মাথা ঝাঁকালো ম্যাক্স। “নাহ, আরো কয়েক বছর আগে। আপনি জানতেন না? আমি ভেবেছিলাম জানেন।”
“এটা কবেকার ঘটনা?”
“ওর বাবা মারা যাওয়ার পরপর। একসাথে অনেকগুলো ওষুধ খেয়ে ফেলেছিল…ওভারডোজ। আসলে পরিস্কার মনে নেই আমার। মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল।”
তাকে আরো কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবো এসময় দরজা খুলে গেল। রিসিপশনিস্ট মহিলা ভেতরে এসে নাক টেনে বলল, “ডার্লিং, আমাদের বের হওয়া উচিৎ। দেরি হয়ে যাবে।”
“ওহ হ্যাঁ, আসছি দাঁড়াও।”
বন্ধ হয়ে গেল দরজা। উঠে দাঁড়িয়ে ক্ষমা প্রার্থনার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় ম্যাক্স। “থিয়েটারে যাবো আজকে।” আমার চেহারার হতভম্ভ ভাব দেখে হেসে উঠলো সে। “গত বছর বিয়ে করেছি আমি আর তানিয়া।”
“ওহ আচ্ছা।”
“গ্যাব্রিয়েলের মৃত্যুর পর ঘটেছে ব্যাপারটা। ও না থাকলে দুঃসময়টা কিভাবে কাটাতাম, কে জানে।”
ম্যাক্সের ফোন বেজে উঠলো এ সময়।
“ধন্যবাদ, অনেক সাহায্য করেছেন।” ইশারায় তাকে ফোনটা ধরতে বলে অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম। এবারে ভালো করে তাকালাম রিসিপশনের তানিয়ার দিকে-স্বর্ণকেশী, সুন্দরি, কিছুটা খাটো গড়ন। আবারো নাক ঝারলো সে, তার হাতের বিয়ের হিরের আঙটিটা নজর এড়ালো না।
আমাকে অবাক করে দিয়ে এগিয়ে এল সে। ভ্রূ কুঁচকে নিচু গলায় বলল, “আপনি যদি অ্যালিসিয়ার ব্যাপারে জানতে চান, তাহলে ওর ফুপাতো ভাই পলের সাথে কথা বলুন। পলই সবার চাইতে ভালো করে চেনে ওকে।”
“আমি অ্যালিসিয়ার ফুপিকে ফোন দিয়েছিলাম, লিডিয়া রোজ। কথা বলতে আগ্রহী মনে হয়নি তাকে।”
“লিডিয়ার কথা ভুলে যান। সরাসরি ক্যামব্রিজে গিয়ে পলের সাথে কথা বলুন। অ্যালিসিয়া আর দুর্ঘটনার পরদিনের ব্যাপারে জিজ্ঞেস-”
অফিসরুমের দরজা খোলার শব্দ কানে আসামাত্র মুখে কুলুপ আটলো তানিয়া। ম্যাক্স বেরিয়ে এলে তার দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল সে। “তুমি তৈরি, ডার্লিং?”
তানিয়া হাসছে, তবে তার কণ্ঠের নার্ভাস ভাবটা আমার কান এড়ালো না। ম্যাক্সকে ভয় পায় সে, ভাবলাম। কিন্তু কেন?
.
