“ছোঁচা কোথাকার!” চিল্লিয়ে উঠলো পরক্ষণেই। “হাত সরা।”
আশপাশের সবাই হেসে উঠলো দৃশ্যটা দেখে। নতুন উদ্যোমে খাবারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এলিফ।
রুমের একদম পেছন দিকে একা একটা টেবিলে বসেছে অ্যালিসিয়া। সামনে রাখা খাবারগুলোর প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই তার। মাঝে মাঝে মাছের টুকরোটা নিয়ে আনমনে নাড়াচাড়া করছে, কিন্তু একবারও মুখে তুলল না। ভাবলাম তার সাথে গিয়ে বসি, পরক্ষণেই বাতিল করে দিলাম চিন্তাটা। যদি আমার দিকে তাকাতো, তাহলে যাওয়ার কথা ভাবতাম। কিন্তু ইচ্ছে করে চোখ নামিয়ে রেখেছে সে, আশপাশের কোন কিছু প্রতি আগ্রহ নেই। এখন তাকে ঘটানোটা একদমই উচিৎ হবে না। তাই রোগিদের থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে একটা টেবিলের শেষমাথায় বসে খাবার খেতে শুরু করলাম। স্বাদহীন মাছটা কেবলই মুখে দিয়েছি এমন সময় আমার পাশে এসে বসলো কেউ একজন।
ক্রিস্টিয়ান।
অবাক হলেও মুখে কিছু বললাম না।
“ঠিক আছো?” মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করলো সে।
“হ্যাঁ, তুমি?”।
জবাব না দিয়ে প্লেট থেকে কিছুটা ভাত আর তরকারি মুখে চালান করে দিল ক্রিস্টিয়ান। “তুমি নাকি অ্যালিসিয়াকে ছবি আঁকার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছ?” মুখভর্তি খাবার নিয়েই কথা বলছে সে।
“বাহ, ইতোমধ্যে জেনেও গেছো দেখছি।”
“ছোট জায়গায় খবর তাড়াতাড়ি ছড়ায়। বুদ্ধিটা আসলেও তোমার নাকি?”
“হ্যাঁ। ওর জন্যে ভালো হবে ব্যাপারটা।”
সন্দেহ ফুটলো ক্রিস্টিয়ানের চেহারায়। “সাবধানে, বন্ধু।”
“সতর্ক করার জন্যে ধন্যবাদ। কিন্তু এত সাবধানতার কিছু নেই আসলে।”
“না, এমনি বললাম। বর্ডারলাইন রোগিদের আলাদা একটা আকর্ষণ থাকে, বুঝি আমি ব্যাপারটা। এক্ষেত্রেও তেমনটাই হচ্ছে, তুমি ধরতে পারছে না।”
“অ্যালিসিয়া আমাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলবে না, ক্রিস্টিয়ান।”
হেসে উঠলো সে। “আমার ধারণা ইতোমধ্যে ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছে তুমি। যা চাচ্ছে সেটাই তুলে দিচ্ছ হাতে।”
“ওর মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্যে যা দরকার সেটাই করছি আমি। দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে।”
“তার কি দরকার সেটা তুমি কি করে জানলে? একটু মাত্রাতিরিক্ত গুরত্ব দিয়ে ফেলছো না? এখানে কিন্তু অ্যালিসিয়া রোগি, তুমি নও।”
রাগ লুকোনোর জন্যে ঘড়ির দিকে তাকালাম। “যেতে হবে আমাকে।”
ট্রে হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। হেঁটে চলে যাচ্ছি এসময় পেছন থেকে ডাক দিল ক্রিস্টিয়ান। “তোমার এই ভালোমানুষির এক কড়ি দাম নেই ওর কাছে। আমার কথা মিলিয়ে নিও পরে।”
প্রচণ্ড বিরক্ত হলাম কথাগুলো শুনে। সারাদিন আর মেজাজ ভালো হলো না।
***
ডিউটি শেষে গ্রোভ থেকে বেরিয়ে রাস্তার শেষ মাথায় ছোট দোকানটায় চলে গেলাম সিগারেট কিনতে। বিল মিটিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে লম্বা টান দিলাম। মাথায় ক্রিস্টিয়ানের বলা কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। বর্ডারলাইন রোগিদের আলাদা একটা আকর্ষণ থাকে।
আসলেও কি অ্যালিসিয়ার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করি আমি? ওর মুখে সত্যটা শুনেই বিরক্ত হয়েছিলাম? ক্রিস্টিয়ান অন্তত এমনটাই ভাবে, ডায়োমেডেসও নিশ্চয়ই সন্দেহ করেছেন। তাদের ধারণাই ঠিক?
