রিসিপশন ডেস্কের কাছে দাঁড়িয়ে এভাবে তারস্বরে অভিযোগ করেই চলেছে এক মহিলা। কথা শুনে মনে হচ্ছে আমেরিকান। স্টেফানি অবশ্য তাকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছে। বারবি হেলমানকে চিনতে আমার কোন অসুবিধে হলো না, গ্যাব্রিয়েল খুন হবার পর পেপার-টিভিতে অহরহ দেখা যেত তাকে। ঘটনার রাতে সে-ই প্রথম ফোন করে পুলিশকে।
বার্বির বয়স পঁয়ষট্টির আশেপাশে, চুল সোনালী। দূর থেকেও তার শ্যানেল নম্বর ফাইভ পারফিউমের গন্ধ নাকে আসছে, প্লাস্টিক সার্জারির কারণে ঠোঁটগুলো এখন আর চেনার মত অবস্থায় নেই। বার্বি নামটা তার জন্যে আসলেও মানানসই-চেহারাসুরুত পুতুলটার মতনই (ওজন একটু বেশি আর কি)। আচরণে বোঝাই যাচ্ছে সবসময় ইচ্ছেমতন সবকিছু পেয়ে অভ্যস্ত। আর এজন্যেই তাকে যখন জানানো হয়েছে যে এখন থেকে রোগিদের সাথে দেখা করার জন্যে আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে আসতে হবে, মাথায় রক্ত চড়ে গেছে।
“ম্যানেজারকে ডাকুন এখনই, এমন ভঙ্গিতে হাত নেড়ে কথাটা বলল যেন কোন রেস্তোরাঁর ম্যানেজারকে ডেকে পাঠাচ্ছে। এসবের মানে কি? কোথায় সে?”
“আমিই এখানকার ম্যানেজার, মিসেস হেলমান,” স্টেফানি বলল। “আমাদের আগেও দেখা হয়েছে।”
এই প্রথম স্টেফানির প্রতি এক ধরণের সহানুভূতি অনুভব করছি আমি; বার্বির সাথে এভাবে কথা বলতে কারোই ভালো লাগার কথা নয়। স্বাভাবিকের চাইতে বড় দ্রুত কথা বলে বার্বি, মাঝে একবারের জন্যে বিরতিও দেয় না। ফলে তার কথার জবাবে কিছু বলা মুশকিল।
“অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়ার ব্যাপারে আগে তো কিছু বলেননি আপনি,” বার্বি হেসে বলল। “এর চাইতে তো ক্যাফে ট্যামারিন্ডে টেবিল বুকিং দেয়া সহজ।”
“আমি কি কোনভাবে সাহায্য করতে পারি?” সামনে এগিয়ে স্টেফানির উদ্দেশ্যে একবার হেসে বললাম।
“না, ধন্যবাদ। আমিই সামলাতে পারবো,” কিছুটা বিরক্ত মনে হলো ইউনিট ম্যানেজারকে।
চোখে আগ্রহ নিয়ে আমাকে আপাদমস্তক দেখলো বার্বি। “আপনি কে?”
