মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম ছবিটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে অ্যালিসিয়ার আঁকা। দূর থেকে মনে হতে পারে ক্যামেরায় তোলা ছবি বড় করে ফেমে বাঁধানো হয়েছে। ছবিটায় অ্যালিসিয়ার মা’র গাড়ি দুর্ঘটনার দৃশ্যটা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গাড়ির ধ্বংসস্তূপের মাঝে স্টিয়ারিং হুইল ধরে নিশ্চল বসে আছে এক মহিলা, মৃত। আর গাড়ির ঠিক ওপরে তার আত্মাটা দেহ থেকে বেরিয়ে স্বর্গের পানে ছুটে যাচ্ছে। পিঠের সাথে দুটো পাখাও জুড়ে দিয়েছে অ্যালিসিয়া।
“চমৎকার না ছবিটা?” সমীহ মাখা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো জিন ফিলিক্স। “এই হলুদ, লাল আর সবুজের মাঝে হারিয়ে যাই মাঝে মাঝে। ইচ্ছে হলেই বের করে দেখি। অসাধারণ একটা দৃশ্য।”
দৃশ্যটা আর যা-ই হোক অসাধারণ নয়, আমার তো অস্বস্তিবোধ হচ্ছে।
পরবর্তী ছবিটা আমাকে দেখালো জিন-ফিলিক্স। ক্রসবিদ্ধ জিশুর একটা পেইন্টিং। জিশু নাকি…?
“এটা গ্যাব্রিয়েল,” আমার অব্যক্ত প্রশ্নটার জবাব দিয়ে দিল গ্যালারিস্ট।
আসলেও জিশুর বেশে গ্যাব্রিয়েলের ছবি এঁকেছে অ্যালিসিয়া। ক্ষতস্থান থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরছে। মাথায় কাঁটার মুকুট। তবে একটাই পার্থক্য, ছবিতে মাথা নিচু করে নেই গ্যাব্রিয়েল। বরং তার চোখের দৃষ্টিতে খেলা করছে ঔদ্ধত্য। ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো আমার। সামনে এগিয়ে আরো ভালো করে খেয়াল করলাম ছবিটা। গ্যাব্রিয়েলের কাঁধ থেকে কি যেন ঝুলছে! একটা রাইফেল।
“এই বন্দুকের গুলিতেই তো মারা গেছে সে?”
মাথা নাড়লো জিন-ফিলিক্স। “হ্যাঁ, খুব সম্ভবত তারই বন্দুকটা।”
“ছবিটা হত্যাকাণ্ডের আগে আঁকা হয়েছে না?”
একমাস আগে। অ্যালিসিয়ার মনে কি চলছিল সেটা বোঝা যাচ্ছে, তাই না?” বলে তৃতীয় ছবিটা বের করতে লাগলো সে। এটার ক্যানভাস আগের দুটোর চেয়ে বড়। আমার সবচেয়ে পছন্দের ছবি। একটু পিছিয়ে ভালো করে দেখুন।”
তার কথামত পিছিয়ে গেলাম কয়েক কদম। ছবিটা দেখার সাথে সাথে একটা হাসি ফুটলো মুখে।
অ্যালিসিয়ার ফুপি, লিডিয়া রোজের পেইন্টিং এটা! কেন রাগ করেছিল সে, এটা পরিস্কার বুঝতে পারছি এখন। ছবিটায় নগ্ন দেহে ছোট্ট একটা বিছানায় শুয়ে আছে সে। তার ভারে বেঁকে গিয়েছে পায়াগুলো। অস্বাভাবিক মোটা করে আঁকা হয়েছে তাকে, মনের সব ক্ষোভ ঢেলে। চামড়ার ভাঁজ বিছানা ছেড়ে মেঝে ছুঁইছুঁই করছে।
“ঈশ্বর! এটা কি করেছে!”
“আমার কাছে তো চমৎকার লেগেছে।” চোখে আগ্রহ নিয়ে আমাকে দেখছে জিন-ফিলিক্স। “লিডিয়াকে চেনেন আপনি?”
