এই অংশটুকু পড়ে সোজা হয়ে বসলাম। বিশ্বাসই হচ্ছে না। সমাপ্তির অংশটুকু আবারো পড়লাম।
পাতাললোক থেকে ফিরে আসে অ্যালসেস্টিস। কিন্তু এরপর আর কথা ফোটেনি তার মুখে। সেটা ইচ্ছেকৃত না অনিচ্ছাকৃত তাও স্পষ্ট নয়। মরিয়া হয়ে এক সময় হেরাকলসকে প্রশ্ন করে অ্যাডমেটাস : “আমার স্ত্রী কোন কথা বলছে না কেন?”
এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়নি। শেষ দৃশ্যে দেখা যায় নীরব অ্যালসেস্টিসকে ঘরে নিয়ে যাচ্ছে অ্যাডমেটাস।
কেন?
কেন কথা বলা থামিয়ে দেয় অ্যালসেস্টিস?
.
২.২২
অ্যালিসিয়া বেরেনসনের ডায়েরি
অগাস্ট ২
আজকে আরো বেশি গরম পড়েছে। লন্ডনের তাপমাত্রা অ্যাথেন্সকেও ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু অ্যাথেন্সে অন্তত সৈকত আছে একটা।
ক্যামব্রিজ থেকে পল ফোন দিয়েছিল আজকে। সত্যি বলতে এতদিন পর ওর কলটা পেয়ে একটু অবাকই হয়েছে। অনেকদিন হয়ে গেল কথা হয় না আমাদের। প্রথমেই যে ভাবনাটা মাথায় এসেছিল-লিডিয়া ফুপি নিশ্চয়ই মারা গেছে। অস্বীকার করার সুযোগ নেই, ভাবনাটা ক্ষণিকের জন্যে হলেও স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিয়েছিল আমার চিত্তে।
কিন্তু পল সেজন্যে কল দেয়নি। আসলে আমি এখনও জানি না যে তার ফোন দেয়ার উদ্দেশ্যটা কি ছিল। বারবার কথা পেঁচাচ্ছিল। আমি অপেক্ষা করছিলাম কখন দরকারের কথায় আসবে, কিন্তু ওরকম কিছুই বললই না শেষ পর্যন্ত। বারবার জিজ্ঞেস করছিল আমি ঠিক আছি কি না, গ্যাব্রিয়েলের চাকরি কেমন যাচ্ছে-এসব। এক ফাঁকে বিড়বিড় করে কিছুক্ষণ লিডিয়াকে গালমন্দও করেছে।
“তোদের সাথে দেখা করতে আসবো আমি,” বলেই ফেলি আলাপের এক পর্যায়ে। “যাবো যাবো করেও যাওয়া হচ্ছেনা অনেকদিন ধরে।”
সত্যটা হচ্ছে ওখানে আবার যাওয়ার কথা ভাবতেই নার্ভাস লাগে আমার। সেজন্যেই এতদিন যাইনি। কিন্তু না যাওয়ার কারণে তীব্র অনুশোচনা বোধও কাজ করে। বাড়িটা আমার জন্যে শাঁখের করাত।
“তোর সাথে অনেকদিন আলাপও হয় না।” পল আমতা আমতা করে যেন কি বলল জবাবে। “তাড়াতাড়িই আসবো দেখি। আচ্ছা, আমি একটু বাইরে যাবো-”
আবারো নিচুস্বরে কিছু একটা বলল পল।
“কি বললি? বুঝিনি। আবার বল।”
“বললাম আমি খুব বড় বিপদে পড়েছি, অ্যালিসিয়া। তোর সাহায্য লাগবে।”
“কি হয়েছে?”
“ফোনে বলা যাবে না। দেখা করতে হবে।”
“ইয়ে, মানে আমি তো এখন ক্যামব্রিজ আসতে পারবো না।”
“আমি আসছি তোর ঐখানে। আজ বিকালে?”
পলের কন্ঠে এমন কিছু একটা ছিল যে দ্বিতীয়বার কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেলাম। বড় মরিয়া শোনাচ্ছিল।
“ঠিক আছে। এখন কি কোনভাবেই বলা সম্ভব না?”
