“আসলে এরকম বিষয়াদি নিয়ে আমার কোন আগ্রহ নেই।”
“তাই?” কৌতূহল ফুটলো ম্যাক্সের চেহারায়। “একজন সাইকোথেরাপিস্ট হিসেবে তো রোগির উকিলের সাথে দেখা করার কথা নয় আপনার, তাই না?”
“না। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, আমরা যে রোগির ব্যাপারে কথা বলছি সে গত কয়েক বছরে মুখ খোলেনি।”
কথাটা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো ম্যাক্স। “বেশ। কিন্তু যেমনটা বললাম, আপনার কোন কাজে আসবো না আমি। তাই-”
“খুব কঠিন কিছু জিজ্ঞেস করবো না।”
“ঠিক আছে। শুনি তাহলে আপনার প্রশ্নগুলো।”
“একটা পেপারে পড়েছিলাম, গ্যাব্রিয়েল খুন হবার আগের রাতে তাদের বাসায় গিয়েছিলেন আপনি?”
“হ্যাঁ, একসাথে ডিনার করি আমরা।”
“তখন তাদের কেমন দেখেছিলেন?”
ক্লান্তি ভর করলো ম্যাক্সের দৃষ্টিতে। এই প্রশ্নটা নিশ্চয়ই আগেও অনেকবার শুনতে হয়েছে তাকে। জবাবটাও তৈরিই ছিল। “স্বাভাবিক, একদম স্বাভাবিক।”
“আর অ্যালিসিয়া?”
“স্বাভাবিক।”কাঁধ ঝকালো ম্যাক্স। “অন্যান্য সময়ের তুলনায় একটু অস্থির লাগছিল, কিন্তু…”
“কিন্তু কি?”
“কিছু না।”
বুঝতে পারছিলাম, ঘটনার এখানেই শেষ নয়, তাই অপেক্ষা করতে লাগলাম।
একমুহূর্ত পর আবারও বলতে শুরু করলো ম্যাক্স। “ওদের সম্পর্কের ব্যাপারে কতটা জানেন আপনি?”
“পত্রিকায় যতটুকু পড়েছি।”
“কী পড়েছেন সেখানে?”
“সুখি দম্পতি ছিল তারা।”
“সুখি?” শীতল একটা হাসি ফুটলো ম্যাক্সের মুখে। “আসলেও সুখি ছিল। অ্যালিসিয়াকে সুখি রাখার জন্যে হেন কাজ নেই যা গ্যাব্রিয়েল করেনি।”
“বুঝলাম,” বললাম ঠিকই, কিন্তু আদতে কিছুই বুঝছি না। কি বলতে চাইছে ম্যাক্স?
আমার বিভ্রান্ত চেহারা দেখে কাঁধ নাচালো সে। “আমার কাছ থেকে এর বেশি আর কিছু জানতে পারবেন না। তবে আপনি যদি এই ধরণের গালগপ্পে আগ্রহী হন, তাহলে জিন-ফিলিক্সের সাথে কথা বলে দেখতে পারেন।”
“জিন-ফিলিক্স?”
“জিন-ফিলিক্স মার্টিন। অ্যালিসিয়ার গ্যালারিস্ট। অনেক বছর ধরে একে অপরকে চেনে তারা, সম্পর্কও খুব ভালো। তবে সত্যি বলতে আমার লোকটাকে কেন যেন কখনোই পছন্দ হয়নি।”
“গল্পগুজবে কোন আগ্রহ নেই আমার।” মনে মনে ঠিক করলাম যত দ্রুত সম্ভব জিন-ফিলিক্সের সাথে আলাপ করতে হবে। আমি আসলে আপনার ব্যক্তিগত অভিমত শুনতেই বেশি আগ্রহী। আপনাকে একটা প্রশ্ন করি?”
“করলেন তো কেবলই।”
“আপনি কি অ্যালিসিয়াকে পছন্দ করতেন?”
