বাকি সন্ধ্যা কথা বলিনি কেউই। চুপচাপ ঘমোতে যাই।
আজ সকালে সবকিছুর মীমাংসা হয় সেক্সের মাধ্যমে। এরকমটাই হয়ে আসছে বরাবর। বিছানায় চাদরের নিচে নগ্ন দেহে আলিঙ্গনরত অবস্থায় একদম মন থেকে “দুঃখিত” বলাটা সহজ। সব যুক্তি আর প্রতিবন্ধকতা ধলোয় মিশে মাটিতে লুটোপুটি খায়, জামাকাপড়গুলোর মতন।
“যাবতীয় ঝগড়া আমাদের এখন থেকে বিছানাতেই করা উচিৎ।” আমার ঠোঁটে লম্বা চুমু খেয়ে গ্যাব্রিয়েল। “আই লাভ ইউ। বন্দুকটা ফেলে দিব, কথা দিচ্ছি।”
“না, থাক,” বলি আমি। “বাদ দাও। আমার কোন সমস্যা নেই। আসলেই।”
চুম খেয়ে আবারো আমাকে কাছে টেনে নেয় গ্যাব্রিয়েল। ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। আমার নগ্ন দেহটা একদম ঠিকঠাকভাবে ওর শরীরে এঁটে যায়। অবশেষে প্রশান্তি ভর করে আমার চিত্তে।
.
জুলাই ২৩
ক্যাফে দি আরটিস্টায় বসে লিখছি। এখন প্রায় প্রতিদিনই এখানে আসি। বাসায় একা একা থাকতে ভালো লাগে না। বাইরে মানুষজনের মধ্যে আসলে মনে হয় বনবাস থেকে লোকালয়ে ফিরেছি। প্রায়ই ভাবি যে বাইরে না বেরুলে আমার অস্তিত্বই মুছে যাবে পৃথিবী থেকে। জানি, খুবই অদ্ভুত একটা ভাবনা।
মাঝে মাঝে অবশ্য পুরোপুরি উধাও হয়ে যেতে ইচ্ছে করে-যেমন আজকে। রাতের বেলা ম্যাক্সকে ডিনারের দাওয়াত দিয়েছে গ্যাব্রিয়েল। কথাটা সকালে জানায় আমাকে।
“অনেকদিন ধরে ম্যাক্সের সাথে দেখা হয় না আমাদের,” বলে ও। “শেষ মনে হয় জোয়েলের নতুন বাসায় ওঠার পার্টিতে কথা হয়েছিল। আজ বার্বিকিউ করবো।” অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় গ্যাব্রিয়েল। “তোমার আপত্তি নেই তো?”
“আপত্তি থাকবে কেন?”
হাসে গ্যাব্রিয়েল। “তুমি একেবারেই মিথ্যে বলতে পারো না, জানো সেটা? চেহারা দেখেই সব বুঝে যাই আমি।”
“এবারে কি বুঝলেন শুনি?”
“ম্যাক্সের আসাটা পছন্দ হচ্ছে না তোমার। আসলে ওকে কখনোই পছন্দ করোনি তুমি।”
“ভূয়া কথা।” বুঝতে পারি যে চেহারা লাল হয়ে উঠছে আমার। কাঁধ ঝাঁকিয়ে মুখ অন্য দিকে ফেরাই। ওকে অপছন্দ করবো কেন? দেখা হলে ভালোই লাগবে। আমার ছবি আঁকার জন্যে পোজ দেবে কখন আবার? শেষ করতে হবে কাজ।”
হাসে গ্যাব্রিয়েল। “এই সপ্তাহের শেষে? তবে শোনন, ম্যাক্সকে পেইন্টিংটা দেখানোর দরকার নেই, ঠিক আছে? চাইনা আমাকে জিশুর রূপে দেখুক ও। সারাজীবন খোঁচাবে।”
“দেখাবো না। তাছাড়া কাজ তো শেষই হয়নি।”
শেষ হলেও ম্যাক্সকে দেখাতাম না কখনো। আমার স্টুডিওতে ওর পা। পড়ছে, এটা ভাবলেই রাগ লাগে। মনে মনে এসব ভাবলেও মুখে কিছু বললাম না।
বাসায় ফিরতে ইচ্ছেই করছে না। ম্যাক্সের চলের যাওয়া অবধি এই ক্যাফের এই শীতল পরিবেশে বসে থাকতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু ওয়েট্রেস মেয়েটা ইতোমধ্যে ঘড়ির দিকে তাকানো শুরু করে দিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে উঠে পড়তে হবে আমাকে। অর্থাৎ বাড়ি ফিরতে না চাইলে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা ছাড়া কোন উপায়। সেটা সম্ভব না। ম্যাক্সের মুখোমুখি হতেই হবে।
.
