মেঝের দিক থেকে মুখ তুলল না অ্যালিসিয়া।
আমি কথা চালিয়ে গেলাম। “সোহোতে গিয়েছিলাম একটা কাজে। সেখানে আপনার পুরনো গ্যালারিটা দেখে আর নিজেকে থামাতে পারিনি। ম্যানেজার নিজে আগ্রহ করে আমাকে আপনার আঁকা সব ছবি দেখিয়েছে। তিনি তো আপনার পুরনো বন্ধু বোধহয়। মি. জিন-ফিলিক্স মার্টিন?”
কোন উত্তর এলো না এবারেও।
“আশা করি আপনি ব্যাপারটায় কিছু মনে করেননি। আপনার ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলাচ্ছি না কিন্তু। তবে আপনার সাথে প্রথমে কথা বলে নিলেই বোধহয় ভালো করতাম।”
মনে হচ্ছে যেন কোন মূর্তির সাথে কথা বলছি।
“আপনার কিছু পেইন্টিং আগে দেখিনি আমি, সেগুলোও দেখলাম কালকে। একটা আপনার মা’র দুর্ঘটনা নিয়ে আঁকা, আরেকটা আপনার ফুপি লিডিয়া রোজকে নিয়ে।”
এবারে মাথা তুলে আমার দিকে তাকালো অ্যালিসিয়া। তার চোখে আগে কখনো এরকম অভিব্যক্তি খেলা করতে দেখিনি। বিদ্রূপ?
“আপনার থেরাপিস্ট হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই ছবিগুলোর ব্যাপারে কৌতূহল ছিল আমার। কিন্তু আমি যদি আপনাকে না-ও চিনতাম, তবুও ছবিগুলো দেখে অভিভূত হতাম নিশ্চিত। আমি কোন শিল্প-বিশারদ নই, কিন্তু আপনার পেইন্টিংগুলোর শিল্পমান নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই।”
চোখ নামিয়ে নিল অ্যালিসিয়া। আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।
“তবে কিছু জিনিস একটু অদ্ভুত লেগেছে আমার কাছে,” দ্রুত বললাম। “যেমন আপনার মা’র দুর্ঘটনার পেইন্টিংটায় আপনি ইচ্ছে করেই নিজেকে আঁকেননি। কিন্তু দুর্ঘটনার সময় আপনিও তো গাড়িতেই ছিলেন।”
কোন প্রতিক্রিয়া নেই।
“আচ্ছা, এর কারণটা ঠিক কি হতে পারে? আপনি হয়তো নিজেকে পেইন্টিংয়ে না রেখে এটা বোঝাতে চেয়েছেন যে ট্র্যাজেডিটা শুধুমাত্র আপনার মায়ের? কারণ তিনি মারা গিয়েছিলেন? কিন্তু গাড়িতে তো তখন ছোট্ট একটা মেয়েও ছিল। দুর্ঘটনাটা তার মনে কি প্রভাব ফেলেছিল, হয়তো সেটা কেউ বুঝতে চায়নি সে মুহূর্তে, নাকি?”
আবারো আমার দিকে তাকালো অ্যালিসিয়া। এবারে তার দৃষ্টিতে কৌতূহল। ঠিক পথেই এগোচ্ছি।
“জিন-ফিলিক্সকে আমি আপনার অ্যালসেস্টিস ছবিটার ব্যাপারেও কিছু প্রশ্ন করেছিলাম। আসলে আত্মপ্রতিকৃতিটা আঁকার কারণ জানতে চাচ্ছিলাম। তখন উনি বললেন এটা পড়তে।”
অ্যালসেস্টিস নাটকের কপিটা বের করে কফি টেবিলে রাখলাম। ওটার দিকে তাকালো অ্যালিসিয়া।
“ও কথা বলছে না কেন?’-নাটকের শেষ অঙ্কে জিজ্ঞেস করে অ্যাডমেতাস। আমিও আপনাকে একই প্রশ্ন করছি, অ্যালিসিয়া। কি এমন ঘটেছে যেটা বলতে পারছেন না আপনি? কেন মুখ বন্ধ রেখেছেন?”
