টোপটা গিলল জিন-ফিলিক্স। “ওহ, এটার ব্যাপারেও জানেন আপনি? হ্যাঁ, বলবে না কেন।”
“তার বাবার মৃত্যুর পর?”
“একদম ভেঙে পড়েছিল বেচারি,” মাথা নাড়লো জিন-ফিলিক্স। “সত্যটা অস্বীকার করে লাভ নাই, অ্যালিসিয়ার মানসিক অবস্থা কখনোই অতটা ভালো ছিল না। একটুতেই ভেঙে পড়তো। ওর বাবা যখন আত্মহত্যা করলো, আর সহ্য করতে পারেনি।”
“খুব বেশি ভালোবাসতো নিশ্চয়ই তাকে।”
কাষ্ঠ হাসি ফুটলো জিন-ফিলিক্সের মুখে। এমন ভঙ্গিতে তাকালো আমার দিকে যেন পাগলের প্রলাপ বকছি। “কী বলছেন এসব?”
“মানে?”
“অ্যালিসিয়া তাকে ভালোবাসতো না, ঘৃণা করতো। প্রচণ্ড ঘৃণা।”
এরকম কিছু শুনবো একদমই আশা করিনি। “অ্যালিসিয়া এমনটা বলেছিল আপনাকে?”
“হ্যা! ওর মা মারা যাবার পর থেকেই বাবার সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে ওর।”
“তাহলে তার মৃত্যুর পর আত্মহত্যার চেষ্টা করলো কেন? যদি তার জন্যে খারাপই না লেগে থাকে, কষ্ট না পায়…”
কাঁধ ঝাঁকালো জিন-ফিলিক্স। “অনুশোচনা থেকে করতে পারে। কে জানে কেন?”
কিছু একটা লুকোচ্ছে সে। হিসেব মিলছে না।
এসময় ফোন বেজে উঠলো। “এক মিনিট,” বলে ফোনটা বের করে কানে চাপালো গ্যালারিস্ট। ওপাশ থেকে একটা মহিলাকণ্ঠ শুনতে পেলাম। কিছুক্ষণ কথা বলে দেখা করার জন্যে সময় ঠিক করলো দু’জনে। “আমি ওখানে গিয়ে ফোন দেব তাহলে, ডার্লিং,” ফোন কেটে দিল জিন-ফিলিক্স। “দুঃখিত,” পরমুহূর্তে আমার দিকে তাকিয়ে বলল।
“সমস্যা নেই। আপনার গার্লফ্রেন্ড?”
“না,” হাসি ফুটলো তার মুখে। “বন্ধু…অনেক বন্ধু আছে আমার।”
তা তো থাকবেই, মনে মনে বললাম। কেন যেন এখন আর তাকে আমার পছন্দ হচ্ছে না।
বিদায় নেয়ার আগ মুহূর্তে শেষ প্রশ্নটা করলাম। “আরেকটা ব্যাপার, অ্যালিসিয়া কি কখনো কোন ডাক্তারকে নিয়ে কিছু বলেছিল আপনাকে?”
“ডাক্তার?”
“আত্মহত্যার চেষ্টা করার পর একজন ডাক্তার দেখায় সে। তার খোঁজ বের করার চেষ্টা করছি।”
“হুম,” ভ্রু কুঁচকে বলে জিন-ফিলিক্স। “কার কথা যেন শুনেছিলাম…”
“নামটা মনে আছে?”
এক মুহূর্ত ভেবে মাথা ঝাঁকিয়ে না করে দিল সে। “দুঃখিত, মনে পড়ছে না।”
“ঠিক আছে। যদি মনে পড়ে, তাহলে আমাকে দয়া করা জানাবেন।”
“নিশ্চয়ই, তবে সে আশা কম।” দ্বিধা ফুটলো জিন-ফিলিক্সের চেহারায়। যেন কিছু একটা বলবে কি না ভাবছে। “আপনাকে একটা পরামর্শ দেই?”
