আরেকটা বিষয়, সবকিছুতে আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের দোহাই দেয় সে। এত বছরের বন্ধু আমরা, এক সময় তো আমার আর তোমার পাশে কেউ ছিল না’-এই কথাগুলো দিয়ে বশ করতে চায় আমাকে। কিন্তু জিন ফিলিক্স বোধহয় বোঝে না যে সে আমার জীবনের এমন একটা সময়ের কথা বলে যখন আমি প্রকৃতপক্ষে সুখি ছিলাম না। আর ওর প্রতি আমার যে আবেগটুকু কাজ করতো তখন সেটাও ভুলে যেতে চাই। আমাদের সম্পর্কটা ছিল একপ্রকার বিবাহিত জুটিদের মতন, যাদের মধ্যে আর ভালোবাসার ছিটেফোঁটা নেই। কে চায় এমন কিছু মনে রাখতে? তাকে যে আসলে আমি কতটা অপছন্দ করি সেটা আজ টের পেয়েছি।
“আমি কাজ করছি,” এক পর্যায়ে বলেই ফেলি। “এটা শেষ করতে হবে, তাই যদি কিছু মনে না করো…”।
“তুমি কি আমাকে চলে যেতে বলছো?” চেহারার অভিব্যক্তি পাল্টে যায় জিন ফেলিক্সের। “তুমি যেদিন প্রথম হাতে তুলি নিয়েছে, সেদিন থেকে তোমার পাশে আছি আমি। যদি তোমার কাজে বিরক্তই করে থাকি, তাহলে এতদিন বলোনি কেন?”
“এতদিন বলিনি, কিন্তু এখন বলছি।”
মনে হচ্ছিল, রুমের তাপমাত্রা যেন হঠাৎই বেড়ে গেছে। রাগ লাগছিল ভীষণ। চেষ্টা করেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। আবারো ছবি আঁকায় মনোযোগ ফেরাতে গিয়ে দেখি হাত কাঁপছে। জিন-ফিলিক্স যে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম। আমার কথায় রেগে গেছো তুমি,” অবশেষে বলে সে। “কিন্তু কেন?”
“বললাম তো আমি ব্যস্ত। তাছাড়া এভাবে আগে থেকে না জানিয়ে হুট করে বাসায় চলে আসতে পারো না তুমি। অন্তত ফোন তো করবে।”
“দুঃখিত, আমি আসলে বুঝতে পারিনি যে আমার বেস্টফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতেও অনুমতি দরকার এখন।”
কেউই কথা বলি না কিছুক্ষণ। আমার কথায় আসলেও কষ্ট পেয়েছে জিন-ফিলিক্স। কিন্তু এখন তো আর কথাগুলো ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব না। বরং এতদিন ধরে যে কথাগুলো তাকে বলবো বলে ভেবে এসেছি, সেগুলোও বলে দেয়াই ভালো মনে হয়েছিল তখন। জানতাম যে অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে, তাকে তখন ইচ্ছে করেই কষ্ট দিতে চাইছিলাম।
“জিন-ফিলিক্স, শোনো।”
“বলো, শুনছি।”
“কথাটা অন্যভাবে নিওনা, কিন্তু এবারের প্রদর্শনীর পর…একটু পরিবর্তন দরকার আমার জীবনে।”
“কিরকম পরিবর্তন?”
“গ্যালারি পরিবর্তন করতে চাই আমি।”
হতভম্ব দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল জিন-ফিলিক্স। মনে হচ্ছিল যেন ছোট কোন ছেলের হাত থেকে তার পছন্দের খেলনাটা আকস্মিক কেড়ে নেয়া হয়েছে। ওকে এভাবে দেখে বিরক্তি আরো বেড়ে গিয়েছিল আমার।
“আমাদের দু’জনেরই নতুন করে শুরু করা উচিৎ সবকিছু।”
“বুঝতে পারছি,” আরেকটা সিগারেট ধরায় সে। “পুরোটাই নিশ্চয়ই গ্যাব্রিয়েলের বুদ্ধি?”