জুলাই ২৪
ক্যাফেতে ফিরে এসেছি আমি। প্রতিদিন যেখানে বসি, আজকে সেখানে অন্য একজন আগেই বসে পড়েছে। সুন্দরি ওয়েট্রেস সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে। অন্তত দৃষ্টিটা সহানুভূতিরই মনে হলো আমার কাছে, ভুলও হতে পারে। অন্য একটা টেবিলে বসলাম আজকে, এসির কাছাকাছি। তবে এদিকটা একটু অন্ধকার আর বেশি ঠাণ্ডা, ঠিক আমার মনের মতন।
গতরাতটা অসহ্য কেটেছে। যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ।
প্রথম দেখায় ম্যাক্সকে চিনতেই পারিনি। আগে কখনো ওকে স্যুট ব্যতীত অন্য কিছু পরতে দেখিনি। হাফপ্যান্টে বোকা বোকা লাগছিল। স্টেশন থেকে ওটুকু পথে হাঁটতেই ঘেমে গেছিল একদম। টেকো মাথাটা দেখে মনে হচ্ছিল বিশাল একটা চকচকে টমেটোর দিকে তাকিয়ে আছি। বগলের কাছটা ভিজে একসা। প্রথম প্রথম আমার দিকে তাকাতেই পারছিল না। নাকি আমিই তাকাচ্ছিলাম না ইচ্ছে করে?
প্রথমে বাসা নিয়ে বকবক শুরু করলো ম্যাক্স, কত বদলে গেছে-হেনতেন। এরপর বলে সে ভেবেছিল আমরা বোধহয় আর ওকে কখনো আসতেই বলবো না। গ্যাব্রিয়েল বারবার দুঃখপ্রকাশ করে, বলে যে আমরা সময়ই পাচ্ছিলাম না। একটা প্রদর্শনীর জন্যে কাজ করছি আমি আর ও নিজে ছবি তুলতে ব্যাস্ত। হাসিমুখে কথাগুলো বললেও আমিও ঠিকই বুঝতে পারছিলাম যে ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হয়েছে ও।
শুরুতে আমিও কিছু বুঝতে দেইনি। তক্কে তক্কে ছিলাম, ওরা বার্বিকিউ করতে বাইরে গেলেই রান্নাঘরে চলে আসি সালাদ বানানোর অজুহাতে। জানতাম যে কোন না কোন ছুতোয় আমার সাথে একা কথা বলতে আসবে ম্যাক্স। খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। পাঁচ মিনিট পরেই ম্যাক্সের ভারি পদশব্দ শুনতে পাই। গ্যাব্রিয়েল আর ওর হাঁটার ধরণে আকাশ পাতাল তফাৎ। গ্যাব্রিয়েল হাঁটে বিড়ালের মতন, নীরবে আর ম্যাক্স…
“অ্যালিসিয়া।”
বদটার মুখে আমার নাম শোনামাত্র হাত কাঁপতে শুরু করে। ছুরিটা নামিয়ে রেখে ওর মুখোমুখি হই।
হাতের খালি বিয়ারের বোতলটা দেখায় ম্যাক্স। হেসে বলে, “আরেকটা নিতে এসেছি।” তখনও আমার দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছিল না।
মাথা নাড়ি আমি, কিন্তু কিছু বলিনি। ফিজ খুলে আরেকটা বিয়ার বের করে ও। ওপেনারের জন্যে আশপাশে তাকালে হাত দিয়ে দেখিয়ে দেই কোথায় আছে জিনিসটা।
