“তোমার দিকে ও যেভাবে তাকায় সেটা পছন্দ না আমার।”
“কিভাবে তাকায়?”
“যেন তোমার ওপর ওর একটা দাবি আছে। আমার কি মনে হয় জানো? এখনই গ্যালারিটা ছেড়ে দেয়া উচিৎ তোমার-প্রদর্শনীর আগে।”।
“সেটা সম্ভব না, বড় দেরি হয়ে গেছে। তাছাড়া আমি তো ওকে ইচ্ছেকৃতভাবে কষ্ট দিতে চাই না। ওর মত মানুষ যে কতটা প্রতিশোধপরায়ণ হতে পারে….”।
“তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে ওকে ভয় পাও।”
“ভয়ের তো কিছু নেই। ভয় পাবো কেন? ধীরে ধীরে ওর কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়াটাই ভালো হবে আমার জন্যে।”
“যত তাড়াতাড়ি সরে আসবে, তত ভালো। তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে ও, সেটা তো বোঝো, নাকি?”
আর তর্ক বাড়াইনি তখন, কিন্তু গ্যাব্রিয়েলের ধারণা ভুল।
আমার প্রতি বাড়তি কোন আকর্ষণ নেই জিন-ফিলিক্সের। বরং আমার আঁকা ছবিগুলো বেশি আকৃষ্ট করে ওকে। এজন্যেই ওর কাছ থেকে দূরে সরে আসতে চাইছি। আমাকে নিয়ে কিছুই যায় আসে না তার।
তবে গ্যাব্রিয়েল একটা কথা ঠিকই বলেছে। ওকে ভয় পাই আমি।
.
২.২৩
ডায়োমেডেসকে তার অফিসেই খুঁজে পেলাম। হার্পটার সামনে একটা টুল নিয়ে বসে ছিলেন। বেশ বড় একটা কাঠের ফ্রেমে ঘেরা হাপটার মাঝে সোনালী রঙের তারের সমাবেশ।
“খুবই সুন্দর জিনিসটা,” বলি আমি।
মাথা নাড়েন ডায়োমেডেস। “কিন্তু বাজানো খুব কঠিন।” তারগুলো আলতোভাবে স্পর্শ করতেই অপূর্ব কঙ্কনধ্বনিতে ভরে উঠলো ঘরটা। “তুমি একবার চেষ্টা করে দেখবে নাকি?”
হেসে মানা করে দিলাম।
জবাবে তার মুখে হাসি ফুটলো। “তোমাকে বারবার বলি এই আশায় যে হয়তো মত বদলাবে কোনদিন। সহজে কিন্তু হাল ছাড়ব না, আগেই বলে দিচ্ছি।”
“আসলে সংগীত বিষয়ে একদমই প্রতিভা নেই আমার। আমাদের স্কুলের মিউজিক টিচার প্রথম দিনই একথা আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।”
“আসলে থেরাপির মত সঙ্গিতের ক্ষেত্রেও প্রশিক্ষক হিসেবে কাকে বেছে নিচ্ছো, তার ওপরে অনেক কিছু নির্ভর করে।”
“সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।”
বাইরের কালো হয়ে আসা আকাশের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন প্রফেসর। “মেঘগুলো দেখছো না? এগুলোর ভেতরে কিন্তু তুষার আছে।”
“আমার তো দেখে মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে।”
“না, তুষার ঝরবে আজ। আমার কথার ওপর ভরসা করতে পারো, গ্রীসে আমাদের পূর্বপুরুষদের অনেকেই রাখাল ছিল। তুষারপাতই হবে।”
আশাতুর দৃষ্টিতে আরো কিছুক্ষণ মেঘের দিকে তাকিয়ে থেকে আমার দিকে নজর ফেরালেন ডায়োমেডেস। “কেন এসেছো, থিও?”
“এটার জন্যে।”
অ্যালসেস্টিসের কপিটা তার দিকে ঠেলে দিয়ে বলি।
“কি এটা?”
“ইউরিপিডেসের লেখা একটা ট্র্যাজেডি।”
“সেটা তো বুঝতেই পারছি। আমাকে এটা দেখাচ্ছো কেন?”