বেশ কিছুক্ষণ আপনমনে চিন্তা করার পর বুঝলাম তারা ভুল ভাবছে। অ্যালিসিয়াকে সাহায্য করতে চাই আমি, এর বেশি কিছু না। সবসময়ই তার থেকে নির্দিষ্ট একটা দূরত্ব বজায় রেখেছি পেশাদারিত্বের খাতিরে। দরকার হলে আরো সতর্ক থাকবো এখন থেকে।
(কিন্তু ভুল ভেবেছিলাম আমি। যদিও নিজের কাছে স্বীকার করতে রাজি ছিলাম না ব্যাপারটা। বড্ড দেরি হয়ে গেছিল ততদিনে।)
***
জিন-ফিলিক্সের সাথে কথা বলার জন্যে ফোন দিলাম গ্যালারিতে। অ্যালিসিয়ার ছবি আঁকার সরঞ্জামগুলো এখন কোথায় আছে তা জানতে চাইলাম। “সব কি স্টোরেজে রাখা?”
“না, আসলে,” কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর জবাব দিল সে। “আমার কাছেই আছে ওগুলো।”
“আপনার কাছে?”
“হ্যাঁ। বিচারের পর ওর স্টুডিও থেকে সবকিছু নিয়ে এসেছি আমি। যেগুলো জরুরি মনে হয়েছে, সবই রেখে দিয়েছি। ওর পরনে অনেকগুলো স্কেচ, নোটবুক, তেলরঙ-এসব আরকি। ওর হয়ে সংরক্ষন করছি বলতে পারেন।”
“খুব ভালো কাজ করছেন।”
“তাহলে আমার পরামর্শ মনে ধরেছে আপনার? অ্যালিসিয়াকে ছবি আঁকার সুযোগ করে দিচ্ছেন?”
“হ্যাঁ। তবে আদৌ কিছু হবে কি না সেটা সময়ই বলে দিবে।”
“কিছু না কিছু তো জানা যাবেই। তবে আমার একটা অনুরোধ আছে।”
“কি?”
“ও যদি কিছু আঁকে, আমাকে অবশ্যই দেখাবেন।”
তার কণ্ঠে অদ্ভুত একটা আকুতি। স্টোররুমে যত্নের সাথে রাখা অ্যালিসিয়ার ছবিগুলোর কথা মনে হলো আমার। ওগুলো কি আসলে অ্যালিসিয়ার জন্যে সংরক্ষণ করছে সে, নাকি নিজের জন্যে?
“আপনি কি একটু কষ্ট করে জিনিসগুলো গ্রোভে দিয়ে যেতে পারবেন?” জিজ্ঞেস করলাম। “সমস্যা হবে?”
“ইয়ে, মানে-” তার কণ্ঠের দ্বিধান্বিত ভাবটা বুঝতে কষ্ট হলো না আমার।
“নাকি আমি এসে নিয়ে গেলেই সুবিধা?” তাকে এ যাত্রা বাঁচিয়ে দিলাম।
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেটাই ভালো হবে বরং?”
এখানে এসে অ্যালিসিয়ার সাথে দেখা করতে ভয় পাচ্ছে জিন-ফিলিক্স। কেন? কি ঘটেছিল তাদের মাঝে?
কিসের মুখোমুখি হতে এত ভয় তার?
.
২.২৭
“তোমার বান্ধবীর সাথে কখন দেখা করবে?” জিজ্ঞেস করলাম।
“সাতটার সময়, রিহার্সেলের পর।” আমার হাতে কফির কাপটা তুলে দিল ক্যাথি। “ওর নাম নিকোল। ভুলে গেছো বোধহয়?”
