“আপনারা তো একসাথে বড় হয়েছেন?”
মাথা নেড়ে সায় দিল পল। “বাবা মারা যাবার পর এখানে এসে উঠেছিলাম আমি আর মা। তখন আট কি নয় বছর বয়স ছিল আমার। প্রথমে ভেবেছিলাম কয়েকদিন থেকেই চলে যাবো। কিন্তু কিছুদিন পরই অ্যালিসিয়ার মা মারা যায় দুর্ঘটনায়। তাই মা থেকে যায় অ্যালিসিয়া আর ভার্নন মামার দেখভাল করার জন্যে।”
“ভার্নন বোজ-অ্যালিসিয়ার বাবা?”
“হ্যাঁ।”
“মি. ভার্নন এখানেই কয়েক বছর আগে মারা গেছেন?”
“হ্যাঁ,” ভ্রূ কুঁচকে গেল পলের। “আত্মহত্যা করেছিলেন আসলে। ওপরতলার চিলেকোঠায়। আমিই প্রথম দেখতে পাই লাশটা।”
“দুঃখজনক।”
“হ্যাঁ। অ্যালিসিয়া পুরো ভেঙে পড়েছিল। সেবারই ওর সাথে শেষ দেখা হয় আমার। ভার্নন মামর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে। খুব খারাপ অবস্থা ছিল বেচারির।” উঠে দাঁড়ায় পল। “আরেকটু হুইস্কি নিবেন নাকি?”
আমি মানা করার আগেই কথা বলতে বলতে মগে হুইস্কি ঢেলে দিল সে। “আমার কিন্তু কখনো বিশ্বাস হয়নি যে গ্যাব্রিয়েলকে অ্যালিসিয়া খুন করেছে। এরকমটা হবার কোন কারণই নেই।”
“কেন?”
“কারণ অ্যালিসিয়ার স্বভাবের সাথে ব্যাপারটা যায় না। একটা পোকার গায়েও হাত তোলেনি ও কখনো।”
কিন্তু এখন সে বদলে গেছে, মনে মনে ভাবলেও মুখে কিছু বললাম না।
হুইস্কিতে চুমুক দিল পল। “এখনও মুখ খোলেনি ও?”
“না”
“এই ব্যাপারটাও আমার মাথায় ঢোকেনা, বুঝলেন। আমার তো মনে হয়-”
সে কথা শেষ করার আগেই ওপরতলা থেকে একটা অস্ফুট শব্দ ভেসে এলো। চাপা গলায় কেউ কথা বলছে, আমি বুঝতে পারলাম না কিছুই।
লাফিয়ে উঠে পড়লো পল। “এক সেকেন্ড,” বলে দ্রুত সিঁড়ির নিচে গিয়ে দাঁড়ালো। “সব ঠিক আছে তো, মা?”
আবারো দুর্বোধ্য কিছু কথা ভেসে এলো ওপর থেকে।
“কি? ওহ আচ্ছা। এক-এক মিনিট।” পলের গলায় অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট।
হলওয়ের অপর পাশ থেকে ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লো সে। “মা আপনার সাথে দেখা করতে চাইছে।”
.
২.১৭
কাঁপা কাঁপা পদক্ষেপে পলকে অনুসরণ করে ধুলোমাখা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলাম।
সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল লিডিয়া রোজ। জানালায় কিছুক্ষণ আগে তার মুখই দেখেছিলাম। মাথার লম্বা সাদা চুলগুলো দেখে মনে হচ্ছে দীর্ঘদিন চিরুনির স্পর্শ পায়নি। মাত্রাতিরিক্ত ওজনের কারণে নড়তে চড়তে কষ্ট হয়। হাত-পাগুলো গাছের গুঁড়ির মতন পুরু, কাঁধ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি চওড়া। এ মুহূর্তে একটা হাঁটার লাঠির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার ওজনের ভারে প্রায় বেঁকে গিয়েছে জিনিসটা, যে কোন সময় ভেঙে যেতে পারে।
“কে এই ছোকরা? কে?”