চোখ বন্ধ করে ফেললো অ্যালিসিয়া। আমাকে দৃষ্টির আড়াল করতে চাইছে। তার জন্যে আজকের মতন কথোপকথনের এখানেই সমাপ্তি। পেছনের দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকালাম। সেশনের সময়ও শেষ হতে চলেছে। আর দুই মিনিট বাকি।
তবে তুরুপের তাসটা এতক্ষণ অবধি লুকিয়ে রেখেছিলাম। ভেতরে ভেতরে নার্ভাস লাগলেও যতটা সম্ভব স্বাভাবিক স্বরে বললাম, “জিন ফিলিক্স একটা পরামর্শ দিয়েছেন। আমার কাছেও পরামর্শটা ভালোই মনে হয়েছে। তার মতে আপনাকে ছবি আঁকতে দেয়া উচিৎ। আঁকবেন? চাইলে আপনার জন্যে আলাদা ঘরের ব্যবস্থাও করে দেয়া যাবে।”
চোখ খুলল অ্যালিসিয়া। বিস্ময় ফুটেছে চেহারায়। দেখে মনে হচ্ছে একটা বাচ্চা মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছি। তার নিষ্পাপ চাহনিতে সন্দেহ বা ঘৃণার কোন ছায়া নেই। হঠাৎ করেই তাকে বড় বেশি জীবন্ত মনে হচ্ছে।
“এ বিষয়ে প্রফেসর ডায়োমেডেসের সাথে কথা হয়েছে আমার, তিনি আপত্তি করেননি। রোয়েনাও রাজি। বল এখন পুরোপুরি আপনার কোর্টে, অ্যালিসিয়া। কি মনে হচ্ছে আপনার? আঁকবেন?”
অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমার দিকে একমনে তাকিয়েই আছে অ্যালিসিয়া।
এরপর হঠাৎ করেই যা চাইছিলাম সেটা পেয়ে গেলাম, অবশেষে। তার এই প্রতিক্রিয়ার অর্থ ঠিক পথেই এগোচ্ছি আমি।
খুবই সামান্য একটা প্রতিক্রিয়া, কিন্তু এর প্রভাব বিস্তর।
হাসি ফুটেছে অ্যালিসিয়ার ঠোঁটে।
২.২৬ গ্রোভের সবচেয়ে গরম জায়গা
২.২৬
গ্রোভের সবচেয়ে গরম জায়গাটা হচ্ছে ক্যান্টিন। দেয়াল জুড়ে অনেকগুলো রেডিয়েটর, তাই ওখানকার বেঞ্চগুলোই দখল হয়ে যায় প্রথমে। লাঞ্চে ভিড়টা হয় সবচেয়ে বেশি। স্টাফ আর রোগিরা পাশাপাশি বসে খায়। এসময়। ডাইনারের লোকদেরও ব্যস্ত সময় কাটে হৈ-হট্টগোলের মাঝে। তাছাড়া ইউনিটের সব রোগি এক জায়গায় জড়ো হওয়াতে সবসময় সতর্কও থাকতে হয়।
আজ দুইজন ক্যারিবিয়ান মহিলা হাসিমুখে ডাইনারের দায়িত্ব পালন করছে। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে সবার পাতে ফিশ অ্যান্ড চিপস বা চিকেন কারি তুলে দিচ্ছে দক্ষ হাতে। খাবারগুলো খেতে যেমনই হোক না কেন, গন্ধ সুন্দর। আমি ফিশ-অ্যান্ড-চিপস নিলাম, অভিজ্ঞতায় বলে এটার স্বাদই তুলনামূলক ভালো হবার কথা। খাবার নিয়ে আসার পথে এলিফকে দেখলাম সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে একটা টেবিল দখল করে বসেছে। বরাবরের মতনই খাবারের মান নিয়ে হাজারটা অভিযোগ তাদের।
“এই ফালতু খাবার গলা দিয়ে নামবে না আমার।”সামনে থেকে ট্রে সরিয়ে দিল এলিফ।
তার ডান পাশে বসে থাকা আরেকজন রোগি সাথে সাথে ট্রে-টা নিজের দিকে টেনে নেয়ার চেষ্টা করতেই বেচারির মাথায় গাট্টা বসিয়ে দিল সে।
