এসময় হঠাই এক ধরণের অস্বস্তিতে ছেয়ে উঠলো মন। যেন কেউ নজর রাখছে আমার ওপর।
বাড়িটার দিকে তাকাতেই ওপরতলার জানালায় একটা মুখ দেখতে পেলাম। বয়স্ক, কুৎসিত এক মহিলার মুখ। কাঁচে নাক ঠেকিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। অস্বস্তির জায়গায় আতংক ভর করলো এবারে।
শেষ মুহূর্তের আগে বুঝলামই না যে আমার পেছনে কেউ একজন উপস্থিত হয়েছে। মাথার পেছনে তীব্র ব্যথা অনুভব করলাম পরপরই।
অন্ধকার হয়ে গেল চারপাশ।
২.১৬ জ্ঞান ফিরলো আমার
২.১৬
শক্ত, ঠাণ্ডা মেঝেতে জ্ঞান ফিরলো আমার। মাথার পেছনে দপদপ করছে, যেন কেউ ধারালো ছুরির ফলা বিধিয়ে দিয়েছে সেখানে। হাত বুলালাম জায়গাটায়।
“রক্ত বের হয়নি,” একটা কণ্ঠস্বর বলে উঠলো পাশ থেকে। কিন্তু ফুলে যাবে। মাথা ব্যথাও থাকবে কয়েকদিন।”
উপরে তাকাতেই পল রোজের কৌতূহলী চেহারাটা দেখতে পেলাম। একটা বেজবল ব্যাট হাতে নিয়ে উবু হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। বয়সে আমার কাছাকাছি হলেও, অনেক বেশি লম্বা-চওড়া। চেহারাটা অবশ্য কিশোরসুলভ। মাথাভর্তি লাল চুল, অ্যালিসিয়ার মতন। হুইস্কির গন্ধ আসছে লোকটার গা থেকে।
উঠে বসার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না।
“কিছুক্ষণ শুয়ে থাকুন।”
“কনকাশন, মানে মাথায় আঘাতের জন্য সাময়িক স্মৃতিবিভ্রমের মতো জটিলতা হতে পারে।”
“হ্যাঁ।”
“আপনার মাথায় সমস্যা নাকি? এভাবে ব্যাট দিয়ে বাড়ি দিলেন কেন?”
“আমি ভেবেছিলাম চুরি করতে এসেছেন।”
“আমি চোর না।”
“সেটা জানি এখন। আপনার ওয়ালেটের পরিচয়পত্র দেখেছি। আপনি একজন সাইকোথেরাপিস্ট।”
পেছনে পকেটে হাত দিয়ে আমার ওয়ালেটটা বের করে আনলো সে। পরক্ষণেই আমার দিকে ছুঁড়ে দিল। বুকের ওপর এসে পড়ে জিনিসটা। দেখে নেই সব ঠিকঠাক আছে কি না।
“আপনি তো গ্রোভে চাকরি করেন।”
সামান্য নড়াচড়াতেই মাথার ভেতরে ব্যথার বিস্ফোরন ঘটলো। “হ্যাঁ।”
“তাহলে নিশ্চয়ই জানেন আমি কে?”
“অ্যালিসিয়ার ফুপাতো ভাই?”
“পল রোজ।” হাত বাড়িয়ে দিল লোকটা। “দেখি, আস্তে আস্তে এবারে ওঠার চেষ্টা করুন।”
পলের হাত ধরে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। গায়ে বেশ শক্তি ধরে সে। দাঁড়িয়ে থাকতে অবশ্য কষ্ট হচ্ছে। আরেকটু হলে মেরেই ফেলতেন আমাকে,” বিড়বিড় করে বললাম।
“যদি আপনার কাছে বন্দুক থাকতো? যা দিনকাল! তাছাড়া বিনা অনুমতিতে ভেতরে ঢুকেছেন আপনি। কি আশা করছিলেন? ফুলের মালা নিয়ে স্বাগত জানাবো?”
