“তোমার সমস্যাটা কি?”
“সমস্যা?”
“সাধু সাজার চেষ্টা করবে না। আমাকে সকালে কে ফোন দিয়েছিল জানো? ম্যাক্স বেরেসন। তুমি নাকি দুবার তার সাথে যোগাযোগ করে উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করেছো?”
“অ্যালিসিয়ার ব্যাপারে কিছু কথা জানার ছিল। তখন তো বিরক্ত মনে হয়নি তাকে।”
“কিন্তু এখন যথেষ্ট বিরক্ত সে। আমাদের বিরুদ্ধে হয়রানির মামলা করার হুমকি দিয়েছে।”
“পাগল নাকি-”
“এ মুহূর্তে গ্রোভের বিরুদ্ধে মামলা হলে পরিণতি কি হবে জানো? এখন থেকে আমার অনুমতির বাইরে কিছু করবে না, বুঝেছো?”
ভেতরে ভেতরে রেগে উঠলেও, মাথা নেড়ে সায় জানলাম। মেঝের দিকে তাকিয়ে আছি।
“থিও, তোমাকে একটা পরামর্শ দেই,” পিতৃসুলভ কণ্ঠে আমার কাঁধে চাপড় মেরে বললেন ডায়োমেডেস। “তুমি ভুল পথে হাটছে। একে ওকে প্রশ্ন করছে, সূত্র খুঁজছে-যেন এটা একটা গোয়েন্দা কাহিনী।” হেসে উঠলেন প্রফেসর। এভাবে বের করতে পারবে না।”
“কী বের করতে পারবো না?”
“সত্যটা। উইলফ্রেড বিয়নের কথাটা মনে রেখ- যার কোন স্মৃতি নেই, তার কোন উদ্দেশ্যও নেই। থেরাপিস্ট হিসেবে আগে থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে এগোনো যাবে না। শুধুমাত্র অ্যালিসিয়ার সাথে যতক্ষণ সময় কাটাবে তার অনুভূতিগুলো নিজের মধ্যে ধারণের চেষ্টা করবে। সেগুলো বোঝার চেষ্টা করবে। বাকিটা আপনাআপনিই হয়ে যাবে।”
“জানি আমি। ঠিক বলেছেন।”
“হ্যাঁ, ঠিকই বলেছি। আর যেন না শুনি যে অ্যালিসিয়ার পরিচিত কারো সাথে দেখা করার চেষ্টা করেছো, বুঝেছো?”
“জি”
.
২.১৫
ওদিন বিকেলে ক্যামব্রিজে অ্যালিসিয়ার ফুপাতো ভাই পল রোজের সাথে দেখা করতে গেলাম।
ট্রেন স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছুলে বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্যের জায়গা দখল করে নিল ছোট ছোট লোকালয়। ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় আলোগুলো নীল দেখাচ্ছে। লন্ডন থেকে বের হতে পেরে ভালো লাগছে। এখানকার আকাশ অনেক বেশি পরিস্কার, বুক ভরে শ্বাস নিতে পারছি।
এক ঝাঁক পর্যটক আর ছাত্রছাত্রির সাথে ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম আমি, ফোনের ম্যাপ দেখে সামনে এগোচ্ছি। রাস্তাগুলো এত নীরব যে আমার নিজের হাঁটার শব্দ কানে আসছে। হঠাৎ করেই রাস্তা শেষ হয়ে গেল। সামনে পতিত জমি। আরেকটু এগোলেই দেখা মিলবে নদীর।
একটা বাড়িই দাঁড়িয়ে আছে নদীর ধারে। আশপাশের পরিবেশের সাথে বড্ড বেমানান। অবস্থাও খুব একটা সুবিধার নয় বাড়িটার। দেয়ালজুড়ে লতানো গাছ আর বাগানভর্তি আগাছা। দেখে মনে হবে যেন প্রকৃতি তার বেহাত হয়ে যাওয়া জায়গাটুকু পুনর্দখলের চেষ্টা করছে। এই বাড়িটাতেই জন্ম হয়েছিল অ্যালিসিয়ার। জীবনের আঠারো বছর কাটিয়েছে এখানে। এই চার দেয়ালের মাঝে বিকশিত হয়েছে তার ব্যক্তিত্ব। এখন আমরা যে পরিণত অ্যালিসিয়াকে দেখি, তার স্বভাব চরিত্রের বীজ বপিত হয়েছিল এখানেই। মাঝে মাঝে জীবন নামের ধাঁধার উত্তর খুঁজতে অতীতে ডুব দিতে হয়। একটা উদাহরণ দিয়ে কথাটা আরো ভালোভাবে বোঝানো যায়:
যৌন নির্যাতনের ওপর দীর্ঘদিন গবেষণা করা একজন নামকরা সাইকিয়াট্রিস্ট একবার আমাকে বলেছিলেন, তার ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতায় এমন কোন পেডোফাইল বা শিশু নিয়াৰ্তনকারীর দেখা পাননি, যে কি না ছোটবেলায় নির্যাতনের শিকার হয়নি। তবে এমনটা কিন্তু নয় যে শৈশবে নির্যাতনের শিকার হলেই বড় হয়ে পেডোফাইল হতে হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি কখনো এরকম নির্যাতনের শিকার হয়নি, তার দ্বারা অন্য কারো নির্যাতিত হবার সম্ভাবনা একদম কম। কেউ খারাপ হয়ে জন্মায় না। উইনিকটের ভাষায়, “একটা শিশু কখনোই মা’কে ঘৃণা করবে না। যদি কোন কারণে তার মা তাকে ঘৃণা করতে শুরু করে, কেবলমাত্র তখনই শিশুর মনে ঘৃণার সঞ্চার হবে।” শিশু হিসেবে আমাদের সবার মনই স্পঞ্জের মতন। জীবনের চাহিদাও তখন কেবল খাওয়া, ঘুম আর ভালোবাসা পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু মাঝেমধ্যেই এর ব্যতয় ঘটে, ফলশ্রুতিতে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ হয় না। এটা নির্ভর করে আমরা কেমন পরিবেশে বড় হচ্ছি, সেটার ওপর। এক নির্যাতিত, অবুঝ শিশুর কিন্তু বাস্তবে প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা নেই। তাই তার ভেতরে ধীরে ধীরে দানা বাঁধতে থাকে প্রচণ্ড ক্ষোভ। কিভাবে প্রতিশোধ নেয়া যায়, এ ব্যাপারে জল্পনা-কল্পনা করতে শুরু করে সে। ভয়ের মত রাগের পেছনেও নির্দিষ্ট কারণ থাকে।
এ পৃথিবীতে কেউ কখনো বিনা প্ররোচনায় হাতে বন্দুক তুলে নেয়নি। ঠিক তেমনি, গ্যাব্রিয়েলকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করার পেছনেও অ্যালিসিয়ার নির্দিষ্ট কোন কারণ আছে অবশ্যই। গোটা ব্যাপারটা তার মানসিক কোন সমস্যার দিকেই ইঙ্গিত করছে। আর সেই মানসিক সমস্যা এমনি এমনি হয়নি।
আজকে আমার এখানে আসার কারণ হচ্ছে অ্যালিসিয়ার শৈশব কেমন কেটেছে, সে সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়া। এই বাড়িতেই হয়তো অপ্রীতিকর এমন কোন ঘটনা ঘটেছিল, যা তাকে বড় হয়ে ভালোবাসার মানুষটাকে খুন করার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বাগানটায় পা রাখলাম। চারপাশে নাম না জানা গুল্মজাতীয় গাছ। বুনো ফুল ফুটেছে কয়েকটায়। ধীরে ধীরে বাড়িটার পেছন দিকে চলে এলাম, একটা বিশাল উইলো গাছ রাজসিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে এখানে। কল্পনার চোখে দেখলাম অ্যালিসিয়া এই গাছটার নিচে খেলা করছে। মুখে হাসি ফুটলো আপনা থেকেই।