ক্ষনক্ষনে গলায় প্রশ্নটা পলের উদ্দেশ্যে করলেও তার দৃষ্টি আমার দিকে। এক মুহূর্তের জন্যে চোখ সরাচ্ছে না। আবারো অ্যালিসিয়ার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সাথে তার দৃষ্টির মিল খুঁজে পেলাম আমি।
“উত্তেজিত হবার কিছু নেই, মা,” নিচু গলার বলল পল। “ইনি অ্যালিসিয়ার থেরাপিস্ট। হাসপাতাল থেকে এসেছে আমার সাথে কথা বলতে।”
“তোর সাথে? তোর সাথে কেন কথা বলতে চায়? কি করেছিস তুই
“অ্যালিসিয়ার ব্যাপারে খোঁজ খবর নিচ্ছিলেন।”
“তোর মাথায় কি ঘিলু নেই? একটা সাংবাদিককে ঘরে ঢুকতে দিলি?” এখন প্রায় চিৎকার করছে লিডিয়া। “এখনই ঘাড় ধরে বের করে দে।”
“আরে সাংবাদিক না, বললাম তো। আইডি দেখেছি আমি। এখন। কোন হৈচৈ কোরো না। চলো, ভেতরে চলো। শুয়ে থাকো।”
গজগজ করতে করতে বেডরুমে ফিরে গেল মিসেস রোজ। ইশারায় আমাকে অনুসরণ করতে বলল পল।
কারো বিছানায় উঠতে এতটা শব্দ হতে পারে, এটা আগে ভাবিনি। ওজনের ভারে দেবে গেছে ম্যাট্রেস। পল তার বালিশগুলো ঠিক করে দিল। একটা বয়স্ক বিড়াল গা এলিয়ে শুয়ে আছে লিডিয়ার পায়ের কাছে। এরকম কুৎসিত বিড়াল আগে দেখিনি। পুরো শরীর জুড়ে নানারকম ক্ষত, কিছু জায়গায় লোম উঠে গেছে, এক কান নেই। ঘুমের ভেতরেও গড়গড় করছে।
রুমটায় নজর বুলালাম একবার। পরননা, বাতিল জিনিসপত্রে ঠাসা। হলুদ হয়ে আসা খবরের কাগজ, পুরনো কাপড়ের টিবি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঘরময়। একটা অক্সিজেন ক্যানিস্টার ঠেস দিয়ে রাখা দেয়ালের সাথে। বেডসাইড টেবিলের ওপর নানারকম ঔষধ ভর্তি বড়সড় ডিব্বা।
গোটা সময় লিডিয়ার অগ্নিদৃষ্টি অনুসরণ করলো আমাকে। অবশ্য অগ্নিদৃষ্টি না বলে উন্মাদ দৃষ্টিও বলা যায়।
“কি চায় এই ছোকরা?” আমাকে আবারো আপাদমস্তক দেখলো সে। “কে ও?”
“কেবলই তো বললাম, মা। অ্যালিসিয়ার ব্যাপারে কথা বলতে এসেছে। ওর চিকিৎসার জন্যে জরুরি ব্যাপারটা। থিও একজন সাইকোথেরাপিস্ট।”
‘সাইকোথেরাপিস্ট’ শব্দটা যে লিডিয়ার বিশেষ পছন্দ নয়, সেটা কাউকে বলে দিতে হলো না। গলা খাকারি দিয়ে ঠিক আমার পায়ের সামনে একদলা থুতু ফেললো সে।
“মা, প্লিজ-” গুঙিয়ে উঠলো পল।
“তুই চোপ!” বলে আমার দিকে চোখ গরম করে তাকালো লিডিয়া। “অ্যালিসিয়া হাসপাতালে কেন?”
“হাসপাতালে থাকবে না তো কোথায় থাকবে?”
“কোথায় আবার? জেলে,” লিডিয়ার ক্রুব্ধ দৃষ্টির তেজ একটুও ম্লান হয় না। “অ্যালিসিয়ার ব্যাপারে জানতে চাও? বলছি আমি। আস্ত হারামী একটা মেয়ে। ছোট থেকেই স্বভাব-চরিত্র খারাপ।”
চুপচাপ শুনছি। মাথাব্যথাটা এখনও কমেনি। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে লিডিয়ার রাগ বেড়েই চলেছে।