“যেন তেন ট্র্যাজেডি নয়, এটার নাম অ্যালসেস্টিস। একটু ভেবে দেখুন, গ্যাব্রিয়েলের খুন হবার পর অ্যালিসিয়া তার আঁকা ছবিটার নাম কি দিয়েছিল?”
“তাই তো!” এবারে মনোযোগ দিয়ে বইটার দিকে তাকালেন ডায়োমেডেস। “নিজেকে ট্র্যাজেডির নায়িকা হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছে সেখানে।” মজাচ্ছলেই কথাটা বললেন তিনি।
“হতেও পারে। কিন্তু আমি এখনও বুঝতে পারছি না ট্র্যাজেড়িটা কি ইঙ্গিত করছে। সেজন্যেই ভাবলাম আপনি হয়তো এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবেন।”
“কারণ আমি গ্রিক?” উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন ডায়োমেডেস। “তুমি কি ভেবেছো? সব গ্রিক ট্র্যাজেডি সম্পর্কে জ্ঞান রাখি আমি?”
“আমার চেয়ে অন্তত বেশি।”
“কেন যে সবাই এটা মনে করে। তাহলে তো বলতে হয় ইংরেজ মাত্রই শেক্সপিয়ারের সব রচনা মুখস্থ করা উচিৎ তোমাদের,” বলে আমার উদ্দেশ্যে করুণার একটা হাসি দিলেন প্রফেসর। কিন্তু তোমার ভাগ্য ভাল, আমাদের দেশের মধ্যে এটাই পার্থক্য। জন্মসূত্রে গ্রিক এমন সবাই ট্র্যাজেড়িগুলো পড়েছে। এগুলো আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।”
“তাহলে তো কথাই নেই। আমাকে নিশ্চয়ই সাহায্য করতে পারবেন। আপনি।”
বইটা একবার উল্টেপাল্টে দেখলেন ডায়োমেডেস। “কি বুঝতে পারছো না?” |
“অ্যালসেস্টিসের কথা না বলার ব্যাপারটা। স্বামীর জন্যে আত্মাহুতি দেয় সে। কিন্তু শেষে যখন পাতাললোক থেকে ফিরে আসে, কোন কথা বলে না।”
“হুম, অ্যালিসিয়ার মতন।”
“হ্যাঁ।”
“আবারো জিজ্ঞেস করছি, ঠিক কি বুঝতে পারছো না?”
“আপনার কি মনে হচ্ছে না দুটো ঘটনার মধ্যে কোন সম্পর্ক আছে? অ্যালসেস্টিস কেন কথা বলেনি শেষে?”
“তোমার কি মনে হয়?”
“বুঝতে পারছি না আসলে। হয়তো আবেগের বশে?”
“হয়তো। কোন আবেগের কথা বলছো?”
“আনন্দ?”
“আনন্দ?” হেসে উঠলে প্রফেসর। “আচ্ছা, একটা কথা বলো থিও। ধরো তুমি একজনকে ভালোবাসো, এখন সে যদি কাপুরুষের মতন নিজের জায়গায় তোমাকে মরতে বলে, তাহলে তোমার কেমন লাগবে? মনে হবে না যে সে তোমার ভালোবাসার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে?”
“মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন সে কষ্ট পেয়েছিল?”
“কেউ কি কখনো তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি?”
প্রশ্নটা ছুরির ফলার মত এসে বিধলো আমার বুকে। বুঝতে পারছি যে চেহারা লাল হয়ে উঠছে। মুখ খুললেও কিছু বলতে পারলাম না।
“জবাবটা আন্দাজ করতে পারছি,” মুচকি হেসে বললেন ডায়োমেডেস। “তাহলে…এবার বলল, অ্যালসেস্টির কেমন লাগছিল?”
“রাগ। ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসছিল সে।”
“হ্যাঁ, মাথা নেড়ে আমার সাথে সম্মতি প্রকাশ করলেন ডায়োমেডেস। “ভবিষ্যতে অ্যাডমেতাস আর অ্যালসেস্টিসের মধ্যকার সম্পর্কটা কোন দিকে মোড় নিবে সেটা কিন্তু ভাবনার বিষয়। কারো প্রতি ভরসা উঠে গেলে সেটা ফিরে পাওয়াটা কঠিন।”
