বাসায় ফিরে ক্যাথির মুখোমুখি হতে হবে আমাকে।
ওকে ছেড়ে দিতে হবে।
.
২.১০
বাসায় এসে দেখি ক্যাথি ফিরেছে। কাউচে পা তুলে বসে কাকে যেন মেসেজ পাঠাচ্ছে সে।
“কোথায় গিয়েছিলে?” মুখ না তুলেই জিজ্ঞেস করলো ও।
“হাঁটতে বেরিয়েছিলাম একটু। রিহার্সাল কেমন গেল?”
“যেরকম যায়।”
ওকে মেসেজ টাইপ করতে দেখলাম, কার সাথে কথা বলছে? জানি যে কিছু বলতে চাইলে এখনই বলা উচিৎ আমার। তোমার পরকীয়ার ব্যাপারে জেনে গেছি আমি, এভাবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার কোন মানে হয় না। কথাগুলো বলার জন্যে মুখও খুললাম, কিন্তু কোন শব্দ বেরুলো না। যেন বোবা হয়ে গেছি। আমি কিছু বলার আগেই ক্যাথি কথা বলে উঠলো। ফোন নামিয়ে রেখেছে।
“থিও, আমাদের কিছু বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলা উচিৎ।”
“কোন বিষয়ে?”
“তোমার কি আমাকে কিছুই বলার নেই?” ক্যাথির কণ্ঠে রূঢ়তার আভাস।
ইচ্ছে করে ওর দিকে তাকাচ্ছি না, ভয় হচ্ছে যে আমার মনের কথা পড়ে ফেলবে। রীতিমতো লজ্জা লাগছে, যেন আমি নিজেই বড় কোন ভুল করে ফেলেছি।
তবে ক্যাথির দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবলে আসলেও ভুল করেছি আমি। সোফার পেছন থেকে একটা বয়াম বের করে সামনের টেবিলে রাখলো ও। পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে সাথে সাথে। এই ছোট বয়ামটাতেই গাঁজা রাখি আমি। আঙুল কেটে যাওয়ার পর লুকোতে ভুলে গেছি।
“এটা কি?” বয়ামটা উঁচু করে জিজ্ঞেস করলো ক্যাথি।
“গাঁজা।”
“সেটা ভালো করেই জানি আমি। কিন্তু এটা এখানে কি করছে?”
“আমি নিয়ে এসেছি। মাঝে মাঝে
“মাঝে মাঝে কি? নেশা করো?”
কাঁধ ঝাঁকালাম জবাবে। এখনও চোখ নামিয়ে রেখেছি।
“এসব কি থিও! জবাব দাও!” চেঁচিয়ে উঠলো ক্যাথি। মাঝে মাঝে মনে হয় যে তোমাকে চিনতে ভুল করেছি আমি।”
মাথায় আগুন ধরে গেলো। ইচ্ছে করছে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি। পুরো ঘরে ভাঙচুর চালাই, আগুন লাগিয়ে দেই। বাচ্চাদের মত কাঁদতে কাঁদতে আবার ওর কাছেই নিজেকে সমর্পণ করি।
কিন্তু এরকম কিছু করলাম না।
“চলো ঘুমিয়ে পড়ি,” বলে ওখান থেকে সরে আসলাম।
বিছানায় উঠেও কেউ কোন কথা বললাম না। অন্ধকারে ওর পাশে চুপচাপ শুয়ে থাকি। ঘুমের বালাই নেই আমার চোখে। ক্যাথির শরীরের উত্তাপ পরিস্কার টের পাচ্ছি। ওর ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
আমার সাথে কেন আলাপ করলে না? বলতে চাইছিলাম। কেন আসলে না আমার কাছে? তোমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু তো আমিই। আলোচনার মাধ্যমে সবকিছুর সমাধান করতে পারতাম আমরা। আমার সাথে কেন কথা বললে না? আমি তো এখানেই ছিলাম। ঠিক এখানেই।
ইচ্ছে করছে ওকে কাছে টেনে নিতে, শক্ত করে ধরে রাখতে। কিন্তু পারলাম না। আমি যে ক্যাথিকে ভালোবাসতাম, তার আর কোন অস্তিত্ব নেই।
অবশেষে চোখ দিয়ে পানি গড়াতে লাগলো আমার। কিছুক্ষণের মধ্যে ভিজে উঠলো দুই গাল।
অন্ধকারে, আমার নিঃশব্দ সেই কান্না দেখার মত কেউ ছিল না।
***
পরদিন সকালে আমাদের দৈনন্দিন নিয়মের কোন ব্যত্যয় ঘটলো না। ও বাথরুমে গেলে কফি বানালাম দু’জনের জন্যে। রান্নাঘরে আসামাত্র কফির কাপটা ধরিয়ে দিলাম হাতে।
“রাতের বেলা অদ্ভুত শব্দ করছিলে,” বলল ক্যাথি। “ঘুমের মধ্যে কথাও বলছিলে।”
“কি বলছিলাম?”
