এরপর নাস্তার জন্যে আমাকে পার্কে নিয়ে যায় ও, অনেকটা পিকনিকে মতন। বেলা বেশি না হওয়াতে গরমে কষ্ট লাগেনি খুব একটা। হ্রদের দিক থেকে ঠাণ্ডা বাতাস ছেড়েছিল, সদ্য কাটা ঘাসের গন্ধ পাচ্ছিলাম। সেখানেই মেক্সিকো থেকে কেনা নীল চাদরটা পেতে লম্বা একটা শুয়ে ছিলাম দুজনে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আমাদের সাথে লুকোচুরি খেলছিল সূর্যটা। খাবার হিসেবে সাথে ছিল শ্যাম্পেইন, ছোট ঘোট মিষ্টি টমেটো, রুটি আর স্যালমন। এসময় অদ্ভুত একটা অনুভূতিতে ছেয়ে ওঠে আমার মন। মনে হতে থাকে যে আগেও এরকম একটা দিন কাটিয়েছি। কিন্তু কবে, সেটা মনে করতে পারছিলাম না। হয়তো ছোটবেলায় শোনা কোন গল্পের কথা ভাবছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই ফিরে আসে বেরসিক স্মৃতিটা :
নিজেকে আমাদের ক্যামব্রিজের বাসার বাগানে আবিষ্কার করি। সেখানেও এখানকার মত একটা উইলো গাছ ছিল। ওটার আড়ালে অনেক সময় কাটিয়েছি। শৈশবে খুব একটা হাসিখুশি ছিলাম না হয়তো, কিন্তু উইলো গাছটার নিচে শুয়ে থাকার সময় ঠিক আজকের মত এরকম প্রশান্তি অনুভব করতাম। কিছুক্ষণের জন্যে আমার অতীত আর বর্তমান একাকার হয়ে গিয়েছিল। চাচ্ছিলাম না যে মুহূর্তটুকু শেষ হোক কখনো। গ্যাব্রিয়েল ঘুমিয়ে পড়লে ওর একটা ছবি আঁকি। মুখের ওপর এসে পড়া সূর্যের আলোটুকু ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছিলাম। তবে আজকে ওর সুন্দর চোখজোড়া আঁকতে খুব বেশি কষ্ট হয়নি। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল ছোট একটা ছেলে শুয়ে আছে।
পিকনিক শেষে বাসায় ফিরে সেক্স করি আমরা। এরপর আমাকে শক্ত করে ধরে একদম অপ্রত্যাশিত একটা কথা বলা গ্যাব্রিয়েল।
“অ্যালিসিয়া, ডার্লিং…তোমাকে একটা কথা বলতে চাই আমি।
ওর কথার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল যে বড় নার্ভাস লাগতে থাকে। “বলো,” কোনমতে বলি।
“একটা বাচ্চা নিলে কেমন হয়?”
এক মুহূর্তের জন্যে মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলি। কী বলবো বুঝেই উঠতে পারছিলাম না।
“কিন্তু…কিন্তু তুমিই তো বলেছিলে যে বাচ্চা-কাচ্চা পছন্দ না।”
“ভুলে যাও ওকথা। মত পাল্টেছি আমি। এখন আমি চাই আমাদের একটা বাচ্চা হোক। তুমি কি বলো?”
উত্তরে প্রতীক্ষায় আশাতুর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় গ্যাব্রিয়েল। “হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ…” চোখ দিয়ে টপটপ করে অশ্রু ঝরতে শুরু করে আমার।
ওকে শক্ত জড়িয়ে ধরি। এই হাসছি তো আবার এই কাঁদছি।
এখন বিছানায় ঘুমিয়ে আছে ও। আমি চুপচাপ উঠে এসেছি সবকিছু লিখে ফেলার জন্যে আজকের দিনটা সারা জীবন মনে রাখতে চাই আমি, যতদিন বেঁচে আছি।
খুব বেশি খুশি লাগছে। অবসাদ নামের এই সুড়ঙ্গটার শেষ মাথায় আশার আলো দেখতে পাচ্ছি যেন।
.
