এক চুমুকে গ্লাসের বাকি ওয়াইনটুকু সাবাড় করে দিল বার্বি। আবারো হাত বাড়ালো বোতলের দিকে। “আপনি কিছুই নেবেন না তাহলে?”
মানা করে দিলাম আবারো। ধন্যবাদ জানিয়ে কাজের অজুহাতে বেরিয়ে গেলাম ওখান থেকে। আর সময় নষ্ট করার কোন মানে নেই, যা জানার ছিল ততক্ষণে জেনে গিয়েছি। সেগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে।
বাইরে বেরিয়ে দেখি অন্ধকার হয়ে গেছে। পাশের বাড়িটার সামনে দাঁড়াই ক্ষণিকের জন্যে-অ্যালিসিয়ার পুরনো ঠিকানা। বিচারের পরপরই বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল বাড়িটা, এক জাপানিজ দম্পতি কিনে নিয়েছে। বার্বির মতে তাদের মধ্যে নাকি সামাজিকতা বলে কিছু নেই। আসলে কয়েকবার মেলামেশার চেষ্টা করেও সফল হয়নি সে। বার্বির মত প্রতিবেশী থাকলে আমি কি করতাম? অ্যালিসিয়াই বা মনে মনে কি ভাবতো তাকে নিয়ে?
একটা সিগারেট ধরিয়ে সদ্য শোনা কথাগুলো নিয়ে ভাবতে লাগলাম। অ্যালিসিয়া তাহলে বার্বিকে জানিয়েছিল যে কেউ তার প্রতি লক্ষ্য রাখছে। পুলিশের লোকেরা ভেবেছে এসব বার্বির মনগড়া কথা, সেজন্যেই পাত্তা দেয়নি। তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, বার্বির কথা বিশ্বাস করা আসলেও কঠিন।
তার মানে অ্যালিসিয়া এতটা ভয় পেয়েছিল যে বার্বিকে কথাটা বলতে একপ্রকার বাধ্য হয়, পরবর্তীতে গ্যাব্রিয়েলকেও জানায়। এরপর কি হয়? আর কাউকে কি অ্যালিসিয়া এ ব্যাপারে কিছু বলে? এটা জানতেই হবে আমাকে।
হঠাই ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল আমার। সবসময় আতঙ্কের মধ্যে থাকা, সব কথা নিজের মধ্যে চেপে রাখা। এমন কেউ ছিল না যাকে আমি ভরসা করে কিছু বলতে পারতাম। বাবার ভয়টা তাই সার্বক্ষণিক একটা ফাসের মত চেপে থাকতো গলার কাছটায়। অ্যালিসিয়ার অবস্থাও নিশ্চয়ই সেরকমই হয়েছিল, নতুবা বার্বিকে কিছু বলতো না সে।
কেঁপে উঠলাম, মনে হচ্ছে কেউ যেন নজর রাখছে আমার ওপরে।
ঘুরে দাঁড়ালাম, কিন্তু কাউকেই চোখে পড়লো না। আমি ছাড়া আর কেউ নেই এখানে। ছায়ায় টাকা রাস্তাটা একদম খালি, জনমানবশূন্য। চারপাশে নিচ্ছিদ্র নীরবতা।
২.৩১ পৌঁছে যাই গ্রোভে
২.৩১
পরদিন সকাল সকাল পৌঁছে যাই গ্রোভে। ঠিক করেছি বার্বির বলা কথাগুলো নিয়ে আলাপ করবো অ্যালিসিয়ার সাথে (মানে আমিই যা বলার বলবো, সে শুনবে)। কিন্তু রিসিপশনে ঢোকা মাত্র একটা বিকট চিৎকার শুনতে পেলাম। গলা ছেড়ে আর্তনাদ করছে কেউ। পুরো করিডোরে ভেসে বেড়াচ্ছে সেই আর্তনাদ।
“কি হয়েছে?”
