“ফোনে সাড়া যায় না আলাপটা? আমি একটু ব্যস্ত আছি এই ক’দিন।”
“সামনাসামনি দেখা করে কথা বললেই ভালো হতো।”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ওপাশে বিড়বিড় করে অন্য কারো উদ্দেশ্যে কিছু বললেন ম্যাক্স বেরেনসন। “কাল সন্ধ্যা সাতটায়, আমার অফিসে।”
ঠিকানা জিজ্ঞেস করার আগেই ফোন কেটে দিল লোকটা।
.
২.১২
ম্যাক্স বেরেনসনের রিসিপশনিস্টের বেশ বাজে রকমের ঠাণ্ডা লেগেছে। একটা টিস্যু হাতে নিয়ে নাক ঝেড়ে ইশারায় অপেক্ষা করতে বলল আমাকে।
“ফোনে কথা বলছে মি, বেরেসন। এক মিনিট বসুন।”
মাথা নেড়ে ওয়েটিং এরিয়াতে একটা সিটে বসে পড়লাম। চেয়ারগুলো বিশেষ সুবিধার নয়, পিঠ সোজা করে রাখতে হয়। এক পাশে কফি টেবিলের ওপর বেশ কয়েকটা পুরনো পত্রিকা রাখা। সব ওয়েটিং রুমের চেহারাই বোধহয় একইরকম হয়, ভাবলাম। এই জায়গাটাকে অনায়াসে কোন ডাক্তারের চেম্বার বা ফিউনারেল হোমের ওয়েটিং রুম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
হলওয়ের অন্যপ্রান্তের দরজাটা খুলে গেল কিছুক্ষণ পর। সেখান থেকে মাথা বের করে আমাকে ডাকল ম্যাক্স বেরেসন। উঠে এগিয়ে গেলাম সেদিকে।
ফোনের ওরকম কাঠখোট্টা কথাবার্তা শুনে ভেবেছিলাম আলাপচারিতা খুব একটা সুবিধার হবে না। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে প্রথমেই দুঃখপ্রকাশ করলো সে।
“ফোনে ঠিকমতো কথা বলতে পারিনি দেখে কিছু মনে করবেন না, প্লিজ। খুবই ব্যস্ত একটা সপ্তাহ গিয়েছে, আমার শরীরটাও ভালো না। বসুন।”
ডেস্কের উল্টোদিকের চেয়ারগুলোয় একটায় বসে পড়লাম। “ব্যস্ত সময়ের মধ্যেও দেখা করতে রাজি হবার জন্যে ধন্যবাদ।”
“দেখা করবো কি না সে বিষয়ে সন্দিহান ছিলাম প্রথমে ভেবেছিলাম আপনি বুঝি সাংবাদিক, অ্যালিসিয়ার ব্যাপারে খোঁজ-খবর করছেন সেজন্যেই। কিন্তু পরে গ্রোভে ফোন দিয়ে নিশ্চিত হই যে আসলেও সেখানে কাজ করেন আপনি।”
“ওহ, আচ্ছা। এরকমটা প্রায়ই ঘটে নাকি? মানে সাংবাদিকরা প্রায়ই ফোন দেয়?”
