“আমি ফেরত দিয়ে দিব তোকে। পুরোটা না পারলি, অল্প কিছু হলেও দে।”
জবাবে কিছু বলি না আমি। কিন্তু অনুনয় করতেই থাকে পল। আজ রাতেই নাকি টাকা নিতে আসবে পাওনাদারদের লোকজন। তখন তাদের আশ্বস্ত করার জন্যে সামান্য কিছু হলেও দিতে হবে। তাই খালি হাতে ফেরত যাওয়া চলবে না ওর। কি করবো বুঝে উঠতে পারিনি প্রথমে। ওকে সাহায্য করতে চাইছিলাম, কিন্তু এভাবে টাকা দেয়াটা উচিৎ হবে কি না সেটা ভাবনার বিষয়। এটাও জানতাম যে টাকা দিয়ে পাওনাদারদের শান্ত না করলে লিডিয়া ফুপির কাছ থেকে ওর ধার-কর্যের ব্যাপারটা লুকোনো সহজ হবে না। পলের জন্যে আসলেও খুব বাজে একটা পরিস্থিতি। আমার তো মনে হয় টাকা ধার দেয়া এসব মহাজনদের চাইতে লিডিয়ার মুখোমুখি অনেক বেশি ভয়ংকর।
“দাঁড়া, একটা চেক লিখে দিচ্ছি তোকে,” অবশেষে বলি আমি।
কৃতজ্ঞতার ছাপ ফোটে পলের চেহারায়। “ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ।” বিড়বিড় করে বলতেই থাকে।
ওকে দু’হাজার পাউন্ডের একটা চেক দেই। জানি পরিমাণটা ওর জন্যে খুব কম, কিন্তু আগে কখনো এরকম পরিস্থিতিতে পড়িনি আমি। আমার জন্যেও ব্যাপারটা নতুন। তাছাড়া ওর কথা পুরোপুরি বিশ্বাসও হচ্ছিল না। কোন একটা ফাঁক তো নিশ্চয়ই আছে।
“গ্যাব্রিয়েলের সাথে কথা বলে হয়তো আরো বেশি দিতে পারবো,” বলি আমি। “কিন্তু আমাদের অন্য কোন সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। গ্যাব্রিয়েলের ভাই কিন্তু একজন আইনজীবী। হয়তো-”
লাফিয়ে ওঠে পল, আতঙ্কিত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকায় কয়েকবার। “না, না, না। গ্যাব্রিয়েলকে বলিস না। ওকে এসবের সাথে জড়ানোর কোন দরকার নেই। আমি দেখি সবকিছু কিভাবে সামলানো যায়।”
“আর লিডিয়া? তুই কতদিন লুকোবি-”
আবারো আগের ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকায় পল। চেকটা একরকম ছিনিয়ে নেয় আমার হাত থেকে। পাউন্ডের পরিমাণটা দেখে হতাশ হলেও কিছু বলে না। বিদায় নিয়ে চলে যায় কিছুক্ষণ পরেই।
বারবার মনে হচ্ছিল ওকে আশাহত করেছি আমি। পলের ব্যাপারে সবসময় এই অনুভূতিটা কাজ করে আমার মনে, ছোটবেলা থেকেই। অবচেতন মনে সে হয়তো আশা করতো যে একজন অভিভাবকের মত তাকে আগলে রাখবো আমি। কিন্তু কিভাবে বোঝাবো, আসলে এই ব্যাপারটা আমার সাথে যায় না।
গ্যাব্রিয়েল ফেরার পর ওকে সবকিছু জানাই। একটু বিরক্তই হয় সে আমার প্রতি। পলকে নাকি এক পাউন্ডও দেয়া উচিৎ না, তার ভুলের মাশুল তাকেই গুণতে হবে। তাছাড়া এটা আমার দায়িত্বও না।
জানি যে গ্যাব্রিয়েল ঠিকই বলেছে, তবুও ভেতর থেকে অপরাধবোধ দূর হয় না। ওই বাড়িটা থেকে আমি পালিয়ে আসতে পেরেছি, কিন্তু তার সেই সুযোগটা নেই। এখনও পলের মন মানসিকতা আট বছরের একটা ছেলের মতনই। আর সেই ছেলেটাকেই সাহায্য করতে চাই আমি।
কিন্তু জানি না কিভাবে করবো।
.
