“ধন্যবাদ।”
বিনোদন কক্ষটা মূলত বিশাল গোলাকার একটা কামরা। ভেতরে পুরনো কাউচ, নিচু টেবিল আর তাকভর্তি পুরনো বই। সার্বক্ষণিক পানসে চা-পাতা আর তামাকের গন্ধ ভেসে বেড়ায়। আমার ধারণা আসবাবপত্রগুলোই এই গন্ধের উৎস। ভেতরে ঢুকে দেখি দুইজন রোগী পেছনে ব্যাকগ্যামন খেলছে। পুল টেবিলের সামনে একা দাঁড়িয়ে আছে এলিফ। হাসিমুখে এগিয়ে গেলাম।
“হ্যালো, এলিফ।”
ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো সে। “কি?”
“ঘাবড়ানোর কিছু নেই। একটু কথা বলতে এসেছি।”
“তুমি তো আমার ডাক্তার না।”
“আমি ডাক্তার নই, সাইকোথেরাপিস্ট।”
নাক দিয়ে ঘোঁত শব্দ করলো এলিফ। “আমার একজন সাইকোথেরাপিস্টও আছে।”
মুখের হাসিটা ঝুলিয়ে রেখেছি এখনও। মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালাম যে এলিফ ইন্দিরার রোগি, আমার নয়। এলিফের কাছাকাছি দাঁড়ালে তাকে আরো ভয়ঙ্কর লাগে। শুধু তার আকৃতির জন্যে নয় কিন্তু, বরং ওর চেহারাতেই সদা বিরক্ত আর মেজাজী একটা ভাব আছে। চোখের দৃষ্টিও স্বাভাবিক নয়। শরীর থেকে সবসময় ঘাম আর হাতে বানানো সিগারেটের গন্ধ পাওয়া যায়। একটার পর একটা সিগারেট টানতেই থাকে।
সেকারণে আঙুলগুলো কালচে হয়ে গেছে, দাতে আর নখে হলদেটে ভাব।
“তোমার যদি আপত্তি না থাকে, তাহলে অ্যালিসিয়ার ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন করতাম।”
ভ্রু কুঁচকে গেল এলিফের। পুল খেলার লাঠিটা শব্দ করে টেবিলের নামিয়ে রেখে পরবর্তী গেমের জন্যে বলগুলো গোছাতে শুরু করলো। এরপর হঠাৎই থেমে গেল কি মনে করে। কিছু একটা ভাবছে।
“এলিফ?”
কোন জবাব দিল না। তার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে কিছু একটা ঠিক নেই। “তুমি কি কিছু একটা শুনতে পাচ্ছো, এলিফ?”
সন্দেহ ফুটলো এলিফের দষ্টিতে। কাধ ঝাঁকানো একবার।
“কি বলছে কণ্ঠগুলো?”
“বলছে তুমি নিরাপদ নও। তোমার থেকে সাবধানে থাকতে।”
“বেশ। ঠিকই বলছে কিন্তু। তুমি তো আমাকে চেনো না, তাই ভরসাও করতে পারছে না। হয়তো সময়ের সাথে সাথে আমাদের সম্পর্কটা আরো ভালো হবে, এ ব্যাপারে আশাবাদী আমি।”
এলিফের চেহারা দেখে মনে হলো না কথাটা বিশ্বাস করেছে সে।
“এক গেম হয়ে যাবে নাকি?” পুল টেবিলের দিকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করলাম।
“না।”
“কেন?”
আবারো কাঁধ ঝাঁকালো এলিফ। “অন্য কিউটা এখনও ভাঙা।”
“কিন্তু আমরা দু’জন তো চাইলে তোমারটা দিয়েই খেলতে পারি।”
কিউটা টেবিলের ওপর রাখা। ওটার দিকে হাত বাড়াতে যাবো এমন সময় টান দিয়ে সেটা সরিয়ে নিল এলিফ। “এটা আমার কিউ? খেলতে হলে নিজেরটা নিয়ে এসো!”
পেছনে সরে এলাম, এতটা ক্ষেপে যাবে বুঝিনি। একা একাই খেলতে শুরু করলো সে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার খেলা দেখলাম কিছুক্ষণ। এরপর আবারো চেষ্টা করলাম কথা বলার।
“অ্যালিসিয়া প্রথম গ্রোভে ভর্তি হবার সময়কার একটা ঘটনা জানতে চাইছি। মনে আছে তোমার?”