“হ্যাঁ, দেখা করতে গিয়েছিলাম তার সাথে।”
“আচ্ছা।” মুখে হাসি ফুটলো গ্যালারিস্টের। “বেশ ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন তাহলে গত কয়েকদিন। আমি অবশ্য কখনো লিডিয়াকে দেখিনি। অ্যালিসিয়া সহ্য করতে পারতো না মহিলাকে।”
“হ্যাঁ,” ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললাম। “সেটা দেখতেই পাচ্ছি।”
ছবিগুলো কাপড়ে মুড়িয়ে আগের জায়গায় রেখে দিল জিন-ফিলিক্স।
“আর অ্যালসেস্টিস?” বললাম। “ওটা দেখাবেন না?”
“অবশ্যই, আসুন।”
সরু হলওয়ে ধরে হেঁটে গ্যালারির শেষমাথায় চলে এলাম আমরা। এখানে একটা দেয়াল শুধু অ্যালসেস্টিসের জন্যেই বরাদ্দ। আগেরবারের মতনই আমাকে মুগ্ধ করলো পেইন্টিংটা। আগাগোড়া শিল্প আর রহস্যে মোড়া। স্টুডিওতে ইজেলের সামনে নগ্ন দেহে দাঁড়িয়ে আছে অ্যালিসিয়া, পেইন্ট ব্রাশ থেকে টপটপ করে ঝরছে রক্ত। তবে এবারেও তার চেহারার অভিব্যক্তিটা ধরতে পারলাম না। ভ্রু কুঁচকে গেল আপনা থেকেই।
“তার মনে কি চলছে সেটা বোঝা যায় না ছবিটা দেখে।”
“পেইন্টিংটার উদ্দেশ্য তো সেটাই-অ্যালিসিয়া চাচ্ছে না কেউ তাকে বুঝুক। এক অর্থে তার মৌনতাই ফুটে উঠেছে চেহারার শূন্য অভিব্যক্তির মাধ্যমে।”
“বুঝলাম না।”
“সব শিল্পের কেন্দ্রেই একটা রহস্য থাকে। অ্যালিসিয়ার নীরবতাই হচ্ছে তার সেই রহস্য। সেজন্যেই তো ছবিটার নাম দিয়েছে অ্যালসেস্টিস। ইউরিপিডেসের লেখাটা পড়েছেন নাকি?” কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো জিন-ফিলিক্স। “না পড়লে পড়ে ফেলুন। তাহলে আরো ভালো করে বুঝতে পারবেন।”
মাথা নাড়লাম। তবে এবারে ছবিটায় নতুন একটা জিনিস চোখে পড়লো যেটা গতবার খেয়াল করিনি। ইজেলের পেছনে টেবিলের ওপরে একটা ফলের বাটি রাখা-কিছু আপেল আর নাশপাতি শোভা পাচ্ছে সেখানে। তবে লাল আপেলগুলোর গায়ে সাদা সাদা কী যেন কিলবিল করছে।
“এগুলো কি?”
“পোকা?” মাথা নাড়লো জিন-ফেলিক্স। “হা।”
“বাহ, এগুলো এখানে আঁকার নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে।”
“এই পেইন্টিংটা একটা মাস্টারপিস। তারিফ করলেও কম হয়ে যাবে।”দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ছবিটার দিকে হাত দিয়ে দেখালো জিন-ফিলিক্স। “ওকে যদি তখন চিনতেন আপনি! একদম অন্যরকম একটা মেয়ে। চিন্তাধারাও ভিন্ন। অন্যেরা যেখানে জীবনে পৌনঃপুনিকতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, সেখানে ওর মাথায় নিত্যনতুন আইডিয়া খেলা করতে সবসময়। প্রকৃত অর্থে বেঁচে থাকা যাকে বলে।” তার চোখ এখন অ্যালিসিয়ার নগ্ন দেহের দিকে। “এত সুন্দর।”
আমিও তাকালাম তার দৃষ্টি অনুসরণ করে। কিন্তু সে যেখানে সৌন্দর্য দেখতে পাচ্ছে, আমার চোখে ধরা পড়ছে বেদনা। আর সেগুলোর জন্যে অ্যালিসিয়া নিজেই দায়ি।
“ও কি কখনো আত্মহত্যার চেষ্টার ব্যাপারটা নিয়ে আপনার সাথে কথা বলেছে?”