অগাস্ট ৬
আজকে সারাদিন পেইন্টিং নিয়েই কাটিয়েছি। জিশুর ছবিটার ব্যাকগ্রাউন্ডে কি আঁকা যায় সেটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছি কিছুক্ষণ। মেক্সিকোতে বেড়ানোর সময় যে ছবিগুলো তুলেছিলাম, ওগুলো দেখে কিছু স্কেচ করছি, এমন সময় জিন-ফিলিক্সের ডাক শুনতে পেলাম।
একবার ভাবলাম জবাব দেব না, তাহলে হয়তো চলে যাবে। কিন্তু গেট খোলার শব্দ কানে এলো পরক্ষণেই। দেরি হয়ে গেছে। বাইরে মাথা বের করে দেখি বাগানে ঢুকে পড়েছে সে।
আমার উদ্দেশ্যে হাত নাড়লো জিন-ফিলিক্স। “কি অবস্থা? তোমাকে বিরক্ত করলাম নাকি? কাজ করছিলে?”
“হ্যাঁ।”
“বাহ! করো করো। আর মাত্র ছয় সপ্তাহ আছে প্রদর্শনীর। একটু পিছিয়েই আছে কিন্তু,” বলেই ওর সেই বিরক্তিকর হাসিটা হাসলো। আমার চেহারায় নিশ্চয়ই বিরক্তির ছাপটা ফুটে উঠেছিল। “মজা করছি কিন্তু। তোমার কাজের তদারকি করতে আসিনি,” পরক্ষণেই তড়িঘড়ি করে যোগ করলো।
জবাবে কিছুই বললাম না আমি। আবারো স্টুডিওতে ফিরে গেলাম, সে-ও এলো আমার পিছুপিছু। একটা চেয়ার নিয়ে এসে ফ্যানের সামনে বসে সিগারেট ধরালো। বাতাসের কারণে পুরো ঘরেই ছড়িয়ে পড়লো গন্ধটা। আমি আবারো ইজেলের সামনে ফিরে গিয়ে তুলি তুলে নিলাম। একমনে কথা বলে চললো জিন-ফিলিক্স। লন্ডনের আবহাওয়া নিয়ে অভিযোগ করলে কিছুক্ষণ, বলল যে এখানকার পরিবেশের সাথে এরকম গরম যায় না। প্যারিস আর অন্যান্য অনেক শহরের সাথে যুক্তিহীন তুলনা করলো কতক্ষণ। আমি এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিচ্ছিলাম। জিন-ফিলিক্সের কথা শুনলে মনে হয় দুনিয়াতে হেন কোন বিষয় নেই যা সম্পর্কে জানে না সে। রীতিমত বিশেষজ্ঞ। সে বাদে অন্য সবার ধারণায় কোন না কোন গলদ আছে। আমাকে কখনো কিছু জিজ্ঞেস করে না, ঘ্যানঘ্যান করতেই থাকে। এতগুলো বছর ধরে একে অপরকে চিনি আমরা, তবুও আমি ওর কাছে একজন শ্রোতা বাদে কিছু না।
হয়তো আমি একটু বেশি বেশিই বলে ফেলছি। ও আমার সবচেয়ে পুরনো বন্ধুদের একজন-সবসময় বিপদে আপদে আমার পাশে থেকেছে। একটু একাকী, এই যা। কিন্তু আমিও তো ওর মতনই। আমার কাছে সবসময়ই মনে হয়েছে যে ভুল কারো সাথে সম্পর্কে জড়ানোর চাইতে একা থাকাই ভালো। সেজন্যেই গ্যাব্রিয়েলের আগে কারো সাথে সেরকম কোন সম্পর্কে জড়াইনি। একমনে অপেক্ষা করে গেছি ওর মত কারো জন্যে; যে আমাকে আমার সব ত্রুটি মেনে নিয়েও ভালোবাসবে। জিন-ফিলিক্স আমাদের সম্পর্কটা কখনোই ভালো চোখে দেখেনি। অবশ্য সামনাসামনি কিছু বলেনি কখনো, তবে আমি ঠিকই বুঝতে পারি। গ্যাব্রিয়েলকে পছন্দ করে না সে। সবসময় ওকে নিয়ে উল্টোপাল্টা মন্তব্য করে। আমার প্রতিভার সাথে গ্যাব্রিয়েলের প্রতিভার নাকি কোন তুলনাই চলে না, কতটা আত্মকেন্দ্রিক আমার স্বামী-এসব। জিন-ফিলিক্স হয়তো ভাবে যে এভাবে কানপড়া দিতে থাকলে তার কথা একসময় মেনে নেব আমি। কিন্তু সত্যটা হচ্ছে, ওর প্রতিটা বাজে মন্তব্য আমাকে আরো বেশি করে গ্যাব্রিয়েলের দিকে ঠেলে দেয়।
