বোকার হাসি হেসে বিয়ার খোলে ম্যাক্স। এরপর কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই মুখ খুলি আমি :
“কি ঘটেছিল এ ব্যাপারে গ্যাব্রিয়েলকে সব বলবো আমি। তোমাকে আগে থেকেই জানিয়ে রাখলাম।”
হাসি মুছে গেল ম্যাক্সের। “কি?” সাপের নজরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে।
“গ্যাব্রিয়েলকে বলে দিব। জোয়েলদের ওখানকার ঘটনাটা।”
“কি বলছো এসব, বুঝতে পারছি না কিছু।”
“আসলেই?”
“আসলে কিছু মনে নেই। সেদিন একটু বেশিই গিলে ফেলেছিলাম।”
“ফালতু কথা।”
“না…”
“আমাকে চুমু খাওয়ার কথা মনে করতে পারছো না? আমাকে জড়িয়ে ধরার কথা ভুলে গেলে?”
“অ্যালিসিয়া, না।”
“কি না? হইচই করবো না? আমার গায়ে হাত দিয়েছিলে তুমি।”
বুঝতে পারি যে রেগে উঠছি। খুব কষ্ট হয় নিজেকে সামলাতে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি গ্যাব্রিয়েল তখনও বার্বিকিউ নিয়ে ব্যস্ত। ধোয়ার কারণে চেহারাটা পরিস্কার দেখতে পাচ্ছিলাম না।
“তোমাকে কত মানে গ্যাব্রিয়েল,” বলি একটু পর। “তুমি ওর বড় ভাই। যখন সত্যটা জানবে, ভীষণ কষ্ট পাবে।”
“তাহলে বোলো না। বলার মত কিছু নেই তো।”
“সত্যটা জানা উচিৎ ওর। ভাইয়ের আসল চেহারা যে কি, সেটা
কথা শেষ করার আগেই আমার হাত ধরে একটা হেঁচকা টান দেয় ম্যাক্স। তাল সামলাতে না পেরে ওর ওপরেই পড়ে যাই। এমনভাবে হাত উঠেয়েছিল, এক মুহূর্তের জন্যে ভেবেছিলাম ঘুষি দিবে। “আই লাভ ইউ,” আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে ম্যাক্স। “আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ, আই লাভ”
আমি কিছু বলার আগেই ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে দেয়। ওর আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছুটিয়ে নেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু শক্ত করে ধরে রেখেছিল শুয়োরটা। আমার মুখের ভেতরে ওর জিহ্বার উপস্থিতি টের পেতেই গা গুলিয়ে উঠলো।
কামড় বসিয়ে দিলাম যতটা জোরে সম্ভব।
চিৎকার করে আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় ম্যাক্স। মাথা উঁচু করলে দেখতে পাই মুখভর্তি রক্ত।
“কুত্তার বাচ্চা!” বিকৃত কন্ঠে বলে সে, দাঁত পুরো লাল হয়ে গেছে, ততক্ষণে। চোখে আহত পশুদের মতন দৃষ্টি।
আমার মাঝে মাঝে বিশ্বাসই হয় না যে ম্যাক্স গ্যাব্রিয়েলের ভাই। গ্যাব্রিয়েলের গুণাবলীর কোনটাই নেই ওর মধ্যে। আস্ত ইতর।
“অ্যালিসিয়া, গ্যাব্রিয়েলকে এ ব্যাপারে কিছু বলবে না তুমি,” আমাকে শাসায় ম্যাক্স। “সাবধান করে দিচ্ছি।”
জবাবে কিছু বলিনি। ঠোঁটে ওর রক্ত লেগে ছিল তাই পেছনে ফিরে ট্যাপের পানি দিয়ে কুলি করি কয়েকবার। এরপর বাগানে বেরিয়ে আসি।