আমার প্রশ্ন আমলে না নিয়ে দ্রুত ওয়ার্ডের দিকে ছুটে গেল নিরাপত্তা কর্মী। আমিও গেলাম তার পিছু পিছু। যতই সামনে এগোচ্ছি, চিৎকারের মাত্রা বাড়ছে। আশা করি অ্যালিসিয়া ঠিক আছে, এসবের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু কেন যেন মনে কু ডাকছে।
ডান দিকের করিডোরে পা রাখলাম। নার্স স্টেশনের বাইরে ভিড় জমিয়েছে সবাই। ডায়োমেডেস ফোনে প্যারামেডিকদের সাথে কথা বলছেন। তার শার্ট ভিজে গেছে রক্তে, তবে রক্তগুলো তার নয়। দুজন নার্স হাঁটু গেড়ে বসে আছে মেঝেতে চিৎকাররত মহিলার পাশে। কিন্তু অ্যালিসিয়া নয় সেটা।
এলিফ।
প্রচণ্ড যন্ত্রনায় ডাঙায় ভোলা মাছের মত তড়পাচ্ছে এলিফ, চোখ দিয়ে রক্ত ঝরছে তার। কিছু একটা গেঁথে আছে ডান চোখে। প্রথম দেখায় কাঠি মনে হলেও ভালো করে তাকাতে বুঝে গেলাম জিনিসটা কি। একটা তুলি।
অ্যালিসিয়া দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালের পাশে। ইউরি এবং আরেকজন নার্স শক্ত করে ধরে রেখেছে তাকে। তবে ধরে না রাখলেও কোন অসুবিধে ছিল না। একদম শান্ত সে। তার ভাবলেশহীন চেহারা অ্যালসেস্টিস ছবিটার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। এই মুহূর্তে তার দৃষ্টি আমার দিকে।
অস্বীকার করবো না, প্রথমবারের মত কিছুটা ভয় পেলাম।
.
২.৩২
“এলিফ কেমন আছে?” ইউরিকে ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড থেকে ফিরতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম। নার্স স্টেশনে বসে আছি এখন।
“কিছুটা ভালো,” দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল সে। “পরিস্থিতি খারাপের দিকে গড়াবে না আশা করি।”
“ওর সাথে দেখা করতে চাই আমি।”
“এলিফ, নাকি অ্যালিসিয়া?”
“আগে এলিফের সাথে।”
মাথা নাড়লো ইউরি। আজকের রাতটা ওকে বিশ্রাম নিতে হবে। কালকে সকালে তোমাকে নিয়ে যাবো ওর কাছে।”
“কি হয়েছিল? তুমি ছিলে ঘটনার সময়? নিশ্চয়ই অ্যালিসিয়াকে উস্কে দিয়েছিল?”
আবার লম্বা শ্বাস ছেড়ে কাঁধ ঝাঁকালো ইউরি। “আমি আসলে জানি না। অ্যালিসিয়ার স্টুডিওর বাইরে ঘুরঘুর করছিল এলিফ। কিছু একটা তো বলেছেই। কি নিয়ে ঝগড়া বেঁধে যায়, কে জানে।”
“তোমার কাছে চাবি আছে না? চলো ঘরটা দেখে আসি। কোন সূত্র পাওয়া যেতে পারে।”
নার্স স্টেশন থেকে বেরিয়ে অ্যালিসিয়ার স্টুডিওতে চলে আসলাম আমরা। ইউরি দরজা খুলে ভেতরে আলো জ্বালো।
কাংখিত জবাবটা পেতে খুব একটা সময় লাগে না আমাদের। ইজেলের দিকে তাকাতেই বুঝে যাই কি ঘটেছিল।
অ্যালিসিয়ার নতুন পেইন্টিংটা নষ্ট করে দিয়েছে কেউ। লাল রঙ দিয়ে মোটা হরফে ‘মাগি লেখা সেখানে।
মাথা নাড়লাম। “তাহলে এই ব্যাপার।”
“তোমার কি মনে হয়, এলিফ করেছে কাজটা?”
“আর কে করবে?”
***
এলিফের সাথে ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা করলাম। স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। এক চোখের ওপরে পুরু ব্যান্ডেজ। দেখে বোঝাই যাচ্ছে, প্রচণ্ড উত্তেজিত, সাথে ব্যথা তো আছেই।
