মাথা নেড়ে সায় জানালো সে। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে যেন জানতে যে আমি আসবো। “অ্যালিসিয়ার ব্যাপারে কথা বলবেন? যাক, এতদিনে কারো হুশ হলো তাহলে। এমনকি পুলিশের লোকগুলোও আমার কথায় পাত্তা দেয়নি, এমন ভাব করছিল যেন আমি পাগল। কেউ বিশ্বাসই করেনি যে আমি অ্যালিসিয়ার ভালো একজন বন্ধু। ওর সব কথা জানি। এমন সব বিষয়ে আমার সাথে আলাপ করতে সে, আপনি শুনলে তাজ্জব বনে যাবেন।”আমার দিকে তাকিয়ে উদ্দেশ্যপূর্ণ একটা হাসি দিল বার্বি। বুঝতে পেরেছে, আমি আগ্রহী অ্যালিসিয়ার ব্যাপারে শুনতে।
“কী রকম বিষয়ে আলাপ করতো?”
“আসলে এখানে দাঁড়িয়ে তো কিছু বলা সম্ভব না, পরনের পশমী কোটটা ঠিকঠাক করে বলল বার্বি। “আমার একটা কাজও আছে এখন। আজ সন্ধ্যায় নাহয় বাসায় এসে পড়ুন, এই ছয়টার দিকে?”
বার্বির সাথে তার বাসায় গিয়ে কোন বিষয়ে আলাপ করার ইচ্ছে একদমই নেই আমার। ডায়োমেডেন্স জানতে পারলে তুলকালাম বাধিয়ে দেবেন। কিন্তু হাতে অন্য কোন উপায়ও নেই। বার্বি কতটা জানে সেটা বের করতেই হবে আমাকে। জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললাম, “আপনার ঠিকানাটা?”
.
২.৩০
হ্যাম্পস্টেড হিথের উল্টোদিকের বাসাগুলোর একটায় থাকে বার্বি। সামনেই বিশাল একটা পুকুর। বাসা তো না, ছোটখাটো একটা দুর্গ। দামও নিশ্চয়ই সেরকম।
গ্যাব্রিয়েল আর অ্যালিসিয়া পাশের বাসাটায় ওঠার অনেক আগে থেকেই হ্যাম্পস্টেড হিথে থাকে বাৰি। তার প্রাক্তন স্বামী একজন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার, সেই সুবাদে লন্ডন এবং নিউ ইয়র্কের আসা যাওয়ার মধ্যে থাকতে হতো তাকে। পরবর্তীতে বার্বিকে ডিভোর্স দিয়ে কম বয়সি এক মেয়েকে বিয়ে করে সে। ফলে লন্ডনের বাড়িটা পুরোপুরিভাবে বার্বির নামে লিখে দিতে হয়। দুই পক্ষেরই লাভ হয়েছে, হাসিমুখে বলল বার্বি। “বিশেষ করে আমার।”
গোটা এলাকায় একমাত্র বার্বির বাড়িটাই ফ্যাকাসে নীল রঙের, অন্যগুলোয় সাদার আধিপত্য বেশি। বাড়ির সামনের বাগানটা বেশ সাজানো গোছানো।
দরজায় দাঁড়িয়ে আমাকে স্বাগত জানালো বার্বি। “হ্যালো, সময় মতনই এসে পড়েছেন দেখছি। এটা খুবই ভালো অভ্যাস। ভেতরে আসুন।”
পথ দেখিয়ে আমাকে লিভিংরুমে নিয়ে আসলো সে, অনর্গল কথা বলেই চলেছে। আমি কেবল সময়মতো হা-হুঁ করছি। বাসার ভেতরটা গ্রিনহাউজের মত গরম। চারদিকে নানা জাতের, নানা বর্ণের অসংখ্য ফুলগাছ। গোলাপ, লিলি, রংবেরঙের অর্কিড। পেইন্টিং, আয়না আর বেশ কয়েকটা বাঁধানো ছবির ফ্রেম টাঙিয়ে রাখা হয়েছে দেয়ালে দেয়ালে। সেই সাথে ছোটখাট মূর্তি, দামি ফুলদানি, শোপিসও আছে। প্রত্যেকটা জিনিসই