এবারেও কোন জবাব পেলাম না। একটু ইতস্তত বোধ করছি এখন।
“ব্যাপারটা কি আমার জন্যে কোন পরীক্ষা ছিল? আমি কেমন ধাতুতে গড়া সেটাই দেখতে চাইছিলেন? খুব সহজে হাল ছাড়বার পাত্র নই, এটা জেনে রাখুন। সব রকম পরিস্থিতি সামলে নেয়ার ক্ষমতা আছে।”
এখনও জানালার বাইরের ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে অ্যালিসিয়া। এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলাম আমি।
“আপনাকে একটা কথা বলতে চাই অ্যালিসিয়া। আমি কিন্তু আপনার পক্ষে। আশা করি একদিন এটা বিশ্বাস করবেন। ভরসা তৈরি হতে সময় লাগে, জানি। আমার পুরনো থেরাপিস্ট প্রায়ই বলতেন যে ঘনিষ্ঠতার জন্যে নিয়মিত মনের ভাব আদান প্রদানের প্রয়োজন। আর সেটা রাতারাতি হয় না।”
শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো অ্যালিসিয়া। সময় কেটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এখন মনে হচ্ছে এটা থেরাপি সেশন তো নয়, ধৈৰ্য্য পরীক্ষা।
এখন পর্যন্ত কোন দিক দিয়েই অগ্রগতি হয়নি। বোধহয় সময় নষ্ট করছি। ডুবন্ত জাহাজ থেকে ইঁদুরদের লাফিয়ে পড়ার ব্যাপারে ভুল বলেনি ক্রিস্টিয়ান। এরকম একটা জায়গায় যোগ দিয়ে মাস্তুল ধরে কোনমতে ভেসে থাকার মানে হয় না। কি আছে এখানে?
উত্তরটা আমার সামনেই। যেমনটা ডায়োমেডেস সতর্ক করেছিলেন, মৎসকুমারীর বেশে অ্যালিসিয়া আমাকে আমার সর্বনাশের দিকে ডেকে এনেছে।
মনে মনে হঠাই ভীষণ মরিয়া হয়ে উঠলাম। ইচ্ছে করছে চিৎকার করি, কিছু একটা বলুন। যা খুশি। একবারের জন্যে মুখ খুলুন।
কিন্তু সেরকম কিছু করলাম না। বরং থেরাপির স্বতঃসিদ্ধ পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। ধীরে সুস্থে না এগিয়ে সরাসরি কাজের কথা তুলোমঃ
“আপনার নীরবতা নিয়ে কথা বলতে চাই। এই নীরবতার পেছনের অর্থটা বুঝতে চাই…আশা করি বোঝাতে পারছি আপনাকে। কথা বলা কেন বন্ধ করলেন সেটা জানাটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি।”
আমার দিকে তাকালোও না অ্যালিসিয়া। কথা কানে যাচ্ছে তো?
“জানেন, আমার মাথায় একটা ছবি ভাসছে এখন। মনে হচ্ছে কেউ যেন জোর করে নিজেকে দমিয়ে রেখেছে, ফেটে পড়বে যে কোন মুহূর্তে, অনবরত ঠোঁট কামড়াচ্ছে, দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ। প্রথম যখন থেরাপি শুরু করেছিলাম, কাঁদতে পারতাম না কোনভাবেই। মনে হতো সেই অশ্রুপ্রবাহে আমি নিজেই হারিয়ে যাবো। আপনারও বোধহয় সেরকমই অনুভূত হচ্ছে। এটা জেনে রাখুন যে এই যাত্রায় আপনার সঙ্গি আমি। আমাকে ভরসা করতে পারেন।”
মৌনতা।
“আমি নিজেকে একজন রিলেশনাল থেরাপিস্ট ভাবতে পছন্দ করি। এর অর্থ কি জানেন?”
