মাথা ঝাঁকায় অ্যালিসিয়া। যেন অমত প্রকাশ করছে আমার কথার সাথে। ভালো করে খেয়াল না করলে ধরতেই পারতাম না। অবশেষে! অবশেষে একটু হলেও প্রতিক্রিয়া দেখালো অ্যালিসিয়া। উত্তেজিত হয়ে উঠলাম ভেতরে ভেতরে। জানি যে থেমে যাওয়া উচিৎ, কিন্তু থামলাম না।
“আপনার একটা অংশ তাকে ঘৃণা করতো,” আগের তুলনায় দৃঢ়কণ্ঠে বললাম।
আবারো মাথা কঁকালো অ্যালিসিয়া। চোখে আগুন জ্বলছে রীতিমতো। রেগে উঠছে, ভাবলাম।
“এটাই সত্য, অ্যালিসিয়া। নাহলে তাকে খুন করতেন না আপনি।”
লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো অ্যালিসিয়া। ভাবলাম এই বুঝি ঝাঁপিয়ে পড়বে আবারো। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে দরজার দিকে হনহন করে হেঁটে গেল সে। হাত মুঠো করে সজোরে কিল দিল কয়েকবার।
নবে চাবি ঘোরানোর শব্দ কানে এলো সাথে সাথে-বাইরেই অপেক্ষা করছিল ইউরি। অ্যালিসিয়া যে আমার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েনি এটা দেখে স্বস্তি ফুটলো তার চেহারায়। তাকে পাশ কাটিয়ে করিডোরে বেরিয়ে যায় অ্যালিসিয়া।
“আস্তে যাও, আস্তে আমার দিকে তাকালো নজর ফেরায় ইউরি। “সব ঠিক আছে তো? কি হয়েছে?”
কিছু বললাম না জবাবে। উদ্ভট দৃষ্টিতে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে যায় সে। এখন ঘরে একা আমি।
গর্দভ, মনে মনে বলে উঠলাম। আস্ত গর্দভ। এটা কি করলাম আমি? তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে বেশি বেশি বলে ফেলেছি। পেশাদার কোন সাইকোথেরাপিস্টের এরকম ভুল করা সাজে না। অ্যালিসিয়ার মানসিক অবস্থা জানতে গিয়ে নিজেকে উন্মোচিত করে দিয়েছি পুরোপুরি।
কিন্তু অ্যালিসিয়ার ব্যাপারটাই এমন। তার মৌনতা অনেকটা আয়নার মতন-যে আয়নায় নিজের ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।
আর দশ্যটা সবসময় সুখকর হয় না।
.
২.৮
ক্যাথির ল্যাপটপটা এভাবে খুলে রেখে যাওয়ার পেছনে যে কোন কারণ আছে সেটা বোঝার জন্যে আপনাকে সাইকোথেরাপিস্ট হতে হবে না। হয়তো অবচেতন মনে হলেও সে চাইছিল যাতে আমি তার পরকীয়ার বিষয়টা জানতে পারি।
পদ্ধতিটা কাজে দিয়েছে। জেনে গেছি আমি।
সেই রাতের পর থেকে এখন অবধি ওর সাথে কথা হয়নি আমার। ও বাসায় আসার পর ঘুমের অভিনয় করেছি, এরপর সকাল সকাল ও ওঠার আগেই বেরিয়ে গেছি। ওকে এড়িয়ে চলছি-নিজেকে এড়িয়ে চলছি। পুরো ব্যাপারটা মেনে নিতে এখনও কষ্ট হচ্ছে। তা সত্ত্বেও সত্যটার মুখোমুখি হতে হবে, নতুবা নিজেকে হারিয়ে ফেলবো আবারো। শক্ত হও, একটা জয়েন্ট রোল করতে করতে নিজেকে বিড়বিড় করে বললাম। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে জয়েন্টটা শেষ করে চলে এলাম রান্নাঘরে। কেবিনেট থেকে ওয়াইনের বোতল বের করে একটা গ্লাসে ঢেলে নিলাম। মাথায় নেশা ধরে গেল এতক্ষণে।
