নেশার উৎপত্তি কিভাবে সেটা নিয়ে গবেষণা হয়েছে বিস্তর। ব্যাপারটা বংশগত হতে পারে; বিশেষ রাসায়নিকের প্রতি তীব্র আকর্ষণ থেকেও হতে পারে; আবার মানসিকও হতে পারে। কিন্তু গাঁজা যে শুধু আমার মাথা ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করছিল এমনটা নয়। বরং বলা যায় আমার আবেগগুলো সামলানোর ধরণই পাল্টে দিয়েছিল। মায়েরা যেভাবে বাচ্চাদের আগলে রাখে, ঠিক তেমনি আমাকে আগলে রেখেছিল গাঁজা। জানি, কতটা অদ্ভুত শোনাচ্ছে কথাটা।
সোজা কথায়, আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল গাঁজার নেশা।
বিখ্যাত সাইকোঅ্যানালিস্ট ডঃ বিয়ন শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের বিপদ থেকে রক্ষা করার মায়েদের যে তাগিদ, সেটাকে আখ্যায়িত করেছেন ‘সংযমন হিসেবে। একটা কথা মনে রাখতে হবে এক্ষেত্রে, শৈশবকাল কিন্তু নিছক আনন্দের খোরাক নয়। বরং এর প্রতি পদে পদে আছে বিপদের সমূহ সম্ভাবনা। একটা বাচ্চা শুরুতে নিজে থেকে কিছুই করতে পারে না। ক্ষুধা লাগলেও ভয় পায় আবার বাথরুম পেলেও ভয় পায়। সেজন্যেই আমাদের প্রত্যেকের প্রয়োজন আমাদের মায়ের। কারণ মায়েরা যখন এসব চাহিদা পূরণ করে, তখন থেকেই নিজেদের খুঁজে পেতে শুরু করি আমরা। এক পর্যায়ে গিয়ে নিজেদের সাহায্য নিজেরাই করতে পারি। কিন্তু আমাদের পারিপার্শ্বিকতার সাথে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতাটা নির্ভর করে মায়েদের ‘সংযমন ক্ষমতা কতটা নির্ভরযোগ্য সেটার ওপরে। ডঃ বিয়নের মতে কেউ যদি শৈশবে এই অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে বাকিটা জীবন একধরণের অজানা আশঙ্কা নিয়ে কাটাতে হবে তাকে। আর চিত্তের সেই অস্থিরতা কমানোর জন্যেই মাদক বা নেশাজাতীয় বস্তুর শরণাপন্ন হয় মানুষ। অনেককেই বলতে শুনবেন যে নার্ভ ঠিক রাখার জন্যে ড্রিঙ্ক করে তারা। আমার গাঁজার প্রতি আসক্তির কারণও এটাই।
থেরাপি চলাকালীন সময়ে রুথের সাথে গাঁজার ব্যাপারটা নিয়ে অনেক কথা বলেছি। বারবার ছেড়ে দেয়ার কথা ভেবেছি, কিন্তু সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারিনি। রুথ তখন বলে, জোর করে কোন কিছু করার ফল কখনোই ভালো হয় না। এর চেয়ে বরং জোর করে গাঁজার নেশা ছাড়ার চেষ্টা করার চাইতে আমার এটা মেনে নেয়া উচিৎ যে স্বাভাবিকভাবে বাঁচার জন্যে নেশাটার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি আমি। আমার জীবনে গাঁজার প্রভাবটা তখন অবধি ইতিবাচকই ছিল। এমন একটা সময় আসবে যখন আর স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্যে গাঁজার কোন প্রয়োজন হবে না। তখন নেশাটা খুব সহজেই পরিত্যাগ করতে পারবো।
