“আমারও দোষ আছে। মিথ্যে তো আমিও বলেছি, গাঁজার ব্যাপারটায়।”
হাসলো রুথ। “মাঝে মাঝে নেশা করা আর অন্য এক ব্যক্তির সাথে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এক কি না সে বিষয়ে সন্দেহ আছে আমার। এই ব্যাপারটা থেকে কিন্তু আমরা মানুষটার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা করতে পারি-সে এমন একজন, যে অবলীলায় মিথ্যে বলে যেতে সক্ষম। কোন প্রকার অনুতাপ ছাড়াই ভালোবাসার মানুষটাকে ঠকিয়ে চলেছে-”
“এটা তো নিশ্চিতভাবে বলতে পারো না তুমি।” কথাটা নিজের কানেই বড় খেলো শোনাচ্ছে। “হয়তো ভেতরে ভেতরে খারাপ লাগে ওর।”
মুখে বললেও কথাটা আমি নিজে বিশ্বাস করি না।
রুথও করলো না। মনে হয় না। আমার ধারণা মানসিক সমস্যায় ভুগছে সে। সহমর্মিতা, সততা, মায়া-ওর কাছে কিছু শব্দ মাত্র। কিন্তু তোমার মধ্যে কিন্তু এগুলোর কোন অভাব নেই।”
মাথা ঝাঁকালাম। “এটা সত্যি না।”
“এটাই সত্যি, থিও।” জোর দিয়ে বলল রুথ। “তোমার কি মনে হচ্ছে না যে আগেও এরকম পরিস্থিতির শিকার হয়েছো?”
“ক্যাথির কারণে?”
মাথা ঝাঁকায় রুথ। “না, তোমার বাবা-মার কথা বলছি। আবারো সেই একই ঘটনা ঘটছে তোমার সাথে। হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন, কিন্তু অনুভূতিগুলো তো একই?”
“না,” হঠাৎই বিরক্তি ভর করলো আমার চিত্তে। “ক্যাথির সাথে যা ঘটছে, তার সাথে আমার শৈশবের কোন সম্পর্ক নেই।”
“আসলেই কি?” রুথের কণ্ঠে অবিশ্বাস। “সবসময় একজনকে খুশি করার অবিরাম চেষ্টা। এমন একটা মানুষ,যার মধ্যে মায়া বা আবেগের ছিটেফোঁটাও নেই-তার ভালোবাসার পাত্র হবার চেষ্টা। আগের কথা মনে হচ্ছে না তোমার, থিও?”
হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল আমার, কিছু বললাম না।
দ্বিধান্বিত স্বরে পরবর্তী কথাগুলো বলল রুথ। “আমি জানি তোমার কতটা খারাপ লাগছে। কিন্তু আমি চাই যেন বাস্তবতাটুকু বুঝতে পারো। ক্যাথির সাথে দেখা হবার অনেক আগে থেকেই এই বেদনাটা তোমার সঙ্গি। অনেক বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছো কষ্টটাকে। খুব পছন্দের কেউ আমাদের পাল্টা ভালোবাসেনা, এই সত্যটা স্বীকার করে নেয়া প্রচণ্ড কষ্টের, থিও। অসহ্য একটা অনুভূতি।”
ঠিক বলেছে সে। আসলে আমার ভেতরে জড়ো হওয়া বিশ্বাসঘাতকতার এই অনুভূতিটাকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারছিলাম না এতক্ষণ। রুথের বলা-”খুব পছন্দের কেউ আমাদের পাল্টা ভালোবাসেনা’-কথাটা একই সাথে আমার অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের গল্প। ব্যাপারটা শুধু ক্যাথির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আমার বাবা, নিঃসঙ্গ শৈশব, না পাবার কষ্ট-সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। যা চাইছি, তা ভবিষ্যতেও পাবার সম্ভাবনা নেই।
রুথের মতে, এজন্যেই আমি ক্যাথিকে বেছে নিয়েছি। আমি যে একটা আস্ত অপদার্থ, ভালোবাসার অনুপযুক্ত-বাবার এই কথাটা প্রমাণ করার জন্যে এতদিন ধরে অপাত্রে নিজের ভালোবাসা ঢেলে এসেছি আমি, যার আসলে আমাকে ভালোবাসার কোন ইচ্ছেই নেই।
দু’হাতে মুখ ঢাকলাম। “তাহলে এমনটাই হবার ছিল? নিজের এই দশার জন্যে আমি নিজেই দায়ি? কোন আশাই নেই?”
