কিন্তু লোকটা ওর পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তার দিকে ফিরেও তাকালো না ক্যাথি। দ্রুত দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল সে। তাহলে এই লোকটা না। ক্যাথি আর আমার মনে হয়তো একই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে এখন, আজকে আর আসবে না সে।
ঠিক এসময় ওর মুখে হাসি ফুটলো, কাউকে দেখেছে নিশ্চয়ই। রাস্তার অন্যপাশে কারো উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছে এখন। অবশেষে, ভাবলাম আমি, এসেছে তাহলে। ঘাড় সামনে বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করলাম লোকটাকে।
কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে বছর তিরিশের এক স্বর্ণকেশী এগিয়ে গেল গেল ওর দিকে। পরনের স্কার্টটা অতিরিক্ত খাটো, চেহারা আকর্ষণীয়ই বলা চলে। তাকে চিনতে অবশ্য কোন সমস্যা হলো না আমার। নিকোল। একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো দুই বান্ধবী। এরপর হাত ধরে হাসতে হাসতে হাঁটা দিল ওপর দিকে।
অর্থাৎ ক্যাথি সত্যটাই বলেছিল আমাকে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে, সত্যটা জেনে আশ্বস্ত হবার পরিবর্তে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলাম। না উদ্বিগ্ন না, আসলে হতাশ হয়েছি।
এরকমটা তো হবার কথা ছিল না!
.
২.২৮
“তোমার কাছে কেমন লাগছে অ্যালিসিয়া? অনেক আলো না? পছন্দ হয়েছে?”
গ্রোভের নতুন স্টুডিও রুমটা গর্বের সাথে দেখাচ্ছে ইউরি। নার্স স্টেশনের পাশের অব্যবহৃত খালি রুমটা যে স্টুডিও হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, এই বুদ্ধিটা তার মাথা থেকেই বেরিয়েছিল। আমিও আপত্তি করিনি। অন্তত রোয়েনার আর্ট থেরাপি রুমের চেয়ে অনেক ভালো জায়গাটা। ওখানে থাকলে সে নিশ্চিত কোন না কোন ছুতোয় জ্বালাতন করতে অ্যালিসিয়াকে। এখানে সে নিজের মত করে আঁকাআঁকি করতে পারবে, কেউ বিরক্ত করবে না।
ঘরের চারপাশে নজর বুলালো অ্যালিসিয়া। তার ইজেলটা জানালার পাশে বসানো হয়েছে কারণ ওখানে অল্প হলেও প্রাকৃতিক আলো পাবে। রংগুলো টেবিলের ওপর সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা। অ্যালিসিয়া সেদিকে এগোলে আমার উদ্দেশ্যে চোখ টিপলো ইউরি। গোটা ব্যাপারটায় তার উৎসাহই সবচেয়ে বেশি। সেজন্যে আমি আসলেও কৃতজ্ঞ। সে না থাকলে এতকিছুর বন্দোবস্ত করতে বেগ পেতে হতো। তাছাড়া রোগিদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় স্টাফও সে, তাই তাকে হাত করতে পারাটা যে কারো জন্যে সুবিধাজনক। “আমার পক্ষ থেকে শুভকামনা রইলো। এবারে আপনি সামলান তাহলে,” বলে হাসিমুখে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে গেল সে। তবে অ্যালিসিয়ার এসবের দিকে কোন মনোযোগ নেই।
নিজের দুনিয়ায় হারিয়ে গেছে সে। মিষ্টি একটা হাসি মুখে ফুটিয়ে একমনে রংগুলো দেখছে। কালো তুলিগুলোর গায়ে এমনভাবে হাত বুলাচ্ছে যেন প্রেমিকের দেয়া ফুল। তিনটা রঙের টিউব আলাদা করলো অ্যালিসিয়া-প্রুসিয়ান ক্ল, ইন্ডিয়ান ইয়েলো আর ক্যাডমিয়াম রেড। এরপর ইজেলে আটকানো ফাঁকা ক্যানভাসটার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো, ভাবছে কিছু একটা। দীর্ঘ একটা সময় মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকলো ওখানেই, যেন একটা ঘোর পেয়ে বসেছে। তার শরীরটা এখানে থাকলেও মন নিশ্চয়ই উড়ে বেড়াচ্ছে স্বপ্নের জগতে, যে স্বপ্নের জগতে কেবল রঙের ছড়াছড়ি। হঠাৎ করেই যেন ঘোর কেটে যায় অ্যালিসিয়ার, টেবিলের দিকে ফিরে একটা প্যালেটে কিছুটা সাদা রঙ নিয়ে তার মধ্যে সামান্য একটু লাল রঙ ঢালল। একটা তুলি দিয়ে রংগুলো মেশাতে হচ্ছে তাকে। কারণ ধারালো সব সরঞ্জাম আগেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে, প্যালেট নাইফগুলোও।
তুলিতে লাল রঙ মেখে সাদা ক্যানভাসের ঠিক মাঝখানে একটা দাগ দেয় অ্যালিসিয়া। এরপর এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে আরেকটা দাগ দিল পাশে। আরেকটা। কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ছবি আঁকায়। কোন জড়তা বা অস্বস্তির বালাই নেই তার মাঝে। একমনে একেই চলেছে। যেন এই কাজটার জন্যেই জন্ম হয়েছিল অ্যালিসিয়া বেরেনসনের। দূর থেকে দৃশ্যটা দেখতে লাগলাম আমি।
পুরোটা সময় চুপ থাকলাম, শব্দ করে শ্বাস ফেলতেও ভয় হচ্ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল এই সময়টুকু একান্তই অ্যালিসিয়ার ব্যক্তিগত, এখানে আমার কোন স্থান নেই। তবে আমার উপস্থিতি নিয়ে তার কোন আপত্তি নেই। কয়েকবার তো ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছে আমি আছি কি না।
সেই সময়গুলোয় মনে হচ্ছিল আমার অভিব্যক্তি খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করছে সে।
কারণটাও বুঝে গেলাম খুব শিঘ্রই।
***
পরবর্তী কয়েকদিনে ছবিটা ধীরে ধীরে রূপ নিতে শুরু করে, শুরুর দিকে অবশ্য বোঝা যাচ্ছিল না যে কি আঁকছে সে। কিন্তু কয়েকদিন বাদে সেই বিভ্রান্তিও দূর হয়ে গেল। নিখুঁতভাবে ক্যানভাসে ফুটে উঠছে সবকিছু।
একটা লাল ইটের দালান এঁকেছে অ্যালিসিয়া, দেখলেই গ্রোভের কথা মনে হবে যে কারো। কিন্তু ক্যানভাসের হাসপাতালটায় আগুন ধরে গিয়েছে। আর সেই আগুনের লেলিহান শিখার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে একজন পুরুষ আর একজন নারী। লাল চুল দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে নারীটি অ্যালিসিয়া। এবং তাকে কোলে করে ধরে রাখা মানুষটা আর কেউ নয়, আমি। আগুন প্রায় আমার পায়ের কাছ অবধি পৌঁছে গেছে।
তবে খুব ভালো করে দেখলে মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে অ্যালিসিয়াকে কি আসলেও উদ্ধার করছি আমি, নাকি আগুনে ফেলে দিতে উদ্যত হয়েছি?
.
২.২৯
“এটা কেমন কথা! এখানে বেশ কয়েক বছর ধরে আসা যাওয়া করছি আমি। কেউ তো কখনো বলেনি যে আসার আগে ফোন করতে হবে। এভাবে অপেক্ষা করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। অনেক কাজ ফেলে এসেছি।”
