তবে দিনশেষে মনে হয়েছে বের হওয়ার সিদ্ধান্তটা নিয়ে ভালোই করেছিলাম। জিন-ফিলিক্সের সাথে দেখা হয়েছে এজন্যে বলছি না কথাটা, আসলে নাটকটা খুবই পছন্দ হয়েছে আমার। অ্যালসেস্টিসের কথা আগে শুনিনি আমি। এই প্রথম কোন ট্র্যাজেডিতে দেখলাম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের টানাপোড়েন মোটামুটি বাস্তবভাবে দেখানো হয়েছে (পাতাললোক থেকে অ্যালসেস্টিসের ফিরে আসার ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেরে ফেললে)। সেজন্যেই আরো বেশি ভালো লেগেছে। নাটকটা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়েছে। একটা লোক মৃত্যুদণ্ড পেলে তার স্ত্রী, অ্যালসেস্টিস, তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। অ্যালসেস্টিসের নামভূমিকায় যে অভিনেত্রী অভিনয় করেছে, তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন গ্রিক পুরাণ থেকে উঠে আসা কোন দেবী। বারবার মনে হচ্ছিল, তার একটা ছবি আঁকবো আমি। জিন-ফিলিক্সকে কথাটা প্রায় বলেও ফেলেছিলাম, কিন্তু শেষ মুহূর্তে থামাই নিজেকে। তাকে আর আমার জীবনের কোন ব্যাপারে জড়াবো না। নাটকের শেষ দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। ঠিক কোন বিষয়টা আমাকে নাড়া দিয়েছে তা নিয়ে আরো ভাবতে হবে। জিন-ফিলিক্স অবশ্য একটার পর একটা মন্তব্য করেই যাচ্ছিল, কিন্তু কোনটাই আমার মতের সাথে মিলছিল না। তাই এক পর্যায়ে তার কথা শোনা বাদ দিয়ে দেই।
অ্যালসেস্টিসের মৃত্যুর জগত থেকে ফিরে আসার দৃশ্যটা মাথা থেকে দূর করতেই পারছিলাম না। ব্রিজ থেকে স্টেশনের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময়েও সেটা নিয়েই ভাবছিলাম। এসময় জিন-ফিলিক্স জিজ্ঞেস করে যে আবারো ড্রিঙ্ক করতে যাবে কি না, কিন্তু আমি ক্লান্তির অজুহাত দেখাই। একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে আসে আমাদের মাঝে। স্টেশনে পৌঁছে গেলে বাইরে দাঁড়িয়ে ওকে ধন্যবাদ জানাই, বলি যে সময়টা ভালো কেটেছে।
“একটা ড্রিঙ্কই তো,” জিন-ফিলিক্স বলে। “পুরনো সময়ের খাতিরে?”
“না, বাসায় ফিরতে হবে আমাকে।”
ঘুরে দাঁড়িয়েছি, এসময় আমার হাত ধরে জিন-ফিলিক্স।
“অ্যালিসিয়া,” বলে সে। “তোমাকে একটা কথা বলতে চাই আমি।”
“না, বলো না, প্লিজ। কিছু বলার নেই আর…”
“তুমি যা ভাবছো সেরকম কিছু বলবো না।”
ঠিকই বলেছিল জিন-ফিলিক্স, আমি মনে মনে যা ভেবেছিলাম ওরকম কোন কথা বের হয়নি তার মুখ দিয়ে। ধরেই নিয়েছিলাম যে বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে গ্যালারি ছেড়ে দেয়ার কারণে আমার মধ্যে অপরাধবোধ সৃষ্টির চেষ্টা করবে। কিন্তু তার কথাগুলো শুনে চমকে যাই।
“তোমাকে আরো সাবধানী হতে হবে,” বলে জিন-ফিলিক্স। “মানুষকে খুব সহজে ভরসা করে ফেলল। যারা তোমার আশেপাশে থাকে…তাদের বিশ্বাস করো। এই স্বভাবটা বদলাও। কাউকে ভরসা করার আগে তাকে ভালোমতো চেনার চেষ্টা কোরো।”
শূন্য দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি কিছুক্ষণ। বেশ খানিকটা সময় লাগে গলা দিয়ে শব্দ বের হতে।
“কি বলছো এসব? কার কথা বোঝাচ্ছো?”
