“সত্যি বলতে, চায়ের থেকে শক্ত কিছু হলেই ভালো হবে।”
তীক্ষ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেও কিছু বলে না রুথ। মানাও করলো না। অবশ্য মানা যে করবে এরকমটা আশাও করিনি।
একটা গ্লাসে শেরি ঢেলে আমার দিকে এগিয়ে দিল। কাউচে বসেছি আমি। আগে থেরাপির জন্যে আসলেও এখানেই বসতাম সবসময়। একদম বামদিকে, হাতলে হাত রেখে। আমার হাতের নিচের কাপড়টা এতদিনের ব্যাবহারে পাতলা হয়ে এসেছে। থেরাপির জন্যে আসা অন্য রোগিরাও নিশ্চয়ই আমার মত আঙুল দিয়ে অনবরত খুটিয়েছে জায়গাটা।
গ্লাসে চুমুক দিলাম একবার। উষ্ণ আর অতিরিক্ত মিষ্টি তরলটুকু গিলতে কষ্ট হলেও কোন রা করলাম না। গোটা সময়টা কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো রুথ। তবে দৃষ্টিটার মধ্যে অস্বস্তিদায়ক কিছু নেই। গত বিশ বছরে এক মুহূর্তের জন্যেও আমাকে অস্বস্তিতে ফেলেনি সে। শেরির গ্লাসটা শেষ করার আগ পর্যন্ত মুখ খুললাম না।
“গ্লাস হাতে তোমার সামনে বসে থাকতে অদ্ভুত লাগছে, রুথ। জানি যে রোগিদের ড্রিঙ্ক করাটা পছন্দ নয় তোমার।”
“তুমি তো আর আমার রোগি নো, থিও। এখন আমরা বন্ধু। আর তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, কোমল কন্ঠে বলল রুথ, “এ মুহূর্তে একজন বন্ধুর খুব দরকার তোমার।”
“আমার অবস্থা এতটাই শোচনীয়?”
“হ্যাঁ। আর গুরুতর কিছু না হলে তো এভাবে আমার কাছ ছুটে আসতে না। তাও এত রাতে।”
“ঠিক ধরেছো। আসলে, আসলে আমার আর কোন উপায় ছিল না।”
“কি হয়েছে থিও? খুলে বলো সবকিছু।”
“জানি না কীভাবে বলবো। কোথা থেকে শুরু করবো।”
“একদম প্রথম থেকেই বলল নাহয়?”
মাথা নেড়ে লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে শুরু করলাম। যা ঘটেছে, একে একে সব খুলে বললাম ওকে। কিভাবে আবারো গাঁজার নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছি, ক্যাথির ইমেইল চালাচালি, বাসায় দেরি করে আসা, পরকীয়া-সব। টের পাচ্ছিলাম যে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত কথা বলছি। আসলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে এগুলো বলে বুকটাকে হালকা করতে চাইছিলাম।
আমার কথার মাঝে কিছু বলল না রুথ। একমনে শুনে গেল পুরোটা। চেহারা দেখে অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না মনে কি চলছে। “তোমার জন্যে খুব কষ্ট লাগছে থিও। জানি যে ক্যাথি তোমার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কতটা ভালোবাসো ওকে।”
“হা। আমি-” ক্যাথির নামটা মুখে আনতে পারলাম না। গলা কেঁপে উঠলো। সেটা বুঝতে পেরে একটা টিস্যু বক্স আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলো রুথ। এর আগে আমাদের সেশনের মাঝে ও এই কাজ করলে রেগে উঠতাম। বলতাম যে ইচ্ছে করে আমাকে কাঁদানোর চেষ্টা করছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অবশ্য সফলও হতো। কিন্তু আজ নয়। আজ যেন চোখের পানি শুকিয়ে গেছে আমার।
ক্যাথির সাথে পরিচয় হবার অনেক আগে থেকেই রুথের এখানে নিয়মিত যাতায়ত করতাম আমি। এমনকি আমাদের সম্পর্কের প্রথম তিন বছরেও থেরাপির জন্যে এসেছি। ক্যাথির সাথে পরিচয় হবার কিছুদিন পর একটা কথা বলেছিল রুথ। “জীবনসঙ্গি বেছে নেয়া অনেকটা থেরাপিস্ট বাছাই করার মতন। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, এই ব্যক্তি কি জীবনের প্রতিটা ধাপে সৎ থাকবে আমার প্রতি আমার অভিযোগগুলো শুনবে? ভুল স্বীকার করে নেবে? মিথ্যে ওয়াদা করবে না তো?”