চেষ্টা করেও গ্লাসটা তুলতে পারলাম না। বরং হাত থেকে ছুটে কাউন্টারের ওপর পড়ায় ভেঙেই গেল। কাঁচের টুকরো লেগে একটা আঙুল কেটে গেছে।
হঠাই আবিষ্কার করলাম, রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। কাঁচের টুকরোয় রক্ত, আমার হাতে রক্ত, সাদা টেবিলের ওপর রক্ত। একটা কিচেন ন্যাপকিন ছিঁড়ে নিয়ে কাটা আঙুলে গিঁট দিয়ে বেঁধে রক্তের ধারা সামাল দেয়ার চেষ্টা করলাম। হাতটা ওপরে তুলে রেখেছি। আঙুল থেকে রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। দেখে মনে হচ্ছে চামড়ার ভেতরের শিরাগুলো কেউ উল্টে দিয়েছে।
ক্যাথির ব্যাপারে ভাবছি।
এরকম একটা মুহূর্তে সবার আগে ক্যাথির কথাই মনে আসে আমার। যখনই কোন বিপদে পড়ি বা সান্ত্বনার প্রয়োজন হয়, ওর কাছে সপে দেই নিজেকে। গালে একবার চুমু খেয়েই আমার ভেতরের সব দুশ্চিন্তা দূর করে দিতে পারে ক্যাথি। আমি চাই, সবসময় আমার খেয়াল রাখুক ও। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে রাতারাতি আমাদের মাঝে একটা দেয়াল তৈরি হয়ে গেছে। ওকে হারিয়ে ফেলেছি আমি। অদ্ভুত বিষয়, সত্যটা জানার পর এখন অবধি চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়ায়নি আমার, আপ্রাণ চেষ্টা করেও কাঁদতে পারছিলাম না। ভেতরটা যেন কেউ কাঁদা দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে।
“কেন, বারবার বলতে থাকি আমি, “কেন।”
ঘড়ির কাটার শব্দে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। স্বাভাবিকের চাইতে জোরে মনে হচ্ছে আওয়াজটা। সেই আওয়াজের ওপর মনোযোগ দিয়ে বিক্ষিপ্ত মনটাকে স্বাভাবিক করতে চাইলাম; কিন্তু আমার মাথার ভেতরে একসাথে কয়েকটা কণ্ঠ তারস্বরে চিৎকার করেই চলেছে। এরকমটাই তো হবার কথা ছিল, ভাবলাম। তার জন্যে যে আমিই যথেষ্ট, এটা ধরে নেয়াই তো মারাত্মক ভুল। আমি একটা আস্ত অপদার্থ। বামন হয়ে চাঁদের পানে হাত বাড়ালেই কি চাঁদটাকে পাওয়া যায়? আমার প্রয়োজনীয়তা নিশ্চয়ই ইতিমধ্যেই ফুরিয়ে গেছে ওর কাছে। আসলে ওকে নিজের করে পাবার যোগ্যতা আমার কখনোই ছিল না। মাথার ভেতরে এই চিন্তাগুলোই ঘুরপাক খেতে লাগলো বারবার।
ওকে চিনতে ভুল করেছিলাম। ইমেইলগুলো পড়ার পর থেকে মনে হচ্ছে এতদিন সম্পূর্ণ অপরিচিত এক ব্যক্তির সাথে সংসার করেছি আমি। এখন সত্যটা বুঝতে পারছি। ক্যাথি আমাকে আমার দুর্দশা থেকে উদ্ধার করেনি-আসলে কাউকে উদ্ধার করার ক্ষমতাই নেই ওর। কোন দেবী নয়। সে, বরং খারাপ চরিত্রের ব্যাভিচারী একটা মেয়ে। ওকে আর আমাকে নিয়ে সুখি জীবনের আকাশ কুসুম যেসব কল্পনা করে এসেছি এতদিন, তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়লো সব।