“আমি থিও ফেবার। অ্যালিসিয়ার থেরাপিস্ট।”
“তাই নাকি?” বার্বি বলল। “দারুণ তো।” কথা শুনে মনে হচ্ছে ম্যানেজারদের চাইতে থেরাপিস্টদের সাথে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে সে। স্টেফানির প্রতি আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে অ্যালিসিয়ার প্রাক্তন প্রতিবেশী। এমন আচরণ করছে যেন সে একজন সাধারণ রিসিপশনিস্ট বৈ কিছু নয়।
“আপনি নিশ্চয়ই নতুন? আগে তো দেখিনি।”প্রশ্ন করলেও আমাকে জবাব দেয়ার কোন সুযোগ দিলো না বাৰ্বি, নিজ থেকেই আবারো বলে উঠলো, “সাধারণত প্রতি দুই মাস পরপর আসি আমি। তবে এবারে কিছুটা ব্যস্ত থাকায় লম্বা একটা সময় আসতে পারিনি। আমেরিকা গিয়েছিলাম পরিবারের সবার সাথে দেখা করতে। ফিরে আসা মাত্র তাই অ্যালিসিয়ার খোঁজ নিতে এসেছি। ওকে বড্ড মিস করছিলাম। অ্যালিসিয়া কিন্তু আমার খুব ভালো বন্ধু, জানেন বোধহয়।”
“না, জানতাম না।”
“আরে হ্যাঁ। ওরা যখন প্রথম বাড়িটায় ওঠে, আমিই সব বিষয়ে সাহায্য করি। খুব দ্রুত ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায় অ্যালিসিয়ার সাথে। এমন কোন বিষয় নেই যেটা নিয়ে আমার সাথে আলাপ করতো না অ্যালিসিয়া। বুঝলেন তো কি বলছি? আমাকে সব জানাতো সে। সব।”
“আচ্ছা।”
এ সময় ইউরিকে দেখতে পেয়ে তাকে ইশারায় রিসিপশনে আসতে বললাম। “মিসেস হেলমান অ্যালিসিয়ার সাথে দেখা করতে এসেছেন।”
“আমাকে বার্বি বললে ডাকবেন। ইউরি তো আমাকে ভালো করেই চেনে,” বলে হেড নার্সের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলো সে। “আমরা পুরনো বন্ধু। কিন্তু এই মহিলা-”
মাছি তাড়াবার ভঙ্গিতে স্টেফানির উদ্দেশ্যে হাত নাড়লো বার্বি। এতক্ষণে কথা বলার সুযোগ পেল ইউনিট ম্যানেজার। “মাফ করবেন, মিসেস হেলমান। কিন্তু আমাদের নিয়ম কানুনে কিছুটা কড়াকড়ি করা হয়েছে রোগিদের নিরাপত্তার স্বার্থে। এখন থেকে আগে ফোন করে”
“উফ! আবারো সেই একই প্যাচাল। কান পচে গেল আমার।”
এবারে হাল ছেড়ে দিল স্টেফানি। ইউরি বার্বিকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলে আমিও চললাম তাদের সাথে।
দর্শনার্থীদের জন্যে আলাদা রুম আছে গ্রোভে। আমাদের সেখানে রেখে দ্রুত গিয়ে অ্যালিসিয়াকে ভেতর থেকে নিয়ে এলো ইউরি। রুমে টেবিল একটাই, দুপাশে দুটো চেয়ার। ইউরি বাদেও আরো দু’জন নার্স দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে। ভেতরে ঢুকে বার্বিকে দেখে কোন ভাবান্তর হলো না অ্যালিসিয়ার। মাথা নিচু করে চেয়ারে বসে পড়লো।
তবে বার্বিকে সে তুলনায় যথেষ্ট আবেগী মনে হচ্ছে এখন। “অ্যালিসিয়া, তোমার কথা অনেক মনে পড়ছিল, জানো? আরো শুকিয়ে গেছে। আমার যদি এরকম ফিগার হতো! কেমন আছো তুমি? ঐ দজ্জাল মহিলার কারণে আরেকটু হলেই না দেখা করে চলে যেতে হতো আজকে
একা একাই এভাবে অনর্গল কথা চালিয়ে গেল বাৰি। স্যান ডিয়েগোতে গিয়ে কি করেছে, কার কার সাথে দেখা করেছে–সব বিস্তারিত বলল। গোটা সময় পাথরের মত মুখ করে বসে থাকলো অ্যালিসিয়া, যেন কোন কথাই তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে না। বিশ মিনিট পর অবশেষে কথার ট্রেন থামালো বার্বি। অ্যালিসিয়াকে রুম থেকে নিয়ে গেল ইউরি, এখনও তার মুখে ঠিক আগের মতনই অনাগ্রহ।
বার্বি গ্রোভ থেকে বেরিয়ে যাবার সময় তাকে ডাক দিলাম আমি। “আপনার সাথে কিছু কথা বলতে পারি?”
