“ওহ হ্যাঁ,” হাই তুলে বললাম।
চোখ পাকিয়ে আমার দিকে তাকালো ক্যাথি। “আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের একজন হচ্ছে নিকোল। আর তুমি তার নাম ভুলে গেলে? ওর পার্টিতেও তো গিয়েছিলে!”
“আরে বাবা, মনে আছে তো আমার। শুধু নামটাই একটু ভুলে গিয়েছিলাম। আচ্ছা যাও, আর ভুলবো না।”
“আরো গাঁজা খাও,” মাথা ঝাঁকিয়ে বলল ক্যাথি। “আমি গোসলে যাই, দেরি হয়ে যাবে নাহলে।”রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।
আপনমনেই হেসে উঠলাম।
সন্ধ্যা সাতটার সময়ই সব হেস্তনেস্ত হয়ে যাবে।
***
সাতটা বাজার পনেরো মিনিট আগে আমি ক্যাথির রিহার্সাল হলের সামনে এসে উপস্থিত হলাম। নদীর পাশ দিয়ে হাঁটতে ভালোই লাগছিল।
ইচ্ছে করেই একটু দূরে বসেছি, তবে এখান থেকে দরজাটা ঠিকই দেখা যায়। আপাতত মুখ ঘুরিয়ে রেখেছি, যাতে ক্যাথি আগে বের হলেও যাতে আমাকে দেখতে না পায়। কিছুক্ষণ পরপর অবশ্য দরজার দিকে আপনা থেকেই চোখ চলে যাচ্ছে। এখন অবধি কেউ বের হয়নি।
সাতটা পাঁচের সময় অবশেষে খুলল দরজাটা। হাসিঠাট্টার শব্দ শুনতে পেলাম। অভিনেতা অভিনেত্রীরা বের হয়ে আসছে দলবেঁধে। তিনজন, চারজনের দলগুলো কথা বলতে বলতে একসময় দূরে মিলিয়ে গেল। কিন্তু ক্যাথি ছিলনা তাদের মাঝে।
আরো পাঁচ মিনিট চলে গেল। দশ মিনিট। ধীরে ধীরে লোকজনের সংখ্যা কমতে কমতে একসময় একদম ফাঁকা হয়ে গেল জায়গাটা। নিশ্চয়ই আমি আসার আগেই বেরিয়ে গেছে সে। নাকি এখানে আসেইনি?
রিহার্সেলে আসার ব্যাপারে মিথ্যে বলেছিল সকালে?
উঠে দাঁড়িয়ে প্রবেশপথের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমাকে নিশ্চিত হতেই হবে। যদি ওর চোখে পড়ে যাই, তখন কি বলবো? কি ছুতো দিব এখানে আসার? ওকে সারপ্রাইজ দিতে এসেছি? হ্যাঁ, এরকম কিছুই বলতে হবে। দুই বান্ধবীকে ডিনারে নিয়ে যেতে চাই আমি-এটা শুনলে নিশ্চয়ই আর কিছু সন্দেহ করবে না। ক্যাথি অবশ্য এড়িয়ে যেতে চাইবে। বলবে যে নিকোল অসুস্থ অথবা নিকোল শেষ মুহূর্তে মানা করে দিয়েছে। তখন দেখা যাবে বাকিটা সন্ধ্যা অস্বস্তি নিয়ে কাটাবো দু’জন। দীর্ঘ নীরবতাই হবে আমাদের একমাত্র সঙ্গি।
দরজার কাছে পৌঁছে গেছি। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে মন থেকে সব দ্বিধা ঝেরে ফেললাম। যা হওয়ার হবে। দরজা খুলে পা রাখলাম ভেতরে।
একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ এসে লাগলো নাকে। কংক্রিটের ওপরে কোন কার্পেট বা ওয়ালপেপারের বালাই নেই। ক্যাথিদের রিহার্সাল হয় এই দালানের চার তলায়। লিফট নেই, তাই হেঁটেই উঠতে হয় প্রতিদিন। অনেকবার এ নিয়ে অভিযোগও করেছে ক্যাথি। সবে দোতলার সিঁড়িতে পা দিতে যাবো এ সময় ওপর তলা থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। ফোনে কথা বলছে ক্যাথি:
“আমি জানি বাবা…খুব বেশিক্ষণ লাগবে না আর। বাই।”