দামি, কিন্তু একসাথে ঠেসে রাখাতে খুব একটা ভালো দেখাচ্ছে না। এসব থেকে বার্বির মানসিক অবস্থার আবছা একটা ধারণা পাওয়া যায়। ভেতরে ভেতরে কোন কিছু খুব অস্থিরতা অনুভব করে সে। তার শৈশব কেমন কাটতে পারে সেটা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলাম। এভাবে জিনিস জড়ো করা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনাকাটা করা-ব্যক্তির লোভের দিকেই ইঙ্গিত করে।
বড় একটা সোফা থেকে কুশন সরিয়ে জায়গা করে বসতে হলো আমাকে। একটু বেশিই বড় সোফাটা। ড্রিংকস ক্যাবিনেট খুলে দুটো গ্লাস বের করলো বার্বি।
“কি নিবেন বলুন। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে হুইস্কি পছন্দ। আমার আগের স্বামী তো দিনে এক গ্যালন হুইস্কি সাবাড় করে ফেলতো। বলতো যে আমাকে সহ্য করতে হলে নাকি ওই পরিমাণই খেতে হবে।” হাসি ফুটলো তার মুখে। “আমার অবশ্য ওয়াইন না হলে চলে না।”
বার্বি শ্বাস নেয়ার জন্যে থামলে অবশেষে কথা বলার সুযোগ পেলাম আমি। “আমার হুইস্কি ভালো লাগে না। আসলে সচরাচর ড্রিঙ্কও করি না অতটা…বিয়ার হলেই চলবে।”
“ওহ,” একটু বিচলিত মনে হলো বার্বিকে। “আমার কাছে তো বিয়ার নেই।”
“থাক। ড্রিঙ্ক লাগবে না আমার।”
“কিন্তু আমার লাগবে। আজকে খুব ধকল গেছে।”
একটা গ্লাসে বেশ খানিকটা রেড ওয়াইন ঢেলে নিয়ে আমার উল্টোদিকের আরামকেদারায় পা তুলে বসলো বার্বি, যেন লম্বা গল্পের প্রস্তুতি নিচ্ছে। “এবারে আমি একান্তই আপনার।” আবারো ইঙ্গিতপূর্ণ হাসিটা ফুটল তার মুখে। “বলুন, কী জানতে চান?”
“আপনি কিছু মনে না করলে কয়েকটা প্রশ্ন করতাম।”
“নিশ্চয়ই।”
“অ্যালিসিয়া কি কখনো কোন ডাক্তারের সাথে দেখা করার ব্যাপারে কিছু বলেছিল আপনাকে?”
“ডাক্তার?” প্রশ্নটা শুনে কিছুটা অবাকই হলো বার্বি। “মানে সাইকিয়াট্রিস্টের কথা বলছেন?”
“সাইকিয়াট্রিস্ট বা কোন সাধারণ ডাক্তার।”
“আসলে, ঠিক মনে-” দ্বিধা ফুটলো তার চেহারায়। “দাঁড়ান, আপনি বলাতে মনে পড়লো, আসলেও একজন ডাক্তার দেখিয়েছিল ও…”
“তার নামটা মনে আছে আপনার?”
“না। কিন্তু এটা মনে আছে যে ওকে আমার নিজের ডাক্তারের কথা বলেছিলাম। ডঃ মঙ্কস। চমৎকার একজন ডাক্তার ভুদ্রলোক, আপনার দিকে তাকিয়েই গড়গড় করে সমস্যার কথা বলে দিবে। কি খেতে হবে সেটাও ঠিক করে দেন। এরপর লম্বা একটা সময় ধরে সে বর্ণনা করলো যে প্রতিদিন কি কি খাবার খায় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী। বারবার এটাও বলল যে আমিও যেন উঃ মঙ্কসকে দেখাই। খুব বেশিক্ষণ ধৈর্য্য ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। বেশ কায়দা করে তাকে মূল বিষয়ে ফিরিয়ে আনলাম।