“ইদানীং আর খুব একটা দেয় না। কিন্তু আগে বড্ড বেশি জ্বালাতন করতো। তাই একটু সাবাধানী-” হাঁচির কারণে বাক্যটা শেষ করতে পারলোনা ম্যাক্স বেরেনসন। “মাফ করবেন, আমারও ঠাণ্ডা লেগেছে।”
শব্দ করে নাক ঝরলো সে। এই ফাঁকে তাকে ভালো করে খেয়াল করলাম। চেহারাটা ছোট ভাইয়ের মতন আকর্ষণীয় নয় ম্যাক্স বেরেনসনের। মাথায় টাক পড়তে শুরু করেছে, পেটে দশাসই ভুড়ি। মুখভর্তি ব্রনের ছেড়ে যাওয়া দাগ। পুরনো আমলের ওল্ড স্পাইস পারফিউমের গন্ধ নাকে এলো, আমার বাবাও ব্যবহার করতো এটা। গোটা অফিসে বনেদি একটা ভাব আছে। চামড়ার মোড়া আসবাবপত্র, কাঠের প্যানেলিং, তাকভর্তি বই। গ্যাব্রিয়েলের রঙিন জগতের সাথে আকাশ পাতাল তফাৎ জায়গাটার। দুই ভাইয়ের মধ্যে বেজায় পার্থক্য, বোঝাই যাচ্ছে।
গ্যাব্রিয়েলের বাঁধানো একটা ছবি রাখা ডেস্কে। তার অগোচরেই তোলা হয়েছিল ছবিটা-ক্যান্ডিড। খুব সম্ভবত ম্যাক্সই ছিল লেন্সের পেছনে। গ্রামাঞ্চলে বিশাল একটা মাঠের বেড়ার ওপর বসে আছে সে ছবিতে। গলা থেকে একটা ক্যামেরা ঝুলছে। ফটোগ্রাফার তো নয়, যেন নামকরা কোন অভিনেতা। কিংবা এভাবেও বলা যায় যে ফটোগ্রাফারের ভূমিকায় অভিনয় করছে সে।
ছবিটার দিকে আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাথা নাড়লো ম্যাক্স। “চেহারা আর চুলের দিক থেকে আমার ভাই বিজয়ী, মগজের দিক থেকে আমি, আমার মনের কথাই বলল সে। পরক্ষণেই হেসে উঠলো। “মজা করলাম। আসলে, আমাকে দত্তক নেয়া হয়েছিল। আমাদের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক নেই।”
“তাই নাকি? এটা জানা ছিল না। আপনাদের দু’জনকেই দত্তক নেয়া হয়েছিল?”
“নাহ, শুধু আমাকে। আমাদের বাবা-মা প্রথমে ভেবেছিল তাদের কোন সন্তান হবে না। কিন্তু আমাকে দত্তক নেয়ার পরেই মা কনসিভ করে। খুঁজলে এরকম আরো উদাহরণ পাবেন কিন্তু। বোধহয় সন্তান না হবার দুশ্চিন্তা মাথা থেকে দূর হওয়ার সাথে এর সম্পর্ক আছে।”
“আপনাদের দু’ভাইয়ের মধ্যে কেমন মিল ছিল? ঘনিষ্ঠ বলা যাবে?”
“হ্যাঁ, তা যাবে। তবে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময় গ্যাব্রিয়েলই থাকতো। আমি একরকম ওর ছায়াতেই বড় হয়েছি।”
“এরকমটা হবার কারণ?”
“আসলে এরকমটা না হওয়াই অস্বাভাবিক ছিল। মানে কিভাবে যে বলব…ছোট থেকেই একটু অন্যরকম ছিল ও, কথা বলার সময় আনমনে হাতের আঙটি নাড়াচাড়া করছে ম্যাক্স। একটু পরপরই এদিক ওদিক ঘোরাচ্ছে। “সবখানে ক্যামেরা নিয়ে যেত, ছবি তুলতে। বাবা অবশ্য ভেবেছিল ওর মাথায় নির্ঘাত কোন সমস্যা আছে। কিন্তু পরবর্তীতে সবাই বুঝতে পারে যে সে কতটা প্রতিভাবান। ওর ভোলা কোন ছবি দেখেছেন?”
জবাবে একটা কৌশলী হাসি ফুটলো আমার মুখে। গ্যাব্রিয়েলের ছবি তোলার প্রতিভা নিয়ে কথা বলার জন্যে এখানে আসিনি। বিষয় পরিবর্তনের চেষ্টা করলাম। “গ্যাব্রিয়েলের স্ত্রীকে নিশ্চয়ই ভালো করেই চিনতেন আপনি?”
“অ্যালিসিয়াকে? ভালো করে চিনতে হবে নাকি?” অ্যালিসিয়ার প্রসঙ্গ উঠতেই কথা বলার সুর বদলে গেল ম্যাক্সের। এখন আর আগের উষ্ণতাটুকু নেই, চোখে ভর করেছ শীতল চাহনি। “আপনাকে এই ব্যাপারে কোন সাহায্য করতে পারবো বলে মনে হয় না। তবে আপনি চাইলে আমার সহকর্মী প্যাট্রিক ডোহার্টির সাথে আপনার যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারবে, সে বিচার সংক্রান্ত সব খবরাখবর জানাতে পারবে।”
