“হত্যাকাণ্ডের দিন অ্যালিসিয়ার সাথে দেখা হয়েছিল আপনার?”
“হ্যাঁ, ঘটনার ঠিক কয়েক ঘন্টা আগেই,” বলে ওয়াইনে লম্বা একটা চুমুক দিল বার্বি। “মাঝেমাঝেই ওর ওখানে গিয়ে আড্ডা দিতাম। দুজনে কফি খেতে খেতে আলাপ করতাম এটাসেটা নিয়ে। তবে আমার সাথে ওয়াইনও থাকতো। আসলে, খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলাম আমরা।”
ভাঙা রেকর্ডের মত কিছুক্ষণ পরপর এই কথাটা বলেই চলেছে সে। ইতোমধ্যে বার্বির স্বভাব-চরিত্র বিশ্লেষণ করে বুঝে গেছি, চরম মাত্রার আত্মকেন্দ্রিক একজন মানুষ সে; অন্যদের বোঝার কোন চেষ্টা করে না। আমি এক প্রকার নিশ্চিত, তাদের কথোপকথনে অ্যালিসিয়া খুব বেশি কিছু বলতো না।
“ঐদিন বিকেলে অ্যালিসিয়ার মানসিক অবস্থা কেমন দেখেছিলেন?”
কাঁধ ঝাঁকায় বার্বি। “স্বাভাবিক। শুধু বলেছিল যে প্রচণ্ড মাথা ধরেছে।”
“তাকে কোন কারণে ক্ষিপ্ত মনে হয়নি?”
“কেন, ক্ষিপ্ত মনে হওয়ার কথা ছিল নাকি?”
“আসলে, পরিস্থিতি বিবেচনা করলে…” বিস্মিত চোখে আমার দিকে তাকালো বার্বি। “আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন না যে ও-ই খুনটা করেছে?” বলেই উচ্চস্বরে হেসে উঠলো সে। “আমি তো আপনাকে অন্যরকম ভেবেছিলাম।”
“দুঃখিত আমি আসলে-”
“অ্যালিসিয়ার পক্ষে কাউকে খুন করাটা সম্ভব না। ও ওরকম মেয়ে-ই না। বিশ্বাস করুন আমার কথা। ও নির্দোষ। আমি শতভাগ নিশ্চিত।”
“এতটা নিশ্চিত হচ্ছেন কি করে? সব প্রমাণ তো-”
“রাখেন আপনার প্রমাণ। এরকমটা বলার উপযুক্ত কারণ আছে আমার কাছে।”
“কী রকম?”
“তবে…আপনাকে ভরসা করা যায় কি না বুঝতে পারছি না।” যেন আমাকে যাচাই করছে এমন ভঙ্গিতে তাকায় সে।
আমি যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম।
“আসলে…একটা লোক ছিল ওখানে,” হুট করেই বলে বসে বার্বি।
“একটা লোক?”
“হ্যাঁ, নজর রাখতে অ্যালিসিয়ার ওপর।”
এক মুহূর্তের জন্যে থমকে গেলেও নিজেকে দ্রুত সামলে নিলাম। “নজর রাখতে বলতে কী বোঝাচ্ছেন?”
“কী বোঝাবো আবার? নজর রাখতো। পুলিশকে বলেছিলাম বিষয়টা, কিন্তু তারা পাত্তাই দেয়নি। গ্যাব্রিয়েলের লাশের পাশে অ্যালিসিয়াকে দেখেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় যে খুনটা ও-ই করেছে। যত্তসব আহাম্মকের দল। অন্য ব্যাখ্যা যে থাকতে পারে, এটা মাথায়ই আসেনি তাদের।”
“অন্য আবার কি ব্যাখ্যা?”
“আপনাকে বলবো আমি। তখন বুঝতে পারবেন, আজ এখানে কেন আসতে বলেছিলাম।”
এত ভণিতা করার কি আছে, মনে মনে বললাম। মুখে অবশ্য হাসি ফুটিয়ে রেখেছি।
গ্লাসে আবারো ওয়াইন ঢেলে নিল বার্বি। “ঘটনার শুরু হত্যাকাণ্ডের দুই। সপ্তাহ আগে থেকে। অ্যালিসিয়ার ওখানে গিয়েছিলাম আড্ডা দিতে। অন্যান্য দিনের চাইতে সেদিন একটু বেশিই চুপচাপ মনে হয় ওকে। তাই জিজ্ঞেস করি যে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না। তখন কাঁদতে শুরু করে, একদম হাউমাউ করে কান্না। আগে কখনো ওকে কাঁদতে দেখিনি। সবসময়ই আবেগগুলো সামলে চলতো অ্যালিসিয়া…কিন্তু সেদিন আর পারেনি বেচারা। মানসিকভাবে প্রচণ্ড বিপর্যস্ত মনে হচ্ছিল।”
“কিছু বলেছিল?”
“আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, এলাকায় অপরিচিত কোন লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি কি না। ও নাকি খেয়াল করেছে কেউ একজন বাইরে থেকে নজর রাখে ওর ওপরে।” ইতস্ততা খেয়াল করলাম বার্বির হাবভাবে। “আচ্ছা, আপনাকে দেখাই। আমাকে ছবিসহ একটা মেসেজও পাঠিয়েছিল।”
সদ্য ম্যানিকিউর করা হাত দিয়ে মোবাইল ফোনটা তুলে নিয়ে ছবিটা খুঁজতে থাকে বার্বি। কিছুক্ষণ সময় লাগে খুঁজে পেতে। ফোনটা আমার সামনে মেলে ধরে এরপর।
কিছু না বলে তাকিয়ে থাকি। কি দেখছি এটা বুঝতে খানিকটা সময় লেগে যায়। একটা গাছের ছবি, অস্পষ্ট।
“এটা কি?”
“দেখে কি মনে হচ্ছে?”
“একটা গাছ?”
“গাছের পেছনে।”
গাছের পেছনে ধূসর রঙের কিছু একটা আছে। কিন্তু সেটা ল্যাম্পপোস্টও হতে পারে আবার একটা কুকুরও হতে পারে।
“একটা লোক। একটু খেয়াল করে দেখলেই বুঝবেন।”
আমার কাছে মনে হলো না গাছের পেছনে কেউ আছে, কিন্তু তর্ক করাটা অমূলক। এই মুহূর্তে বার্বির মনোযোগ অন্যদিকে ফেরানো যাবে না। “আর?”
“আর কিছু না, এটুকুই।”
“কিন্তু পরে কি হয়েছিল?”
কাঁধ ঝাঁকায় বার্বি। “কিছু না। আমি অ্যালিসিয়াকে বলি পুলিশকে জানাতে, কিন্তু তখন জানতে পারি যে ও ব্যাপারটা ওর স্বামীকেও বলেনি।”
“গ্যাব্রিয়েলকে বলেনি? কেন?”
“জানি না। আমার ধারণা গ্যাব্রিয়েল হয়তো ব্যাপারটা গুরুত্ব দিত না, এজন্যে বলেনি। যাইহোক, আমি ওকে বারবার বলছিলাম পুলিশকে জানাতে। কারণ এর সাথে তো আমার নিরাপত্তাও জড়িয়ে আছে, তাই না? বাইরে অচেনা একটা লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে, যদি উল্টোপাল্টা কিছু করে বসে? রাতের বেলা ঘুমোতে গিয়েও শান্তি পাবো না।”
“অ্যালিসিয়া আপনার পরামর্শ শুনেছিল?”
মাথা ঝাঁকায় বার্বি। “না, শোনেনি। কয়েকদিন পর বলে, গ্যাব্রিয়েলের সাথে আলাপ করেছে বিষয়টা নিয়ে। গোটাটাই নাকি তার কল্পনা ছিল, আমাকেও ভুলে যেতে বলে। আর এটাও বলে দেয় যে গ্যাব্রিয়েলের সামনে যেন কখনো প্রসঙ্গটা না তুলি। ছবি ডিলিট করে দিতে বলেছিল, কিন্তু আমি করিনি। পুলিশকে দেখিয়েছি, কিন্তু আগ্রহী মনে হয়নি তাদের। তারা আসলে অ্যালিসিয়াকেই দোষারোপ করে আসছে শুরু থেকে। আমার ধারণা তাদের বড়সড় ভুল হচ্ছে কোথাও। নিঃসন্দেহে অন্য কেউ জড়িত এসবের সাথে। আরেকটা ব্যাপার, নাটুকে ভঙ্গিতে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল বার্বি। “অ্যালিসিয়া আসলে ভয় পাচ্ছিল।”