“আশা নেই, এই কথাটা ভুল। তুমি তো আর বাবার করুণায় বেঁচে থাকা সেই ছোট্ট থিও নও। এখন পরিণত বয়স্ক একজন মানুষ তুমি। এটাই তোমার সুযোগ-অতীতের নাগপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করো, নতুবা আসলেও প্রমাণ করো যে ভালোবাসার অনুপযুক্ত তুমি। আর একবার যদি নিজেকে মুক্ত করতে পারো, তাহলে আর কখনো এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে না।”
“কিভাবে করবো সেটা? ওকে ছেড়ে দেব?”
“পরিস্থিতিটা তোমার জন্যে আসলেও কঠিন।”
“কিন্তু তোমার মনে হচ্ছে ওকে ছেড়ে দেয়াটাই আমার জন্যে উত্তম হবে, তাই না?”
“আজকের এই অবস্থানে আসতে তোমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। আবারো পুরনো সেই দিনগুলোয় ফিরে যাওয়া কোনভাবেই তোমার প্রাপ্য নয়। সেই মানসিক অত্যাচার আর সহ্য করতে পারবে না। যদি গোটা ব্যাপারটা অস্বীকার করো, তাহলে নিজেকে নিজেই ফাঁদে ফেলবে। তোমার জীবনে এমন কাউকে দরকার, যে মন থেকে ভালোবাসবে।”
“এভাবে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলার দরকার নেই, রুথ। সোজাসুজিই বলো কথাটা। তোমার ধারণা ক্যাথিকে ছেড়ে দেয়া উচিৎ আমার।”
আমার চোখে দিকে তাকালো রুথ। “আমার মনে হয়, ওকে ছেড়ে দেয়াটাই তোমার জন্যে সবচেয়ে ভালো হবে। কথাটা শুধু থেরাপিস্ট হিসেবে নয়, পুরনো বন্ধু হিসেবে বলছি। আমার মনে হয় না এরকম একটা ঘটনার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবে তুমি। বড়জোর কিছুদিন মানিয়ে চলার চেষ্টা করতে পারো। কিন্তু এরপর আবারো তোমাকে এই কাউচে ফিরে আসতে হবে। সত্যটা স্বীকার করে নাও থিও, নিজের আর ক্যাথির ব্যাপারে। মনে রেখ যে ভালোবাসার সম্পর্কে সততা নেই, সেটা। কখনোই প্রকৃত ভালোবাসা হতে পারে না।”
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আমার বুক চিরে।
“ধন্যবাদ রুথ, এভাবে খোলাখুলি কথাটা বলার জন্যে। আমি আসলেও কৃতজ্ঞ।”
বেরিয়ে আসার সময় দরজার কাছে আমাকে একবার জড়িয়ে ধরলো রুথ। আগে কখনো এরকম কিছু করেনি। ওকে বড্ড বেশি দুর্বল লাগছে আজকে, একদম নাজুক। ওর সেই পুরনো পারফিউমটার গন্ধটা নাকে আসতেই মনে হলো এই বুঝি কেঁদে ফেলবো। কিন্তু কাঁদলাম না। কিংবা, কাঁদতে পারলাম না।
বরং একবারও পিছে না ফিরে চলে এলাম সেখান থেকে।
বাসায় ফেরার জন্যে বাসে উঠে জানালার পাশে একটা সিটে বসলাম। বারবার ক্যাথির কথা মনে হচ্ছে, বিশেষ করে ওর সবুজ চোখজোড়ার কথা। কিন্তু রুথ ঠিকই বলেছে, যে ভালোবাসার সম্পর্কে সততা নেই, সেটা কখনোই প্রকৃত ভালোবাসা হতে পারে না।