ডিনারের সময়ে বুঝতে পারি, ম্যাক্স কিছুক্ষণ পরপর আমার দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু আমি মুখ তুললেই চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল। কিছু খেতে পারিনি ডিনারে। খাওয়ার কথা ভাবলেই অসুস্থ লাগছিল। মুখের ভেতরে ওর রক্তের স্বাদ টের পাচ্ছিলাম তখনও।
কি করা উচিৎ বুঝে উঠতে পারছিলাম না। গ্যাব্রিয়েলের কাছ থেকে কিছু লুকোনোর ইচ্ছে নেই আমার। কিন্তু সত্যটা বললে ও কষ্ট পাবে ভীষণ। ম্যাক্সের সাথে আর কখনো যোগাযোগ করবে না। তার ভাই যে একটা আস্ত জোচ্চোর, এটা মেনে নেয়াটা কষ্টকর হবে বেচারার জন্যে। আসলেও ম্যাক্সকে খুব বেশি শ্রদ্ধা করে গ্যাব্রিয়েল। যদিও হারামিটা ওর শ্ৰদ্ধার যোগ্য নয়।
আমি বিশ্বাস করি না যে ম্যাক্স আমাকে ভালোবাসে। আসলে গ্যাব্রিয়েলকে দেখতে পারেনা সে, ঈর্ষা করে। আর সেই ঈর্ষা থেকেই ওর সবকিছু কেড়ে নিতে চায়, আমাকেও। কিন্তু একবার যখন বুঝে গেছে যে আমি ছেড়ে দেবার পাত্র নই, আর কিছু করার সাহস হবে বলে মনে হয় না। অন্তত সেরকমটাই আশা করছি।
সেজন্যেই ব্যাপারটা আপাতত চেপে যাবো ঠিক করেছি।
অবশ্য আমার মনে কি চলছে সেটা গ্যাব্রিয়েল ঠিকই বুঝতে পারবে। আসলে মেকি ভান ধরা সম্ভব হয় না আমার পক্ষে। গত রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় বলে ম্যাক্সের সামনে আমি নাকি অদ্ভুত আচরণ করছিলাম।
“আসলে ক্লান্ত ছিলাম আমি।”
“নাহ, কী যেন হয়েছে তোমার। অন্যমনস্ক ছিলে পুরোটা সময়। একটু চেষ্টা করলেও পারতে, ম্যাক্সের সাথে এখন তো আর খুব বেশি একটা দেখা হয় না আমাদের। ওকে যে কেন এত অপছন্দ করো, বুঝতেই পারি না।”
“অপছন্দ করিনা, গ্যাব্রিয়েল। ম্যাক্সের সাথে আমার অন্যমনষ্কতার কোন সম্পর্ক নেই। আসলে কাজ নিয়ে ভাবছিলাম। খুব বেশি দেরি নেই প্রদর্শনীর।” যতটা সম্ভব বিশ্বাসযোগ্য সুরে বললাম।
আমার কথা বিশ্বাস না করলেও আর কিছু বলে না গ্যাব্রিয়েল। তবে পরবর্তীতে ম্যাক্সের সাথে দেখা হলে আবারো এ বিষয়ে কথা হবে আমাদের, নিশ্চিত আমি।
পুরো ঘটনাটা এখানে লিখতে পেরে খুব শান্তি লাগছে। কিছু লিখে ফেলার মধ্যে অন্য রকম একটা অনুভূতি আছে। আমার অবর্তমানে লেখাগুলো প্রমাণ হিসেবে কাজে দেবে।
যদিও কখনো ওরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে বলে মনে হয় না।
.
জুলাই ২৬
আজকে আমার জন্মদিন। তেত্রিশে পা দিলাম।
একটু অদ্ভুতই লাগছে, কখনো ভাবিনি যে এতদিন বেঁচে থাকবো। এক হিসেবে মা’র চেয়ে বড় আমি এখন। বত্রিশেই থেমে গিয়েছিল তার বয়স। এখন আমার বয়স বাড়তেই থাকবে না, কিন্তু মার বয়স বাড়বে না।
সকালটা খুব মিষ্টি ছিল আজ। তেত্রিশটা গোলাপ নিয়ে আমার ঘুম ভাঙিয়েছে গ্যাব্রিয়েল। ফুলগুলো এত্ত সুন্দর! একটা গোলাপের কাঁটায় ওর আঙুল সামান্য কেটে যায়। ছোট্ট এক বিন্দু রক্ত লেগে ছিল সেখানটায়। এরকম একটা দৃশ্যই মন ভালো করে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট।