কিন্তু আর কিছু বলে না জিন-ফিলিক্স। হতাশ ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকিয়ে আমার হাত ছেড়ে উল্টোদিকে ঘুরে হাঁটতে শুরু করে। পেছন থেকে ডাক দেই আমি।
“দাঁড়াও, জিন-ফিলিক্স।”
কিন্তু একবারের জন্যেও তাকায় না সে। কিছুক্ষণ পর মিশে যায় ভিড়ের মাঝে। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি স্টেশনের বাইরে। মাথায় বারবার ওর বলা কথাগুলোই ঘুরপাক খাচ্ছিল। এ রকম হেঁয়ালি করার মানে কি? এটাও হতে পারে যে আমাকে ইচ্ছে করে এরকম অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে চলে গেছে সে। খুব ভালো করেই জানে যে আমার মাথায় সন্দেহ ঢুকলে সেটা দূর না হওয়া পর্যন্ত শান্তি পাইনা। এ যাত্রায় তাকে সফলই বলতে হবে।
সেই সাথে প্রচণ্ড রাগও লাগছিল। অবশ্য এই কাজটা করে একদিক ভালোই করেছে সে। সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হয়ে গেছে। জিন-ফিলিক্সের আর কোন স্থান নেই আমার জীবনে। আশপাশের মানুষদের সহজেই ভরসা করে বলতে নিশ্চয়ই গ্যাব্রিয়েলের কথাই বুঝিয়েছে। কিন্তু কেন?
না, এ নিয়ে মাথা ঘামাবো না আমি। এটাই চাইছিল জিন-ফিলিক্স; আমাকে অস্থিরতার মধ্যে ফেলতে। গ্যাব্রিয়েল আর আমার মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করাটাই তার লক্ষ্য।
কিন্তু তার ফাঁদে পা দেব না আমি। এ বিষয়ে আর ভাববো না।
বাসায় ফিরে দেখি গ্যাব্রিয়েল ঘুমিয়ে পড়েছে। সকাল পাঁচটায় উঠে একটা ফটোশ্যুটে যেতে হবে। তবুও ওকে ডেকে তুলে সেক্স করি। আসলে আমি চাইছিলাম ওকে একদম আমার ভেতরে অনুভব করতে, ওর দেহে মিশে যেতে। ও-ই পারবে আমাকে সবকিছু থেকে নিরাপদ রাখতে।
.
অগাস্ট ১১
আবারো লোকটাকে দেখেছি আমি। এবারে আগের তুলনায় কিছুটা দূরে ছিল সে, পার্কের ভেতর দিককার একটা বেঞ্চে। কিন্তু তাকে চিনতে কোন সমস্যা হয়নি আমার। এরকম আবহাওয়ায় খুব কম লোকই কালো শার্ট প্যান্ট আর ক্যাপ পরে বের হওয়ার কথা ভাববে। আগের দিনের মত চোখে সানগ্লাসও ছিল। আমাদের বাসার ওপর নজর রাখছে।
এসময় একটা ভাবনা খেলে যায় আমার মাথায়। এমনটাও হতে পারে, সে কোন চোর-ছ্যাচড় নয়, বরং আমার মতনই একজন পেইন্টার। হয়তো আমাদের রাস্তাটা আঁকার কথা ভাবছে, সেজন্যেই দেখতে এসেছে। কিন্তু ভাবনাটা যে সত্যি নয় সেটা আমি একরকম নিশ্চিত। যদি আসলেও বাড়িটা আঁকতে চাইতো সে, তাহলে এভাবে বসে থাকতো না। স্কেচবুকে খসড়া স্কেচ আঁকতো।