“অবশ্যই,” অনুভূতহীন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল ম্যাক্স।
তার কথাটা বিশ্বাস হলো না আমার। “আমার কেন যেন মনে হচ্ছে। আপনি আইনজীবীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই কথাটা বলছেন। আর একজন। আইনজীবীকে তো অনেক কিছু গোপন রাখতেই হয়। দয়া করে গ্যাব্রিয়েলের ভাইয়ের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু বলুন।”
নীরবতা ভর করলো ঘরটায়। মনে মনে ভয় পাচ্ছিলাম আমাকে হয়তো অফিস থেকে বেরিয়ে যেতে বলবে ম্যাক্স। কিছু একটা বলতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে মত বদলালো সে। এরপর হঠাৎই ডেস্ক ছেড়ে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। পাল্লা খুলতেই শীতল বাতাস ঢুকে পড়লো ভেতরে। লম্বা শ্বাস নিল ম্যাক্স, যেন এতক্ষণ রুমের ভেতরে দমবন্ধ লাগছিল তার।
অবশেষে নিচু স্বরে বলল। “সত্যিটা হচ্ছে…ওকে ঘৃণা করি আমি…ঘৃণা…”
কিছু বললাম না। তার পরবর্তী কথাগুলো শোনার অপেক্ষা করছি।
“গ্যাব্রিয়েল শুধু আমার ভাইই ছিল না, ও ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু,” জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েই বলল সে। “ওর মতো দয়ালু আর কাউকে দেখিনি। একটু বেশিই দয়ালু। কিন্তু তার সব প্রতিভা, উদারতা, প্রাণচাঞ্চল্য-অকালে শেষ হয়ে গেল কুত্তিটার জন্যে। ঐ রাতে গ্যাব্রিয়েলের পাশাপাশি আমার জীবনও শেষ করে দিয়েছে সে। ভাগ্যিস এই দিন দেখার জন্যে মা-বাবা বেঁচে নেই।” গলা ধরে এলো ম্যাক্সের।
তার কষ্টটা অনুভব করতে পারছি, খারাপও লাগছে বেচারার জন্যে। “অ্যালিসিয়ার আইনজীবীর বন্দোবস্ত করাটা আপনার জন্যে বেশ কঠিন ছিল নিশ্চয়ই।”
জানালা বন্ধ করে ডেস্কে ফিরে এলো ম্যাক্স। নিজের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। এখন পুরোদমে একজন উকিল সে। নিরপেক্ষ, বিচার বিবেচনাপূর্ণ, অনুভূতিহীন।
আমার উদ্দেশ্যে কাঁধ ঝাঁকালো একবার। “গ্যাব্রিয়েল বেঁচে থাকলে এমনটাই চাইতো। অ্যালিসিয়ার জন্যে সবসময়ই সেরাটা দিতে চেয়েছে সে। ওর জন্যে পাগল ছিল আমার ভাই। আর অ্যালিসিয়া আসলেও একটা পাগল।”
“আপনার ধারণা তার মাথায় সমস্যা আছে?”
“আপনিই বলুন, এখন তো তার চিকিৎসা করছেন।”
“আপনার কী মনে হয়?”
“ওর কর্মকাণ্ড নিজের চোখে দেখেছি বলেই বলছি।”
“কী দেখেছেন?”
“মুড সুইং। মেজাজ এই ভালো তো এই খারাপ। প্রচণ্ড বদমেজাজী। একটুতেই জিনিসপত্র ভাঙচুর করতো। গ্যাব্রিয়েলের কাছে শুনেছিলাম বেশ কয়েকবার নাকি তাকে মেরে ফেলার হুমকিও দিয়েছে। তখনই কিছু একটা করা উচিৎ ছিল আমার। অন্তত অ্যালিসিয়া যখন আত্মহত্যার চেষ্টা করে, এরপর চুপ থাকাটা একদমই উচিৎ হয়নি। গ্যাব্রিয়েল আগলে রাখতে চাইছিল ওকে আর আমিও সেটা করতে দিয়েছি। আস্ত গর্দভ আমি।”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘড়ির দিকে তাকালো ম্যাক্স। ইঙ্গিতটা পরিস্কার, আর কথা বাড়াতে চাইছে না সে।
কিন্তু আমি শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। “অ্যালিসিয়া আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল? মানে? কবে? খুনের ঘটনার পর?”