“জানি না। মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝিনি। নেশার ঘোরে কেউ প্রলাপ বকলে সেটা বোঝার কথাও না।” একবার ঘড়ি দেখে চোখ গরম করে দিকে তাকালো ও। “যেতে হবে এখন, নাহলে দেরি হয়ে যাবে।”
কফি শেষ করে কাপটা সিঙ্কে রেখে দিল ক্যাথি। বেরিয়ে যাবার আগে গালে আলতো করে একবার চুমু খেল। ওর ঠোঁটের স্পর্শে প্রায় আঁতকে উঠলাম।
ক্যাথি যাওয়ার পর গোসলে ঢুকলাম। পানি ইচ্ছে করে বেশি গরম করেছি। আরেকটু গরম হলেই শরীর পুড়ে যাবে। সেই গরম পানির নিচে দাঁড়িয়েই বাচ্চাদের মত গলা ছেড়ে কাঁদলাম কিছুক্ষণ। গোসল শেষে শরীর থেকে পানি মুছে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালাম। দেখে মনে হচ্ছে রাতারাতি বয়স ত্রিশ বছর বেড়ে গেছে।
সেখানেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম।
ক্যাথিকে ছেড়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে আমার নিজের একটা অংশ বিসর্জন দেয়া। আর সেরকম কিছু করার জন্যে একদমই তৈরি নই আমি, রুথ যা-ই বলুক না কেন। মানুষ হিসেবে সে-ও ভুলভ্রান্তির উর্ধ্বে নয়। ক্যাথি আর আমার বাবার মধ্যে কোন মিল নেই; অতীতের পুণরাবৃত্তি ঘটছে না আমার জীবনে। ভবিষ্যতে কি হবে সেটা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আছে আমার হয়তো একদিন ভুলটা স্বীকার করবে ক্যাথি, সবকিছু খুলে বলবে। তাকে মাফ করে দিব তখন। আলোচনার মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে আসবো।
কিন্তু ক্যাথিকে ছেড়ে দেয়া সম্ভব নয় আমার পক্ষে। এমন ভাব করবো যেন ইমেইলগুলো কখনো পড়িইনি। ভুলে যাবো ওগুলোর কথা। এছাড়া আমার আর কোন উপায় নেই। হার মানবো না আমি, ভেঙে পড়লে চলবে না। তাছাড়া আমার রোগিদের কথাও তো চিন্তা করতে হবে। তারা নির্ভর করে আছে আমার ওপরে।
এতগুলো মানুষকে আশাহত করা সম্ভব নয় কিছুতেই।
২.১১ এলিফ কোথায় আছে
২.১১
“এলিফ কোথায় আছে জানো?”
কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো ইউরি। “ওকে খুঁজছে কেন?”
“বিশেষ কোন কারণ নেই। এই একটু পরিচিত হতে চাচ্ছিলাম। এখানকার সব রোগিদের সাথেই তো জানাশোনা রাখা দরকার, নাকি?”
চেহারা থেকে সন্দেহ দূর হলোনা ইউরির। “ঠিক আছে। তবে কথা না বললে আবার কিছু মনে করে বসোনা। ওর মেজাজ মর্জির কোন ঠিক ঠিকানা নেই। কিছুক্ষণ আগেই আর্ট থেরাপি সেশন শেষ হয়েছে। এখন খুব সম্ভবত বিনোদন কক্ষে তাকে পাবে।”