মাথা ঝাঁকিয়ে না করে দিল এলিফ।
“ফাইলে পড়েছি যে ক্যান্টিনে কী যেন সমস্যা হয়েছিল তোমাদের মধ্যে। বোধহয় ব্যথা পেয়েছিলে?”
“ওহ হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমাকে খুন করার চেষ্টা করেছিল ও, তাই না? গলা কেটে ফেলতে চাইছিল।”
“একজন নার্স নাকি তোমাকে দেখেছিল অ্যালিসিয়ার উদ্দেশ্যে ফিসফিস করে কিছু বলতে। কি এমন বলেছিলে সেটাই ভাবছিলাম।”
“না।”জোরে জোরে মাথা ঝাঁকালো এলিফ। “কিছুই বলিনি আমি।”
“আমি কিন্তু বলছি না যে অ্যালিসিয়াকে উসকে দিয়েছো তুমি। কেবলমাত্র একটু কৌতূহলী বলতে পারো। কি বলেছিলে?”
“হ্যাঁ, একটা প্রশ্ন করেছিলাম। তাতে কি হয়েছে?”
“কি প্রশ্ন করেছিলে?”
“জিজ্ঞেস করেছিলাম যে শাস্তিটা তার প্রাপ্য ছিল কি না।”
“কার?”
“আরে ওই যে, ঐ লোকটার।” হাসার চেষ্টা করলো এলিফ।
“অ্যালিসিয়ার স্বামীর কথা বলছো?” ইতস্তত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলাম। “তুমি অ্যালিসিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলে তার স্বামীর খুন হওয়াটা প্রাপ্য ছিল কিনা?”
মাথা নেড়ে সায় দেয় এলিফ। “আর জিজ্ঞেস করেছিলাম যে গুলি করার পর তার চেহারাটা কেমন হয়েছিল, মগজ বের হয়ে এসেছিল কিনা।” আগের চেয়েও জোরে হেসে উঠলো এবারে।
বিতৃষ্ণায় ছেয়ে উঠলো মন, আমি নিশ্চিত অ্যালিসিয়াও এরকমই অনুভব করেছিল সেসময়। এলিফ যে কারো ভেতরে ঘৃণা আর রাগ জাগিয়ে তুলবে-এটাই তার স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। তার মা নিশ্চয়ই ছোটবেলায় এরকম ব্যবহারই করতো তার সাথে। তাই এলিফ অবচেতন মনেই মানুষের মনে ঘৃণার উদ্রেক ঘটায়। অনেকাংশে সফলও হয়।
“আর এখন অ্যালিসিয়ার সাথে সম্পর্ক কেমন তোমার? ভালো?”
“হ্যাঁ, একদম। আমার জানের বান্ধবী ও,” আবারো হাসলো এলিফ।
জবাবে কিছু বলার আগেই টের পেলাম যে ফোন বাজছে পকেটে। বের করে দেখি অপরিচিত একটা নম্বর থেকে কল এসেছে।
“ফোনটা ধরতে হবে আমাকে। কথা বলার জন্যে অনেক ধন্যবাদ, এলিফ।”
জবাবে দুর্বোধ্য ভাষায় কিছু একটা বিড়বিড় করে আবারো খেলায় মনোযোগ দিল এলিফ।
***
করিডোরে বেরিয়ে এসে কলটা রিসিভ করলাম। “হ্যালো?”
“থিও ফেবার?”
“জি। কে বলছেন?”
“ম্যাক্স বেরেনসন, কয়েক দিন আগে ফোন দিয়েছিলেন আপনি।”
“ওহ, হ্যাঁ। ধন্যবাদ মনে করে কল দেয়ার জন্যে। আপনার সাথে অ্যালিসিয়ার ব্যাপারে কিছু কথা ছিল আমার।”
“কেন? কি হয়েছে? কোন সমস্যা?”
“না, মানে, ওরকম কিছু না। আমি তার চিকিৎসার ব্যাপারটা দেখছি এখন। সেজন্যেই কিছু প্রশ্ন করতে চেয়েছিলাম। যখন আপনার সময় হয় আরকি।”