ঠিকই বলেছিল রুথ। ক্যাথির প্রেমে পড়ার পর গাঁজার নেশা কেটে যায়। তখন বরং ওর প্রেমে নেশাতুর থাকতাম সারাটা সময়, তাই মন ভালো করার জন্যে বাড়তি কোন কিছুরই দরকার ছিল না। তাছাড়া ক্যাথির ধূমপানের অভ্যাস না থাকায় ব্যাপারটা আরো সহজ হয় আমার জন্যে। ক্যাথির মতে গাঁজাখোরদের ইচ্ছেশক্তি বলতে কিছু নেই আর তাদের পরোটা জীবন একটা ঘোরের মধ্যেই কাটে। যদি ছয়দিন আগে তাদের শরীরের কোথাও কেটে যায়, তাহলে ছয়দিন পরে গিয়ে সেটা বুঝতে পারবে। ক্যাথি আমার অ্যাপার্টমেন্টে ওঠার দিন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গাঁজা ফোকা ছেড়ে দেই আমি।
ক্যাথির বান্ধবী নিকোলের পার্টিটায় না গেলে আমি হয়তো জীবনে আর কখনো ঠোঁটে গাঁজা ছোঁয়াতাম না। নিউ ইয়র্কে চলে যাবার আগে বড় একটা পার্টি দেয় সে। কিন্তু ওখানে ক্যাথি বাদে আমার পরিচিত আর কেউ না থাকায় কিছুক্ষণ বাদেই একা হয়ে পড়ি। এসময় গোলাপী চশমার এক গাট্টাগোট্টা লোক আমার দিকে জয়েন্ট বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে চলবে নাকি? না করে দিতে গিয়েও কেন যেন থেমে যাই। কারণটা ঠিক বলতে পারবো না। হয়তো ক্যাথি জোর করে ওরকম একটা পার্টিতে নিয়ে যাওয়ায় অবচেতন মনে অসন্তুষ্টি কাজ করছিল। চারপাশে তাকিয়ে যখন ওকে দেখলাম না, মাথায় জেদ চেপে গেল। জয়েন্টটা ঠোঁটে নিয়ে লম্বা একটা টান দিলাম।
আর ঠিক এভাবেই আবারো পুরনো নেশাটা পেয়ে বসলো আমাকে। মাঝখানে যে লম্বা একটা সময় গাঁজা ছাড়া ছিলাম, এমনটা মনেই হচ্ছিল না। যেন বিশ্বস্ত কুকুরের মত নেশাটা অপেক্ষা করছিল আমার জন্যে। ক্যাথিকে অবশ্য কিছু বলিনি এ ব্যাপারে। বরং তক্কে তক্কে ছিলাম। ছয় সপ্তাহ পর নিজ থেকেই হাজির হলো সুযোগ। নিকোলের সাথে দেখা করতে এক সপ্তাহের জন্যে নিউ ইয়র্কে গিয়েছিল ক্যাথি। তার অনুপস্থিতিতে একাকীত্ব আর একঘেয়ে সময় কাটানোর জন্যে গাঁজার শরণাপন্ন হই আবারো। পরিচিত কোন ডিলার নেই আমার। তাই ছাত্র বয়সে যা করতাম, সেই পথেই হাঁটলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে রওনা হয়ে গেলাম ক্যামডেন টাউন মার্কেটের উদ্দেশ্যে।
স্টেশন থেকে বাইরে পা দিতেই গাঁজার ঘ্রাণ এসে লাগলো নাকে। সেই সাথে ধপ আর নানারকম খাবারের গন্ধ। ক্যামডেন লকের পাশে অবস্থিত ব্রিজটায় পৌঁছে যাই খানিক বাদেই। পর্যটকদের ভিড়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকি কিছুক্ষণ। চারপাশে বেশিরভাগই কিশোর-কিশোরী।
ইতিউতি তাকিয়ে কোন ডিলারের দেখা পেলাম না। আগে ব্রিজ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পাশ থেকে ডাকাডাকি করতে ডিলারের দল। এসময় লক্ষ্য করলাম জনতার ভিড়ে দু’জন পুলিশ অফিসার হেঁটে বেড়াচ্ছে। তারা স্টেশনের দিকে চলে যেতেই ভোজবাজির মত আমার পাশে উদয় হলো একজন।