বিকেলে দেখা হচ্ছে,” লাইন কেটে দেয় পল।
বাকিটা দিন পল কি বলতে পারে সেটা নিয়ে ভেবেই কাটিয়েছি। কি এমন হতে পারে যেটা ফোনে বলা যাবে না? লিডিয়া সম্পর্কে কিছু বলবে? নাকি বাড়িটা সম্পর্কে? বুঝতেই পারছিলাম না।
লাঞ্চের পর আর কোন কাজ করা সম্ভব হয়না আমার পক্ষে। মুখে গরমকে দোষ দিলেও আসলে কোন কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। একটু পরপর রান্নঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছিলাম, একসময় পলকে দেখতে পাই রাস্তায়।
“হাই, অ্যালিসিয়া,” হাত নেড়ে বলে ও।
ওর চেহারাটাই প্রথম ধাক্কা দেয় আমাকে। শুকিয়ে গেছে ভীষণ, গোলগাল মুখটা চেনাই যায় না প্রায়। চোয়ালও ভেতরে ঢুকে গেছে। চোখেমুখে সদা সন্ত্রস্ত একটা ভাব।
পোর্টেবল ফ্যানটা চালিয়ে রান্নাঘরের টেবিলেই বসি আমরা। বিয়ার দেব কি না জিজ্ঞেস করলে বলে যে আরো কড়া কিছুর প্রয়োজন। একটু অবাক হই কারণ আগে ওকে সেভাবে কখনো ড্রিঙ্ক করতে দেখিনি। একটা গ্লাসে অল্প একটু হুইস্কি ঢেলে এগিয়ে দিলাম। আমি অন্য দিকে তাকাতেই সেটা এক নিমেষে মুখে চালান করে দিয়ে আবারো গ্লাসটা ভরে নিল পল।
প্রথম কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম দুজনই। এরপর ফোনে যা বলেছিল সেটারই পনুরাবৃত্তি করলো সে :
“খুব বড় বিপদে পড়েছি।”
খুলে বলতে বললাম ওকে। বিপদটা কি বাড়ি নিয়ে?
শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় পল। বাড়ি নিয়ে কোন সমস্যা হয়নি।
“তাহলে?”
“আমি বিপদে পড়েছি।” এরপর মাথা নেড়ে দ্বিধা ঝেড়ে আসল কথাটা বলল। “জুয়া খেলা নিয়ে সমস্যা।”
গত কয়েক বছর ধরেই নিয়মিত জুয়া খেলে পল। প্রথম দিকে বাড়ির বাইরে সময় কাটানোর ছুতোয় জুয়ার আড্ডায় যেত। তাকে ঠিক দোষারোপও করা যাবে না, কে চাইবে লিডিয়ার সাথে এক ছাদের নিচে থাকতে? কিন্তু ওর জুয়া ভাগ্য ভাল না। জেতার চেয়ে হারেই বেশি। গত কয়েক মাস ক্রমাগত হেরেই চলেছে। পারিবারিক সেভিংস অ্যাকাউন্টের টাকার দিকে হাত বাড়ায় এক পর্যায়ে। তবে সেখানে এমনিতেও খুব বেশি টাকা ছিল না।
“কত লাগবে তোর?”
“বিশ হাজার।”
নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। “বিশ হাজার পাউন্ড হেরেছিস?”
“একবারে না। কয়েকজনের কাছ থেকে কিছু ধারও করেছিলাম। ওরা টাকা ফেরত চাইছে এখন।”
“কাদের কাছ থেকে নিয়েছিলি?”
“শুধু জেনে রাখ, টাকা দিতে না পারলে আমাকে আর না-ও দেখতে পারিস।”
“তোর মা-কে বলেছিস?” উত্তরটা জানাই ছিল, তাও জিজ্ঞেস করলাম। পল এতটাও বোকা না।
“না! পাগল নাকি তুই? মেরেই ফেলবে আমাকে। তোর সাহায্য দরকার অ্যালিসিয়া, সেজন্যেই এসেছি। মুখ ফিরিয়ে নিস না।”
“আমার কাছে এত টাকা নেই, পল।”