২.১৪
ম্যাক্স বেরেনসনের বলা কথাগুলো মাথা থেকে দূর হচ্ছে না। বাবার মৃত্যুর পর আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল অ্যালিসিয়া। ফাইলে এ বিষয়ে কিছু লেখা নেই কেন?
পরদিন ম্যাক্সের অফিসে আবার ফোন দিলাম। আরেকটু হলেই এক মক্কেলের সাথে দেখা করার জন্যে বেরিয়ে পড়তে সে।
“অল্প কিছু প্রশ্নের জন্যে ফোন দিয়েছি আবারো।”
“ভাই আমি আসলেই খুব ব্যস্ত এখন।”
“বেশি সময় লাগবে না।”
“পাঁচ মিনিট দিলাম আপনাকে।”
“ধন্যবাদ। আপনি তো বলেছিলেন অ্যালিসিয়া আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। তখন কোন হাসপাতালে নেয়া হয় তাকে, এটা মনে আছে?”
“হাসপাতালে ভর্তি হয়নি ও।”
“তাই?”
“হাঁ। বাসাতেই সেরে ওঠে। আমার ভাই দেখভাল করে গোটা সময়।”
“কিন্তু…ডাক্তার তো দেখিয়েছিল নিশ্চয়ই। ড্রাগ ওভারডোজ যেহেতু?”
“হ্যাঁ। বাসাতেই নিয়ে এসেছিল ডাক্তার। তিনি…এ ব্যাপারটা চেপে যেতে রাজি হয়েছিলেন।”
“ডাক্তারের নামটা মনে আছে আপনার?”
এক মুহূর্ত ভাবলো ম্যাক্স। “সরি, মনে নেই।”
“ওনারা কি সবসময় এই ডাক্তারকেই দেখাতো অসুস্থ হলে?”
“নাহ। গ্যাব্রিয়েল আর আমার পারিবারিক ডাক্তার আলাদা একজন। ও বলে দিয়েছিল যাতে ওনাকে কখনো এ ব্যাপারে কিছু না বলি।”
“নামটা মনেই পড়ছে না?”
“না, সরি। আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন? যেতে হবে আমাকে।”
“আরেকটা কথা…গ্যাব্রিয়েলের উইলের ব্যাপারে আমার একটু কৌতূহল আছে।”
উইলের কথা ওঠায় গলা চড়ে গেল ম্যাক্সের। “ওর উইল? এসবের সাথে কি সম্পর্ক
“অ্যালিসিয়াই কি তার সম্পত্তির মূল স্বত্বভোগী?”
“বড় অদ্ভুত প্রশ্ন করছেন কিন্তু।”
“আসলে, আমি বোঝার চেষ্টা করছি।”
“কি বোঝার চেষ্টা করছেন?” বিরক্ত কণ্ঠে বলল ম্যাক্স। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর যখন দেখলো আমি কিছু বলছি না, অগত্যা প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য হলো। “আমি মুল স্বত্বভোগী। অ্যালিসিয়া ওর বাবার দিক থেকে অনেক সম্পত্তি পেয়েছে। তাই গ্যাব্রিয়েল ওর জন্যে আলাদাভাবে কিছু রেখে যাওয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি। ওর সব সম্পত্তি মালিক এখন আমি। অবশ্য গ্যাব্রিয়েল ধারণা করেনি, তার মৃত্যুর পর সম্পত্তিগুলোর দাম এভাবে বেড়ে যাবে। আপনার প্রশ্ন কি শেষ?”
“আর অ্যালিসিয়ার উইল? তার উত্তরাধিকারী কে?”
“সেটা, দৃঢ়কণ্ঠে বলে ম্যাক্স, “আপনাকে বলা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। আশা করছি আর কখনো আমাকে ফোন দেবেন না।”
লাইন কেটে গেল। শেষদিকে তার গলার স্বর শুনে মনে হচ্ছিলো আমার কথাগুলো ভালোভাবে নেয়নি।
কিছুক্ষণ পরেই এর প্রমাণ পেলাম।
****
দুপুরের খাবারের পর আমাকে অফিসে ডেকে পাঠায় ডায়োমেডেস। ভেতরে ঢুকতে দেখে মুখ তুলে তাকালেন। একদম গম্ভীর।
