বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের সেই দিনগুলোয় যেন ফিরে গেলাম আবারো। প্রতিনিয়ত নিজেকে শেষ করে দেয়ার কথা মনে হতো যখন। সেই ভোতা অনুভূতিটা ফিরে এসেছে। মার কথা মনে হলো এসময়। তাকে ফোন দিব? আমার এরকম একটা পরিস্থিতিতে তার কাছে আশ্রয় চাইবো? কল্পনা করলাম যে ফোনের ওপাশ থেকে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে আমার সাথে কথা বলছে সে। গলার স্বর কতটা কাঁপবে, সেটা নির্ভর করে বাবার মেজাজ আর সে কতটা মাতাল, এই দুটো বিষয়ের ওপর। হয়তো সহানুভূতি নিয়েই আমার কথা শুনবে সে, কিন্তু তার মন পড়ে থাকবে অন্যখানে। বাবা আর তার বদমেজাজ নিয়েই ভাববে সারাক্ষণ। এরকম একটা মানুষ কিভাবে আমার সাহায্য করবে? একজন ডুবন্ত ব্যক্তি তো আরেকজনকে বাঁচাতে পারে না।
বাসা থেকে বের হতে হবে। ভেতরে রীতিমতো দম আটকে আসছে এখন। তার ওপর লিলিগুলোর উটকো গন্ধ। খোলা বাতাসে শ্বাস নেয়া প্রয়োজন।
বেরিয়ে এলাম ফ্ল্যাট থেকে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে মাথা নিচু করে হাঁটতে থাকি। কোন নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই, ইতস্তত হেঁটে বেড়াচ্ছি এদিক সেদিক। মনে মনে ক্যাথি আর আমার সম্পর্কের কথা ভাবছি। বোঝার চেষ্টা করছি কবে থেকে এসবের শুরু। বেশ কিছুদিন ধরেই ঘনঘন কথা কাটাকাটি হতো আমাদের, প্রায়ই দেরি করে বাসায় ফিরতো ও। কিন্তু আমার প্রতি তার আবেগে তো কখনো ঘাটতি ছিল বলে মনে হয়নি। এটা কি করে সম্ভব? পুরোটা সময়ই অভিনয় করেছে ও? আমাকে কি আদৌ কখনো ভালোবেসেছিল?
ওর বন্ধুদের সাথে প্রথম দেখা হবার দিনে ক্ষণিকের জন্যে হলেও সন্দেহ ভর করেছিল আমার মনে। ওরা সবাই অভিনেতা-অভিনেত্রী। নিজেদের ছাড়া কিছু বোঝে না, অন্যদের সমালোচনা করতেই থাকা ক্রমাগত। হঠাই স্কুলের দিনগুলোয় ফিরে গেলাম, দূর থেকে অন্য বাচ্চাদের খেলা করতে দেখতাম তখন। আমাকে কেউ খেলায় নিত না। আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে ক্যাথি ওদের মতো নয়, কিন্তু ভুল ভেবেছিলাম। যে রাতে বারে ওর সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল, তখন যদি ওর বন্ধুরা উপস্থিত থাকতো, তাহলে কি আমাদের সম্পর্কটা হতো না? অবশ্যই হতো। ক্যাথির ওপর প্রথমবার চোখ পড়ার পর থেকেই বুঝে গিয়েছিলাম যে আমার ভাগ্যটা ওর সাথেই বাঁধা।
কী করা উচিৎ এখন আমার?
অবশ্যই ক্যাথিকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা উচিৎ এ ব্যাপারে। যা দেখেছি, সেগুলো খুলে বলা উচিৎ। প্রথমে হয়তো অস্বীকার করবে, কিন্তু প্রমাণের কথা বললে সত্যটা স্বীকার না করে পারবে না। অনুশোচনার বশবর্তী হয়ে তখন আমার কাছে ক্ষমা চাইবে সে, তাই না?
আর যদি না চায়? যদি উল্টো আমাকেই কথা শোনায়? পুরো বিষয়টা হেসে উড়িয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে কি করবো?
