কয়েক সেকেন্ড পর মুখের ভাষা ফিরে পেলাম। “আর অ্যালিসিয়া?”
“অ্যালিসিয়া কি?”
“স্বামীর কাপুরুষতার জন্যে মৃত্যুর পথ বেছে নিতে হয়েছিল অ্যালসেস্টিসকে। আর অ্যালসিয়া-”
“না, অ্যালিসিয়া মারা যায়নি…অন্তত শারীরিকভাবে।”তার কথায় প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। “কিন্তু মানসিকভাবে…”।
“মানে বলতে চাইছেন যে এমন কিছু একটা হয়েছে যেটায় ওর আত্মার মৃত্যু ঘটেছে…ঘটনাটা ওর বেঁচে থাকার স্পৃহা কেড়ে নিয়েছে।”
“সম্ভবত।”
কেন যেন আমার মনঃপুত হলো না ব্যাখ্যাটা। বইটা হাতে নিয়ে প্রচ্ছদের দিকে তাকালাম। অনিন্দ্য সুন্দর একটা নারীমুর্তি শোভা পাচ্ছে সেখানে, মার্বেলের তৈরি। জিন-ফিলিক্সের বলা কথাটা মনে হলো এসময়।
“তাহলে এখন আমাদের উচিৎ হবে অ্যালসেস্টিসের মতন অ্যালিসিয়াকেও উদ্ধার করা।”
“ঠিক বলেছো।”
“আচ্ছা, আমি একটা কথা ভাবছিলাম। আঁকাআঁকি হচ্ছে অ্যালিসিয়ার মত প্রকাশের মাধ্যম। আমরা যে সেই সুযোগটা করে দেই তাকে?”
“কিভাবে করবে সেটা?”
“ছবি আঁকতে দেই?”
বিস্মিত মনে হলো ডায়োমেডেসকে। পরক্ষণেই হাত নেড়ে প্রস্তাবটা নাকচ করে দিলেন। “ইতোমধ্যে আর্ট থেরাপি সেশনে বেশ কয়েকবার অংশ নিয়েছে ও।”
“আর্ট থেরাপির কথা বলছি না আমি। তাকে একা একা নিজের মত করে আঁকার সুযোগ করে দেয়া যায় কিন্তু ভেতরে আটকে থাকা আবেগগুলো হয়তো ক্যানভাসে চিত্রায়িত করতে পারবে সে।”
কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন ডায়োমেডেস। ভাবছেন বিষয়টা নিয়ে। “তোমাকে এ ব্যাপারে ওর আর্ট থেরাপিস্টের সাথে কথা বলতে হবে। তার সাথে পরিচয় আছে তোমার? রোয়েনা হার্ট? ওকে রাজি করানোটা সহজ হবে না”
“না, কিন্তু কথা বলে নেব। আপনার অনুমতি আছে তাহলে?”
কাঁধ ঝাঁকালো ডায়োমেডেস। “তুমি যদি রোয়েনাকে রাজি করাতে পারো, তাহলে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আগে থেকেই সাবধান করে দিচ্ছি। ওর পছন্দ হবে না বুদ্ধিটা। একটুও না।”
.
২.২৪
“চমৎকার বুদ্ধি,” রোয়েনা বলল।
“আসলেও?” বিস্ময় গোপন করলাম।
“হ্যাঁ। কিন্তু একটাই সমস্যা, অ্যালিসিয়া ছবি আঁকবে না।”
“এতটা নিশ্চিত হয়ে বলছেন কি করে?”
বিদ্রুপের ভঙ্গিতে নাক দিয়ে শব্দ করে রোয়েনা। “কারণ অ্যালিসিয়ার মত ফালতু কাউকে নিয়ে আগে কাজ করিনি আমি। এত চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছুতেই সাড়া দেয়নি সে।”
“ওহ।”
রোয়েনার পিছু পিছু আর্ট রুমে চলে এলাম। মেঝের ওপরে রঙ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দেয়ালে নানারকমের চিত্রকর্ম। কয়েকটা সুন্দর কিন্তু বেশিরভাগই অদ্ভুত। রোয়েনার সোনালী চুল ছোট করে ছটা। জোড়া কুঁচকেই থাকে সর্বদা। অবশ্য সার্বক্ষণিক এতজন রোগিকে সামলাতে হলে স্বভাব চরিত্রে চাঁছাছোলা ভাব আসবেই। আর রোগিদের বেশিরভাগই নিশ্চয়ই তার কথা শোনে না। অ্যালিসিয়াও সেরকমই একজন।
“আর্ট থেরাপিতে কি আদৌ কখনো কোন আগ্রহ দেখিয়েছে অ্যালিসিয়া?”