মৌনতা।
“এর অর্থ আমার ধারণা ফ্রয়েড কিছু ব্যাপারে ভুল বলেছিলেন। একজন থেরাপিস্টকে কোনভাবেই সাদা কাগজের সাথে তুলনা করা যাবে না। সচেতন বা অবচেতন মনে নিজেদের সম্পর্কে অনেক কিছুই আমরা প্রকাশ করে ফেলি। মানে কেউ কেমন মোজা পরেছে, কিভাবে কথা বলছে, কিভাবে বসেছে-এগুলো দেখেও তো অনেক কিছু বোঝা যায়। হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও কিন্তু নিজেকে পুরোপুরি লুকোতে পারবো না আমি।”
মুখ তুলল অ্যালিসিয়া। ঘাড় কাত করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে এখন-আমাকে চ্যালেঞ্জ করছে? অন্তত তার মনোযোগ আকর্ষণে তো সক্ষম হয়েছি। নড়েচড়ে বসলাম চেয়ারে।
“মূলত যেটা বলতে চাচ্ছি, এ ব্যাপারে আমরা কি করতে পারি? চাইলে সত্যটাকে উপেক্ষা করতে পারি। ধরে নিতে পারি যে এই থেরাপিটার মধ্যমণি কেবলই আপনি। অথবা এটা মেনে নিতে পারি যে গোটা ব্যাপারটাই দ্বিপাক্ষিক। এভাবে সামনে এগোনোই বোধহয় সুবিধের হবে।”
আমার বাম হাতটা সামনে মেলে ধরে আঙটি পরা আঙুলটা নাচালাম।
“এই আঙটিটা দেখে কি মনে হচ্ছে আপনার?”
ধীরে ধীরে আঙটিটার দিকে তাকালো অ্যালিসিয়া।
“নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে আমি বিবাহিত। আমার একজন স্ত্রী আছে যার সাথে নয় বছর ধরে সংসার করছি।”
কোন জবাব পেলাম না এবারেও, তবে আঙটিটার দিক থেকে দৃষ্টি সরায়নি অ্যালিসিয়া।
“আপনার বিবাহিত জীবন তত সাত বছরের ছিল, তাই না?”
জবাব নেই।
“আমার স্ত্রীকে প্রচণ্ড ভালোবাসি আমি। আপনি কি স্বামীকে ভালোবাসতেন?”
নড়ে উঠলো অ্যালিসিয়ার চোখজোড়া। আমার মুখের ওপর এসে স্থির হলো দৃষ্টি। একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকি লম্বা একটা সময়।
“ভালোবাসা কিন্তু নানারকম অনুভূতির মিশেল, তাই না? ভালো খারাপ দুটোই। আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসি, ওর নাম ক্যাথি। মাঝে মাঝে কিন্তু ভীষণ রাগও হয়…সেই সময়গুলোয় ওকে ঘৃণা করি।
এখনও অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে অ্যালিসিয়া; নিজেকে রাস্তা পার হবার সময় হেডলাইটের সামনে জমে যাওয়া ছোট্ট খরগোশের মতন মনে হচ্ছে আমার। পার্সোনাল অ্যাটাক অ্যালার্মটা আজকে হাতের কাছেই রেখেছি। ওটার দিকে না তাকাতে বেশ কসরত করতে হলো।
জানি যে এভাবে কথা চালিয়ে যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে না, কিন্তু নিজেকে থামাতে পারলাম না। গোঁয়ারের মতন বলতেই থাকলাম:
“এই ঘৃণার অর্থ কিন্তু এটা নয় যে পুরোপুরি মন থেকে অপছন্দ করি ওকে। বরং বলা যায় আমার মনের একটা ক্ষুদ্র অংশ এরকম অনুভূতির জন্যে দায়ি। সেসময়টা ভালোবাসা আর ঘৃণা সহাবস্থান করে। গ্যাব্রিয়েলের ক্ষেত্রেও বোধহয় ওরকম কিছুই হয়েছিল। আপনার একটা অংশ তাকে ভালোবাসতো, আবার একটা অংশ তাকে ঘৃণাও করতো।