দুজনের কথা চিন্তা করলে, হারানোর ঝুঁকিটা আমারই বেশি। ক্যাথির মানিয়ে নিতে সমস্যা হবে না, সবসময়ই বলে এসেছে যে ওর নার্ভ খুব শক্ত। নিজেকে ধাতস্থ করে আমাকে ভুলে যাবে একসময়। কিন্তু আমি তো ভুলতে পারবো না। কি করে ভুলবো? ক্যাথিকে ছাড়া আমাকে আবারো ফিরে যেতে হবে সেই একাকীত্ব আর শূন্যতা ভরা জীবনে। ওর মত কারো সাথে আর কখনো পরিচয়ও হবে না। কারো প্রতি এরকম আত্মিক বন্ধনও টের পাবো না। ও হচ্ছে আমার জীবনের সত্যিকারের ভালোবাসা, আমার জীবন। ওকে ছেড়ে দেয়া সম্ভব নয় আমার পক্ষে। আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে ও, এটা সত্য। তবুও ভালোবাসি ওকে।
আমার মাথা বোধহয় আসলেও খারাপ।
পাখির ডাকে হুঁশ ফিরে পেলাম। চারপাশে নজর বুলিয়ে দেখি বাসা থেকে অনেক দূরে এসে পড়েছি হাঁটতে হাঁটতে। অবাক হয়ে খেয়াল করলাম যে এখন যেখানে আছি, তার কয়েকটা রাস্তা পরেই রুথের বাসা।
কোনরকমের পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই বিপর্যয়ের মুহূর্তে অবচেতন মনে হাঁটতে হাঁটতে আমার থেরাপিস্টের কাছে চলে এসেছি। অতীতেও এমনটাই করতাম। আমার অবস্থা কতটা খারাপ, তা আরো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এখন।
কিন্তু এটা নিয়ে এত ভাবনা চিন্তার কি আছে? ভাবলাম। হ্যাঁ, একজন সাইকোথেরাপিস্ট হিসেবে কাজটা অপেশাদার, কিন্তু এ মুহূর্তে আমি মরিয়া, সাহায্য দরকার। রুথের সবুজ দরজাটার বাইরে দাঁড়িয়ে কলিংবেলে চাপ দিলাম।
দরজা খুলতে কিছুক্ষণ সময় লাগলো তার। হলওয়েতে বাতি জ্বেলে দরজা খুলল, চেইনটা অবশ্য সরায়নি।
দরজার ফাঁকটুকু দিয়ে মাথা বের করলো রুথ। বয়সের ছাপ পড়েছে। চেহারায়। আশির কোঠায় এখন তার বয়স। আগের তুলনায় ভেঙে পড়েছে শরীর। ফ্যাকাসে গোলাপী রঙের নাইট গাউনের ওপরে একটা ধূসর কার্ডিগান পরে আছে।
“হ্যালো?” বিচলিত কণ্ঠে বলল রুথ। “কে ওখানে?”
“হ্যালো, রুথ,” আলোয় বেরিয়ে এলাম।
আমাকে চিনতে পেরে অবাক হয়ে গেল সে। “থিও? তুমি হঠাৎ-” আমাকে আপাদমস্তক দেখলো একবার, হাতে কোনরকমে জড়ানো ব্যান্ডেজটার ওপর দৃষ্টি স্থির হলো। “ঠিক আছো তুমি?”
“না, ঠিক নেই। ভেতরে আসতে পারি? আমি…আমি তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই।”
একমুহূর্তের জন্যেও দ্বিধা দেখতে পেলাম না রুথের দৃষ্টিতে, বরং আমার জন্যে উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে। “অবশ্যই,” মাথা নেড়ে বলল। “ভেতরে এসো।” চেইনটা আলগা করে সরে দাঁড়ালো সে।
ভেতরে পা দিলাম আমি।
.
২.৯
আমাকে লিভিং রুমে নিয়ে এলো সে।
“চা খাবে?”
রুমটার কিছুই বদলায়নি। সেই আগের কার্পেট, ভারি পর্দা, ম্যান্টেলের ওপর রাখা রূপালী ঘড়ি, আর্মচেয়ার, নীল কাউচ। ভেতরে ভেতরে স্বস্তি অনুভব করলাম।