“গ্যাব্রিয়েলের সাথে এসবের কোন লেনদেন নেই।”
“আমাকে দেখতে পারে না ও।”
“আহাম্মকের মতন কথা বলল না।”
“ও-ই আমার বিরুদ্ধে তোমাকে কানপড়া দিয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই দিয়ে আসছে।”
“এটা তোমার ভুল ধারণা।”
“এছাড়া আর কি ব্যাখ্যা আছে, বলো? তার প্ররোচনা ছাড়া কেন আমার সাথে এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করবে তুমি?”
“নাটক কোরো না তো। আমি শুধু গ্যালারি পরিবর্তনের কথা বলেছি। তোমার আর আমার বন্ধুত্ব তো বদলাবে না। চাইলেই একসাথে আড্ডা দেয়া যাবে।”
“কিন্তু সেজন্যে আগে আমাকে ফোন বা মেসেজ দিয়ে অনুমতি নিতে হবে?” হেসে উঠে একনাগাড়ে কথা বলতে শুরু করে সে, যেন আমি থামানোর আগেই সব বলে ফেলতে চাইছে। “বাহ, বাহ, বাহ! এতদিন ধরে আমি ভেবে এসেছি তোমার আর আমার বন্ধুত্বটা আসলেও অন্যরকম, কেউ এর মাঝে নাক গলাতে পারবে না। ভুল ভেবেছি আমি? আমার মত করে তোমার জন্যে কেউ কখনো ভাবেনি, ভাববেও না। এটা ভুলে যেও না।
“জিন-ফিলিক্স, প্লিজ-”
“তুমি যে এভাবে হঠাৎ করে সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললে, এটাই অবাক করেছে আমাকে।”
“আসলে অনেকদিন ধরেই কথাটা তোমাকে বলবো বলে ভাবছিলাম।”
এই কথাটা বলা একদমই উচিৎ হয়নি আমার। চেহারা একদম ফ্যাকাসে হয়ে যায় জিন-ফিলিক্সের। “অনেকদিন ধরে মানে? কি বলছো এসব?”
‘এটাই সত্যি।”
“তাহলে এতদিন আমার সাথে অভিনয় করে এসেছো, তাই তো? অ্যালিসিয়া! এভাবে সব কিছু শেষ করে দিও না। আমার পিঠে ছুরি বসিও না, দোহাই লাগে।”
“তোমার পিঠে ছুরি বসানোর মত তো কিছু করছি না আমি! নাটক বাদ দাও। আমাদের বন্ধুত্ব আগের মতনই থাকবে।”
“আচ্ছা, এ বিষয়ে আমরা আপাতত আর কিছু না বলি। আসলে আজকে কেন এসেছিলাম আমি জানো? শুক্রবারে তোমার সাথে থিয়েটারে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল।” পকেট থেকে দুটো টিকেট বের করে দেখায় ও। ইউরিপিডেসের একটা ট্র্যাজেডি চলছে ন্যাশনাল থিয়েটারে। “আমি চাই সেদিন তুমি আমার সাথে যাবে। এভাবেই নাহয় একে অপরকে বিদায় বলি * আমরা? আমাদের পুরনো বন্ধুত্বের খাতিরে হলেও না বলো না, প্লিজ।”
ইতস্তত করছিলাম। ওর সাথে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে নেই আমার। কিন্তু তখন যদি মানা করতাম তাহলে খুব বেশি অপরাধবোধ হতো। সত্যি বলতে ওকে স্টুডিও থেকে বের করার জন্যে যে কোন কিছু করতে রাজি ছিলাম। তাই হ্যাঁ বলে দেই।
রাত ১০:৩০
গ্যাব্রিয়েল বাসায় ফিরলে তাকে সব জানাই। জবাবে ও বলে যে জিন ফিলিক্সের সাথে আমার বন্ধুত্বের ব্যাপারটা কখনোই নাকি বোঝেনি।