“আপনার সাথেই দেখা করতে এসেছিলাম ভাই,” ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে বললাম। “এখন তো মনে হচ্ছে না এলেই ভালো হতো।”
“ভেতরে এসে বসুন।”
এ মুহূর্তে তাকে অনুসরণ করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই আমার কাছে। ব্যথাটা বেড়েই চলেছে। পেছনের দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরে পা দিলাম আমরা।
বাইরের মতনই ভেতরের অবস্থাও শোচনীয়। রান্নাঘরের দেয়ালের কমলা জ্যামিতিক নকশা দেখে মনে হচ্ছে কম করে হলেও চল্লিশ বছরের পুরনো। ওয়ালপেপার খুলে খুলে আসছে, কিছু জায়গায় একদম কালো হয়ে গেছে। আনাচে কানাচে ঝুল আর মাকড়সার জাল। মেঝেতে ধূলোর পুরু স্তর দেখে কার্পেট বলে ভুল হতে পারে। আর ঘরময় বিড়ালের প্রস্রাবের গন্ধ। এক রান্নাঘরেই পাঁচটা বিড়াল শুয়ে বসে আছে। বাম দিকের কোণায় অনেকগুলো বিড়ালের খাবারের পুরনো টিন ফেলে রাখা হয়েছে, সেগুলো থেকেও গন্ধ ছুটেছে। ভীষণ অস্বাস্থ্যকর একটা পরিবেশ।
“বসুন, আমি চা বানাচ্ছি,” বলে বেসবল ব্যাটটা দরজার পাশে দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখলো পল। ওটার দিক থেকে চোখ সরাতে পারছি না। লোকটাকে আশপাশে এখনও নিরাপদ লাগছে না নিজেকে।
কিছুক্ষণ পর এক ভাঙা মগ ভর্তি চা আমার হাতে দিল পল। “খেয়ে ফেলুন।”
“পেইনকিলার হবে কি?”
“অ্যাসপিরিন আছে বোধহয়, খুঁজে দেখি দাঁড়ান। এটা মিশিয়ে দেই,” একটা হুইস্কির বোতল আমাকে দেখালো সে। “চাঙ্গা লাগবে তাহলে।”
আমি কিছু বলার আগেই মগের মধ্যে কিছুটা হুইস্কি ঢেলে দিল পল। চুমুক দিলাম। বেশ কড়া ঠেকছে স্বাদটা, মিষ্টিও পরিমাণমতো। পল নিজেও চায়ের কাপে চুমুক দিল। কিছুক্ষণ কেউ কিছু বললাম না। নীরবে আমাকে দেখছে সে। লোকটার তাকানোর ভঙ্গির সাথে অ্যালিসিয়ার তাকানোর ভঙ্গির মিল আছে।
“কেমন আছে ও?” কিছু সময় পর জিজ্ঞেস করলো পল। “অনেক দিন দেখা হয়নি আমাদের। মা’কে এখানে রেখে বেরুতেই পারি না,” আমি জবাব দেয়ার আগেই বলল।
“ওহ আচ্ছা। অ্যালিসিয়ার সাথে শেষ কবে দেখা হয়েছিল আপনার?”
“বেশ কয়েক বছর আগে। আসলে কোন যোগাযোগই নেই আমাদের। ওর বিয়েতে গিয়েছিলাম, এর পরে বড়জোর এক কি দু’বার দেখা হয়েছে। গ্যাব্রিয়েল আসলে পছন্দ করতো না ব্যাপারটা। অ্যালিসিয়াও বিয়ের পর থেকে ফোন দেয়া কমিয়ে দেয়, কখনো দেখা করতে আসতো না। সত্যি বলতে মা অনেক কষ্ট পেয়েছে তার এই আচরণে।”
আমি কিছু বললাম না। মাথার প্রচণ্ড ব্যথার কারণে ঠিকমতো কিছু ভাবতেই পারছি না। তবে টের পাচ্ছি যে আমাকে খেয়াল করছে সে।
“আমার সাথে দেখা করতে আসলেন যে?”।
“কিছু প্রশ্ন ছিল অ্যালিসিয়ার ব্যাপারে…মানে তার শৈশব নিয়ে।”
মাথা নেড়ে মগে কিছু হুইস্কি ঢেলে নিল পল। চেহারায় আর আগের বিচলতা নেই; আমি নিজেও হুইস্কির প্রভাব টের পাচ্ছি। ব্যথার তীব্রতা কমে গেছে অনেকাংশে, বোধশক্তিও ফিরে আসছে। যা করতে এসেছো করো, নিজেকে বোঝালাম। এরপর যত দ্রুত সম্ভব বেরিয়ে যাও এখান থেকে।