জমে গেছি আমি। আর কিছুক্ষণের মধ্যে মুখোমুখি হয়ে যাবো ওর সাথে। একদম শেষ মুহূর্তে হুঁশ ফিরে পেলাম। লাফিয়ে নিচে নেমে ডানদিকে সরে যাওয়া মাত্র আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল ক্যাথি। সোজা দরজার দিকে হাঁটা দিয়েছে। তাড়াহুড়ো না থাকলে আমাকে অবশ্যই চোখে পড়তো তার।
আমিও দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এলাম। ব্রিজের উদ্দেশ্যে প্রায় দৌড়াচ্ছে এখন ক্যাথি। নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে ওর পিছু নিলাম। তবে চারপাশে ভিড় থাকায় খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না।
ব্রিজ পার হয়ে মেট্রোরেল স্টেশনের দিকে পা চালালো ক্যাথি। হাঁটার ফাঁকে ফাঁকে ভাবছি যে কোন ট্রেনে চড়বে। কিন্তু মেট্রোরেলে উঠলো না ও। বরং সোজা হেঁটে স্টেশনের অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে এলো। চারিং ক্রস রোডের দিকে হাঁটছে এখন। পিছু নিলাম। একসময় চারিং ক্রস রোড পার হয়ে সোহোর কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম হাঁটতে হাঁটতে। এখানকার রাস্তাগুলো তুলনামূলক সরু। বেশ কয়েকবার ডানে-বামে মোড় নিল ক্যাথি। এরপর অকস্মাৎ থেমে গেল লেক্সিংটন স্ট্রিট চৌরাস্তায়। কারো জন্যে অপেক্ষা করছে।
এখানেই তাহলে দেখা করে তারা। ভালো একটা জায়গা বেছে নিয়েছে। চারপাশে ভিড় থাকে সবসময়, কারো চোখে পড়বে না। উপায়ন্তর না দেখে রাস্তার পাশের একটা পাবে ঢুকে পড়লাম। বার কাউন্টারের সামনে দাঁড়ালে ক্যাথিকে স্পষ্ট দেখা যায়। দাড়িওয়ালা বারটেন্ডার ভ্রু উঁচু করে তাকালে আমার দিকে। “কি লাগবে?”
“গিনেস। এক পেগ।”
হাই তুলে কাউন্টারের অন্য পাশ থেকে একটা গ্লাস এনে আমার সামনে রাখলো সে। ক্যাথি যদি সরাসরি এদিকে তাকায়, তবুও জানালার ফাঁক গলে আমাকে দেখতে পাবে না। কিছুক্ষণ পর আসলেও তাকালো সে। হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে গেল আমার। কিন্তু না, ধরা পড়ে যাইনি। চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে ক্যাথি।
পাঁচ মিনিট চলে গেল। এখনও অপেক্ষা করছে ক্যাথি। আমি গ্লাসটা নাড়াচাড়া করে চলেছি একমনে। আসতে দেরি করছে লোকটা। ক্যাথির তো এরকমটা পছন্দ করার কথা নয়। কারো জন্যে সচরাচর অপেক্ষা করেনা সে। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজেই দেরি করে। বিরক্তির ছাপ দেখতে পাচ্ছি ওর চেহারায়, বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে।
এসময় একটা লোক রাস্তা পার হয়ে তার দিকে এগোতে লাগলো। কয়েক সেকেন্ডেই তাকে মেপে ফেললাম। চওড়া ছাতি, কাঁধ অবধি নেমে এসেছে সোনালী চুল। এই বিষয়টা অবাক করলো আমাকে, ক্যাথি সাধারণত কালো চুলের পুরুষদের পছন্দ করে, আমার মতন। হয়তো এই বিষয়েও মিথ্যে বলেছে।