“নাহ,” কথা বলার ফাঁকে রুমের তাকগুলো গোছগাছ করছে রোয়েনা। “তবে প্রথমে যখন আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিল, ভেবেছিলাম সবাই যদি সহযোগিতা করি তাহলে হয়তো সাড়া দিবে। কিন্তু চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করে না সে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সামনের সাদা পেজের দিকে। এমনকি একবারের জন্যে পেন্সিলটাও ওঠায়নি। যারা তাও টুকটাক আঁকত, তারাও দমে যায় ওকে দেখে।”
সহানুভূতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়লাম। আর্ট থেরাপির উদ্দেশ্যই হচ্ছে রোগিদের মনের ভাব রংতুলির মাধ্যমে কাগজে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করা, তখন বিষয়টা নিয়ে বিস্তারিত আলাপও করতে পারি আমরা। মানুষের অবচতেন মনের ইচ্ছেগুলো কিন্তু চাইলে একটা কাগজে বিনা প্ররোচনায় ফুটিয়ে তোলা যায়। অবশ্য কাজের ব্যাপারে থেরাপিস্টের নৈপুন্যও বড় একটা ভূমিকা পালন করে এক্ষেত্রে। রুথ প্রায়ই বলতো যে খুব কম থেরাপিস্টেরই ক্ষমতা আছে নিজের সজ্ঞা থেকে রোগিদের সাহায্য করার, বাকিরা এটাকে নিতান্ত সাধারণ একটা পেশা হিসেবেই দেখে। আমার মতে রোয়েনা দ্বিতীয় দলেই পড়বে। রোয়েনার নিশ্চয়ই ধারণা অ্যালিসিয়া তাকে আমলেই নিচ্ছে না। হয়তো ব্যাপারটা তার জন্যে কষ্টদায়ক,” গলার স্বর যতটা সম্ভব নরম করে বললাম।
“কষ্টদায়ক?”
“একজন শিল্পী নিশ্চয়ই অন্যান্য রোগিদের সামনে ছবি আঁকার ব্যাপারটা ভালোভাবে নেবেনা।”
“না নেয়ার কি আছে? কি এমন করেছে সে শুনি? ওর আঁকা ছবিগুলো দেখেছি আমি। ওরকম আহামরি কিছু মনে হয়নি,” বিরক্ত কণ্ঠে বলল রোয়েনা।
এতক্ষণে বুঝতে পারলাম কেন অ্যালিসিয়াকে দেখতে পারে না সে। ঈর্ষা।
“যে কেউ ওরকম ছবি আঁকতে পারবে,” রোয়েনা বলল। “বাস্তব ছবির মত করে কোন কিছু আঁকা খুব সহজ। কিন্তু নিজ থেকে কল্পনা করে কিছু আঁকতে বললেই এদের ঘাম ছুটে যায়।”
অ্যালিসিয়ার আঁকা ছবিগুলোর শিল্পমান নিয়ে তার সাথে তর্কের কোন ইচ্ছে নেই আমার। “তাহলে আমি যদি ওকে আর্ট থেরাপি সেশন থেকে সরিয়ে নেই, আপনার কোন আপত্তি থাকবে না?”
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো রোয়েনা। “না, আপত্তি করবো কেন। খুশিই হবে বরং।”
“ধন্যবাদ।”
“তবে ওর আঁকাআঁকির সরঞ্জামের ব্যবস্থা আপনাকেই করতে হবে। তেলরঙের জিনিসপত্র কেনার মত বাজেট নেই আমার।”
.
২.২৫
“একটা কাজ করে ফেলেছি আমি, শুনে বোধহয় একটু অবাকই হবেন।”
