা যাচ্ছিল না অবশ্য, কিন্তু আমার চিনতে ভুল হয় না।
ভয়ের একটা শীতল স্রোত বয়ে যায় শিরদাঁড়া বেয়ে। পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। আপনা থেকেই চেঁচিয়ে উঠি:
“জিন-ফিলিক্স? আমাকে অনুসরণ করছো কেন? বন্ধ করো এসব!”
কিন্তু লোকটা দাঁড়িয়েই থাকে। যত দ্রুত সম্ভব পকেট থেকে ফোন বের করে তার একটা ছবি তুলি। এতে লাভ কি হয়েছে, জানি না। এরপর উল্টোদিকে ঘুরে হাঁটতে শুরু করি, একবারও পেছনে তাকাইনি। ভয় হচ্ছিল যে পেছনে ফিরলেই দেখতে পাবো কাছাকাছি চলে এসেছে।
তা সত্তেও নিজেকে আটকাতে পারিনি। ঘরে তাকাই। কিন্তু আবারো উধাও হয়ে গিয়েছিল সে।
মনেপ্রাণে চাইছিলাম যাতে জিন-ফিলিক্স না হয় লোকটা।
বাসায় ফেরার পর খুব অস্থির লাগছিল। সব পর্দা টেনে বাতি নিভিয়ে দেই। কি মনে করে জানালা দিয়ে বাইরে একবার উঁকি দিতেই থমকে যাই। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা, রাস্তার অন্যপাশে। দৃষ্টি আমার দিকে। কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
এসময় কেউ আমার নাম ধরে ডাক দেয়ায় চমকে উঠি।
“অ্যালিসিয়া? আছো?”
পাশের বাসার বিরক্তিকর মহিলাটা আবার এসেছিল। বার্বি হেলমান। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে পেছনের দরজাটা খুলে দেই। ইতোমধ্যে বাগানে ঢুকে পড়েছিল সে, হাতে ওয়াইনের বোতল।
“কেমন আছো ডার্লিং? স্টুডিওতে দেখলাম না তাই ভাবলাম কি করছে।”
“একটু বাইরে গিয়েছিলাম। কেবলই ফিরেছি।”
“ওয়াইন?” বাচ্চাদের মত করে বলল সে, এরকমটা প্রায়ই করে মহিলা। বিরক্ত লাগে আমার।
“আসলে, কাজ করতে হবে আমাকে এখন।”
“আরে কাজ তো আমারো আছে। একটু পরেই ইটালিয়ান ক্লাসে যাবো। এর আগে একটু গল্পগুজব করি দু’জনে।”