ক্যাথিকে এই কথাগুলো বলেছিলাম আমি। তখন ও পরামর্শ দেয় নিজেদের মধ্যে একটা চুক্তি করার। একে অপরকে আমরা কথা দেই যে কখনো পরস্পরের সাথে মিথ্যে বলবো না, কিছু লুকোবো না। সত্যিটাই বলবো সবসময়।
“কি হলো এটা?” বললাম। “ভুলটা কি আমার?”
মুখ খোলার আগে কিছুক্ষণ ইতস্তত করলো রুথ। ও যা বলল শুনে অবাক না হয়ে পারলাম না।
“এর জবাব জানাই আছে তোমার। সত্যটা কেবল স্বীকার করে নিতে হবে নিজের কাছে।”
“আমি জানি না,” মাথা ঝাঁকিয়ে বলি। “আসলেও জানি না।”
অস্বস্তিদায়ক একটা নীরবতা ভর করলো ঘরে। কল্পনার চোখে দেখতে পেলাম হাসিমুখে ইমেইলগুলো টাইপ করে চলেছে ক্যাথি। তৃপ্তি খেলা করছে চোখেমুখে। অচেনা লোকটার সাথে সম্পর্কে কোন রাখঢাক নেই। ওর। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করার বিষয়টা ওর কাছে একটা অ্যাডভেঞ্চারের মতন। বাস্তব জীবনে অভিনয় করার মজাই আলাদা।
“আমাদের সম্পর্কটা একঘেয়ে লাগতে শুরু করেছে ওর কাছে।”
“এরকমটা মনে হবার কারণ?”
“কারণ জীবনে উত্তেজনার প্রয়োজন ওর। সোজা বাংলায়, নাটকীয়তা। প্রায়ই বলতো যে, আমাদের সম্পর্কটা পানসে হয়ে গেছে, সবসময় ক্লান্ত থাকি আমি, বেশি কাজ করি। বেশ কয়েকবার কথা কাটাকাটিও হয়েছে গত কয়েক মাসে। জ্বলে ওঠা শব্দটা ব্যবহার করেছে বারবার।”
“জ্বলে ওঠা?”
“একে অপরের সংস্পর্শে আমরা নাকি আর জ্বলে উঠি না।”
“ওহ, আচ্ছা।” মাথা নাড়ে রুথ। “এই ব্যাপারে তো আগেও কথা হয়েছে আমাদের, তাই না?”
“জ্বলে ওঠার ব্যাপারে?”
“ভালোবাসার ব্যাপারে। প্রায়ক্ষেত্রেই ভালোবাসার মধ্যে নাটকীয়তা খুঁজতে চাই আমরা। যেন বারবার একে অপরের জন্যে নাটুকে কিছু করাই ভালোবাসার নিদর্শন। কিন্তু প্রকৃত ভালোবাসা নীরব, নির্লিপ্ত।” লম্বা শ্বাস ছাড়ে রুথ। “ভালোবাসা হচ্ছে গভীর, প্রশান্ত একটা অনুভূতি। ধ্রুব। ক্যাথির প্রতি তোমার ভালোবাসার মধ্যে কোন খাদ নেই। কিন্তু সেই ভালোবাসাটুকু তোমাকে সে ফিরিয়ে দিতে পারছে কি না, এটা ভিন্ন প্রশ্ন।”
টিস্যুর বক্সটার দিকে চেয়ে আছি। রুথের কথার ধরণ ভালো লাগছে না। বিষয় পরিবর্তনের চেষ্টা করি।