২.১৩
অ্যালিসিয়া বেরেনসনের ডায়েরি
জুলাই ২২
বাড়িতে বন্দুক রাখার ব্যাপারটা একদমই ভালো লাগে না আমার কাছে।
গত রাতে এ নিয়ে ঝগড়াও হয়েছে আমাদের মধ্যে। অন্তত তখন মনে হয়েছিল যে বন্দুকটা নিয়েই ঝগড়া হচ্ছে, কিন্তু এখন আমি অতটা নিশ্চিত নই সে ব্যাপারে।
গ্যাব্রিয়েল বলছিল যে আমিই নাকি ঝগড়া লাগিয়েছি। ভুল বলেনি। ওকে আমার দিকে ওরকম আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখলে আমার খুবই খারাপ লাগে। আমার কারণে কষ্ট পাচ্ছে এটা কল্পনাও করতে পারি না-তবুও মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে কষ্ট দেই ওকে। কেন, সেটা আমি নিজেও বলতে পারবো না।
ও বলছিল আমি নাকি মেজাজ খারাপ করে বাসায় ফিরেছি গতকাল। আর ফিরেই দুদ্দাড় করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে ওর উদ্দেশ্যে চেঁচানো শুরু করে দেই। হয়তো সেটাই করেছিলাম। মনমেজাজ খারাপ ছিল কোন কারণে। আসলে আমি নিশ্চিত নই যে কি ঘটেছিল। তখন কেবল পার্ক থেকে ফিরেছি। আসার পথে পুরো রাস্তা দিবাস্বপ্নে মশগুল ছিলাম। আমার কাজগুলো নিয়ে ভাবছিলাম, বিশেষ করে জিশুর ছবিটার কথা। একটা বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে আসার সময় দেখি দুটো ছেলে পানির মোটা পাইপ। নিয়ে খেলছে। বয়স বড়জোর সাত কি আট। বড় ছেলেটা ছোটজনের দিকে পাইপ তাক করে আছে, সেখান থেকে ফোয়ারার মত পানি বেরুচ্ছে। আর দু’পাশে হাত বাড়িয়ে পানিতে ভিজছিল ছোট ছেলেটা, মুখে উজ্জ্বল হাসি। পানির ধারায় সূর্যের আলো পড়ে রংধনুর মত দেখাচ্ছিল অনেকটা। একসময় খেয়াল করি যে আমার দুই গালে অশ্রুর ধারা।
তখন বিষয়টাকে পাত্তা দেইনি, কিন্তু এখন পরিস্কার বুঝতে পারছি। সত্যটা আসলে নিজের কাছে স্বীকার করতে চাইনি কখনো, জীবনের বড় একটা সুখ থেকে বঞ্চিত আমি। শতবার নিজেকে বুঝিয়েছি যে সন্তান চাই না আমার, আঁকাআঁকিই আমার জীবনের সব। কিন্তু এটা ডাহা মিথ্যে, একটা অজুহাত মাত্র। সত্যটা হচ্ছে-সন্তান নিতে ভয় পাই আমি। বাচ্চাকাচ্চার ব্যাপারে আমার ওপর ভরসা করা সম্ভব নয়।
হাজার হোক, আমার ভেতরে তো মা’র রক্তই বইছে, নাকি?
বাসায় ফেরার পর অবচেতন মনে এসবই ভাবছিলাম হয়তো। ঠিকই বলেছিল গ্যাব্রিয়েল, অবস্থা সুবিধের ছিল না আমার।
কিন্তু সেই মুহূর্তে ওকে বন্দুকটা পরিস্কার করতে না দেখলে মাথায় রক্ত উঠতো না। ওটা দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। আমার শত অনুরোধ সত্ত্বেও বন্দুকটা বাসা থেকে দূর করেনি ও। সবসময়ই বলে যে এটা নাকি ১৬ বছর বয়সে ওর বাবার কাছ থেকে পেয়েছিল, বংশ পরম্পরায় বন্দুকটা ওদের পরিবারের কাছে আছে। যতসব ফালতু কথা। আমার বিশ্বাস হয় না, নিশ্চয়ই অন্য কোন কারণ আছে। সেটাই বলেছিলাম। তখন গ্যাব্রিয়েল বলে যে নিজের এবং স্ত্রীর নিরাপত্তার খাতিরে বাসায় একটা বন্দুক রাখা এমন কোন বিষয় না। যদি হঠাৎ কেউ ঢুকে পড়ে ভেতরে, তখন?
“তখন পুলিশে ফোন দেব!” বলেছিলাম। “গুলি নিশ্চয়ই করবো না!”
গলার স্বর চড়ে গিয়েছিল আমার। জবাব দেয়ার সময় ওর গলা আরো চড়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ধুন্ধুমার ঝগড়া শুরু করি দু’জনে। আমি হয়তো একটু বেশি বেশিই করে ফেলেছি। কিন্তু শুরুটা তো ও-ই করেছে। রেগে গেলে মাঝে মাঝে একটু আগ্রাসী হয়ে ওঠে গ্যাব্রিয়েল। খুব কম ক্ষেত্রেই হয় এমনটা, কিন্তু আমার খুব ভয় লাগে তখন। মনে হয় যেন অচেনা কারো সাথে সংসার করছি।