“নিশ্চয়ই।”
“যদি অ্যালিসিয়াকে কথা বলাতে চান…তাহলে তার হাতে তুলি আর রঙ তুলে দিন। ছবি আঁকতে দিবেন ওকে। এভাবেই ও কথা বলবে আপনাদের সাথে। ছবির মাধ্যমে।”
“চমৎকার একটা বুদ্ধি দিয়েছেন…অনেক সাহায্য করলেন আজকে, ধন্যবাদ মি. মার্টিন।”
“জিন-ফিলিক্স বলে ডাকবেন আমাকে। আর অ্যালিসিয়ার সাথে দেখা হলে তাকে আমার তরফ থেকে হ্যালো বলবেন।”
হাসলো লোকটা, সেই বিতৃষ্ণার অনুভূতিটা ফিরে এসেছে আবারও। এটা নিশ্চিত যে অ্যালিসিয়ার ঘনিষ্ঠ ছিল সে, লম্বা একটা সময় ধরে একে অপরকে চিনতো।
জিন-ফিলিক্স কি আসলে অ্যালিসিয়াকে গোপনে ভালোবাসে?
এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। অ্যালসেস্টিস ছবিটার দিকে যখন তাকিয়ে ছিল, তখন চোখে ভালোবাসার খেলা করতে দেখেছি। কিন্তু সেই ভালোবাসাটা পেইন্টিংয়ের জন্যে, শিল্পীর জন্যে নয়। জিন-ফিলিক্স একজন প্রকৃত শিল্পপ্রেমী। যদি অ্যালিসিয়াকে আসলেও ভালোবাসতো, তাহলে কখনো না কখনো গ্রোভে আসতোই।
অ্যালিসিয়ার মত কাউকে ভালোবাসলে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।
২.২১ এক কপি অ্যালসেস্টিস
২.২১
আসার পথে ওয়াটারস্টোনস থেকে এক কপি অ্যালসেস্টিস কিনলাম। ভূমিকায় লেখা যে এটা ইউরিপিডেসের প্রথম দিককার কাজ। ট্র্যাজেডি হিসেবে অতটা বিখ্যাত নয়।
মেট্রোরেলে বসেই পড়া শুরু করে দিলাম বইটা। আর যা-ই হোক, টানটান উত্তেজনার-এটা বলা যাবে না। একটু অদ্ভুতও বটে। গল্পের নায়ক অ্যাডমেতাসের মাথার ওপর মৃত্যু পরোয়ানা ঝুলছে। তবে অ্যাপোলো তিন ভাগ্যদেবীকে কথার প্যাঁচে ফেলে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার একটা উপায় বাতলে দেয় তাকে। সেজন্যে তার স্থানে স্বেচ্ছায় মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণের জন্যে রাজি করাতে হবে কাউকে।
অ্যাডমেতাস তার বাবা আর মাকে বলে তার হয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে, কিন্তু তাদের কেউই রাজি হয় না। অ্যাডমেতাস চরিত্রটা নিয়ে খুব বেশি কিছু বলার নেই। গতানুগতিক ট্র্যাজেডির নায়কদের চেয়ে একদম ভিন্ন। গ্রিকরা নিশ্চয়ই তাকে কাপুরুষ বলেই গণ্য করতো। এর চেয়ে অ্যালসেস্টিস অনেক সাহসী একটা চরিত্র। সবকিছু শোনার পর স্বামীর জায়গায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিতে রাজি হয় সে। হয়তো ভেবেছিল অ্যাডমেতাস তার প্রস্তাবে রাজি হবে না, কিন্তু রাজি হয় যায় আমাদের ‘নায়ক’। মারা যাবার পর পাতাললোকে উদ্দেশ্যে রওনা হয় অ্যালসেস্টিস। হেডিসের রাজত্ব সেখানে।
গল্প কিন্তু এখানেই শেষ হয় না। বলা যায় শেষে মোটামুটি শুভ সমাপ্তিই অপেক্ষা করছে। জিউসের পুত্র বীর হেরাকলস হেডিসের কাছ থেকে ছিনিয়ে মতলোকে ফিরিয়ে আনে অ্যালসেস্টিসকে। আবারো বেঁচে ওঠে সে। স্ত্রীকে ফিরে পেয়ে পানি ঝরতে থাকে অ্যাডমেতাসের চোখ থেকে। কিন্তু অ্যালসেস্টিসের মনে কি চলছিল সেটা পরিস্কার হয় না। কারণ মতলোকে ফেরার পরে একবারের জন্যেও মুখ খোলেনি সে।
